Image description

ফিলিস্তিনি ইতিহাসবিদ ওয়ালিদ খালিদী মারা গেছেন। তিনি নাকবা নথিভুক্ত করতে ও ফিলিস্তিনের ইতিহাস প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সংরক্ষণ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তার বয়স হয়েছিল ১০০ বছর। সোমবার (৯ মার্চ) ইনস্টিটিউট ফর প্যালেস্টাইন স্টাডিজ (আইপিএস) এক শোকবার্তায় তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। এই গবেষণা কেন্দ্রটির সহ-প্রতিষ্ঠাও খালেদী।

 

সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা জানিয়েছে, রোববার যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটসে মৃত্যুবরণ করেন এই ইতিহাসবিদ। তার মৃত্যু সংবাদে পণ্ডিত, কূটনীতিক ও ফিলিস্তিনি কর্মকর্তারা সোশ্যাল মিডিয়ায় শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেছেন।

 

যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রদূত হুসাম জোমলট এক্স-এ খালিদীকে ‘জাতীয় সম্পদ, স্মৃতির রক্ষক এবং প্রজন্মের পরামর্শদাতা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

 

১৯২৫ সালে জেরুজালেমে এক বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী পরিবারে জন্ম নেওয়া খালিদী রামাল্লায় প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের পর জেরুজালেমের সেন্ট জর্জ স্কুলে পড়াশোনা করেন। ১৯৫১ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি আমেরিকান ইউনিভার্সিটি অব বৈরুতে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত রাজনৈতিক বিজ্ঞান অধ্যাপনা করেন। পরে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সে রিসার্চ ফেলো হিসেবে কাজ করেন।

 
 

 

নাকবার লিপিকার

 

১৯৪৮ সালে ইহুদিবাদী মিলিশিয়াদের ফিলিস্তিনে জাতিগত নির্মূল অভিযানের (নাকবা বা মহাবিপর্যয়) সূক্ষ্ম নথিপত্র তৈরি করার কারণে খালিদী সবচেয়ে বেশি পরিচিত ছিলেন। ১৯৯২ সালে তার প্রকাশিত ঐতিহাসিক বই ‘অল দ্যাট রিমেইনস’-এ প্রথম আরব-ইসরায়েলি যুদ্ধের সময় ৪০০টিরও বেশি ফিলিস্তিনি গ্রাম কীভাবে ধ্বংস বা জনশূন্য করা হয়েছিল তা তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। বইটিতে ঐতিহাসিক গবেষণা, মানচিত্র এবং সাক্ষ্যপ্রমাণ একত্রিত করে বিলুপ্ত সম্প্রদায়ের জীবন পুনর্গঠন করা হয়েছে।

 

আইপিএস খালিদীকে ‘১৯৪৮ সালে জায়নিস্ট আন্দোলন কীভাবে ফিলিস্তিন দখলে সফল হয়েছিল তা ব্যাখ্যা করে এমন বহু দীর্ঘ-লুকানো তথ্য উন্মোচনের পথিকৃৎ’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। আরও বলা হয়েছে যে, ১৯৬০-এর দশকে তিনি প্রথমবার ‘প্ল্যান ডালেট’ বা ফিলিস্তিন দখল ও জনগণ বহিষ্কারের মাস্টার প্ল্যান প্রকাশ করেন।

 

তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ ‘বিফোর দ্যাইসপোরা’, যেখানে ১৯৪৮ সালের পূর্ববর্তী ফিলিস্তিনি সমাজের ইতিহাস নথিভুক্ত রয়েছে। এতে আর্কাইভাল ফটোগ্রাফ ব্যবহার করে দেশের শহর ও গ্রামের দৈনন্দিন জীবনের বিরল দৃশ্যমান রেকর্ড সংরক্ষণ করা হয়েছে।

 

একাডেমিক ও কূটনৈতিক ভূমিকা

 

অক্সফোর্ডে কিছু সময় শিক্ষকতার পর, খালিদী আমেরিকান ইউনিভার্সিটি অব বৈরুতে কয়েক দশক কাটান। ইনস্টিটিউট ফর প্যালেস্টাইন স্টাডিজ প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখেন। গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি ফিলিস্তিনি ইতিহাস, রাজনীতি ও সমাজ নিয়ে নিবেদিতপ্রাণ শীর্ষস্থানীয় গবেষণা সংস্থাগুলোর মধ্যে একটি হয়ে ওঠে।

 

পরবর্তীতে তিনি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সে রিসার্চ ফেলো হিসেবে কাজ করেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বক্তৃতা দেন এবং আমেরিকান একাডেমি অব আর্টস অ্যান্ড সায়েন্সেসের ফেলো নির্বাচিত হন।

 

শিক্ষাজীবনের বাইরে তিনি ফিলিস্তিনি কূটনীতিতেও সক্রিয় ছিলেন। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের পর (নাকসা) খালিদী কূটনীতির দিকে মনোযোগ দেন। তিনি জাতিসংঘে ইরাকি প্রতিনিধিদলের উপদেষ্টা, ১৯৮৩ সালে ব্রিটিশ সরকারের আরব শীর্ষ সম্মেলনের প্রতিনিধিদলের সদস্য এবং ১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝিতে আরব লীগের মহাসচিবের বিশেষ উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

 

১৯৯১ সালের মাদ্রিদ শান্তি সম্মেলনে জর্ডান-ফিলিস্তিনি যৌথ প্রতিনিধিদলের অংশও ছিলেন খালিদী।

 

ওয়ালিদ খালিদী দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের প্রবল সমর্থক ছিলেন। ১৯৮৮ সালে ফরেন অ্যাফেয়ার্সে তিনি লিখেছিলেন, ১৯৬৭ সালের সীমার মধ্যে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠন ‘ইসরায়েলের পাশে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের জন্য’ এই শতাব্দীর প্রাচীন সংঘাতের ঐতিহাসিক সমঝোতার একমাত্র কার্যকর ধারণাগত পথ।