ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি তার ৩৬ বছরের শাসনামলে বহুবার অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা দমন ও বিদেশি চাপ মোকাবিলা করেছেন। তবে চলমান কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্যেও সম্ভাব্য মার্কিন বিমান হামলার হুমকি ঘিরে তিনি এখন সবচেয়ে বড় সংকটের মুখে পড়েছেন।
শুক্রবার (২০ ফেব্রুয়ারি) বার্তাসংস্থা রয়টার্সের এক বিশ্লেষণে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৮৬ বছর বয়সী খামেনি ইসলামী প্রজাতন্ত্র রক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে আসছেন। পশ্চিমা বিশ্বের, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি তার দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস ও বিরোধিতা সুপরিচিত। এ বছর জানুয়ারিতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ কঠোরভাবে দমন করেছেন তিনি। এতে হাজারো মানুষের প্রাণহানির অভিযোগ ওঠে। বিক্ষোভকারীরা ‘স্বৈরশাসকের মৃত্যু হোক’ স্লোগান দিলে নিরাপত্তা বাহিনী গুলি চালিয়েছে।
এরই মধ্যে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও ইরানে হামলার হুমকি দিয়েছেন। গত বছরের জুনে ইসরায়েলি হামলায় বিপ্লবী গার্ডের কয়েকজন শীর্ষ কমান্ডার নিহত হলে খামেনিকে গোপনে আশ্রয় নিতে হয়েছিল।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামলা চালায় ইরান-সমর্থিত ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী হামাস। ওই হামলার জেরে গাজায় যুদ্ধ শুরু হয় এবং ইসরায়েল ইরানের আঞ্চলিক মিত্রদের ওপর হামলা জোরদার করে। লেবাননে হিজবুল্লাহ দুর্বল হয়ে পড়ে এবং সিরিয়ায় প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ ক্ষমতাচ্যুত হন। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে তেহরানের প্রভাব কমে যায়।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি পরিত্যাগের দাবি জানিয়ে আসছে। তেহরান বলছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি বেসামরিক উদ্দেশ্যে, তবে পশ্চিমা দেশ ও ইসরায়েলের মতে এটি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথ খুলে দিতে পারে। এছাড়া খামেনি ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করতেও অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। এর ফলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
১৯৮৯ সাল থেকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন খামেনি। সরকার, সামরিক বাহিনী ও বিচার বিভাগের ওপর তার চূড়ান্ত কর্তৃত্ব রয়েছে। নির্বাচিত সরকার দৈনন্দিন প্রশাসন চালালেও যুক্তরাষ্ট্রসহ গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্ত তার অনুমোদন ছাড়া হয় না।
শুরুতে অনেকেই তাকে দুর্বল নেতা মনে করতেন। ইসলামী প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা রুহুল্লাহ খামেনির মতো ধর্মীয় মর্যাদা তার ছিল না। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি বিপ্লবী নিরাপত্তা কাঠামোকে নিজের অনুগত করে ক্ষমতা সুসংহত করেন।
২০১৩ সালে তিনি ‘বীরত্বপূর্ণ নমনীয়তা’ ধারণা তুলে ধরেন। এটির মূল লক্ষ্য কৌশলগত সমঝোতার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য অর্জন। এরই অংশ হিসেবে ২০১৫ সালে বিশ্বশক্তিগুলোর সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তিতে তিনি সমর্থন দেন। তবে ২০১৮ সালে ট্রাম্প প্রশাসন সেই চুক্তি থেকে সরে এসে ইরানের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করে।
খামেনির ক্ষমতার মূল ভরকেন্দ্র ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) ও স্বেচ্ছাসেবী আধাসামরিক বাহিনী বাসিজ। ২০০৯ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের পর বিক্ষোভ দমন, ২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুকে ঘিরে আন্দোলন দমন এবং সাম্প্রতিক জানুয়ারির বিক্ষোভ দমনে এ বাহিনীগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তার প্রভাবের আরেকটি উৎস হলো ‘সেতাদ’ নামে পরিচিত আধা-রাষ্ট্রীয় আর্থিক সাম্রাজ্য। এটি সরাসরি তার নিয়ন্ত্রণে এবং বিপুল অর্থনৈতিক সম্পদের মালিক।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বিপ্লব, ইরাকের সঙ্গে আট বছরের যুদ্ধ (১৯৮০-৮৮) এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘ দ্বন্দ্ব খামেনির রাজনৈতিক চরিত্র গঠন করেছে। ১৯৮১ সালে বোমা হামলায় আহত হয়ে তার ডান হাত পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয়। শাহ শাসনামলে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে কারাবরণও করেন তিনি। সময়ের প্রবাহে একসময়ের তুলনামূলক দুর্বল নেতা আজ ইরানের ক্ষমতার সর্বোচ্চ প্রতীকে পরিণত হয়েছেন। তবে অর্থনৈতিক সংকট, আন্তর্জাতিক চাপ এবং সম্ভাব্য সামরিক সংঘাত তার শাসনের ভবিষ্যৎ এখন এক অনিশ্চিত মোড়ে দাঁড় করিয়েছে।