সৌদি আরব ও পারমাণবিক শক্তিধর পাকিস্তানের মধ্যে সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দিতে তৎপরতা চালাচ্ছে তুরস্ক।
বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে উপসাগরীয় অঞ্চল ও ইরানকে ঘিরে বাড়তে থাকা উত্তেজনার মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে একটি নতুন সামরিক জোট গড়ে উঠতে পারে।
বার্তা সংস্থা ব্লুমবার্গ জানিয়েছে-তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে এ বিষয়ে আলোচনা ভালো পর্যায়ে রয়েছে।
পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা খুবই বেশি। এদিকে আংকারা ও রিয়াদের সঙ্গে ইসলামাবাদের সামরিক সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হচ্ছে বলে ইঙ্গিত মিলেছে।
পাকিস্তান, তুরস্ক এবং সৌদি আরব যদি ত্রিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষর করে, তাহলে তা তিন দেশের প্রতিটিকেই অনন্য সুবিধা দেবে।
তেলসমৃদ্ধ সৌদি আরব হলো আরব বিশ্বের একমাত্র দেশ যারা জি–২০ জোটে প্রতিনিধিত্ব করছে। ইসলাম ধর্মের দুই পবিত্র শহর মক্কা ও মদিনার অবস্থান এখানে। পাকিস্তান হলো মুসলিম বিশ্বের একমাত্র পারমাণবিক শক্তিধর দেশ। আর তুরস্ক হলো সামরিক জোট ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সেনা সমৃদ্ধ দেশ।
পাকিস্তান ও তুরস্ক—দুই দেশই ক্রমাগত অস্ত্রের বড় উৎপাদক ও রপ্তানিকারক হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছে।
রাশিয়ার বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য ইউক্রেনকে ড্রোন সরবরাহ করেছে তুরস্ক। একই সঙ্গে দেশটি সিরিয়ার সামরিক খাতের প্রধান পৃষ্ঠপোষক হয়ে উঠেছে। লিবিয়ায়ও তাদের সেনা মোতায়েন রয়েছে।
চলতি সপ্তাহের শুরুতে রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ২০০ কোটি ডলারের সৌদি ঋণকে জেএফ–১৭ যুদ্ধবিমান কেনার চুক্তিতে রূপান্তর করার বিষয়ে পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে আলোচনা চলছে। চীন ও পাকিস্তান যৌথভাবে এই যুদ্ধবিমানগুলো তৈরি করে।
ঐতিহাসিকভাবে সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গে আলাদা করে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। তবে সৌদি আরব ও তুরস্কের মধ্যে সবসময় মতৈক্য হতে দেখা যায় না।
২০২৫ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর স্ট্র্যাটেজিক মিউচ্যুয়াল ডিফেন্স এগ্রিমেন্ট (এসডিএমএ) চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে।
চুক্তির বক্তব্য ও শর্তাবলী বিস্তারিতভাবে কোনো দেশই প্রকাশ করেনি, তবে দুই দেশের কর্মকর্তারা বলেছেন, চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী কোনো দেশের ওপর যদি বহিঃশক্তির আক্রমণ ঘটে, তাহলে অপর দেশ সর্বাত্মকভাবে আক্রান্ত দেশের পাশে থাকবে।
এই চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, পাকিস্তানের পরমাণু অস্ত্র। বিশ্বে পাকিস্তানই একমাত্র মুসলিম দেশ, যারা পরমাণু অস্ত্র আছে। চুক্তির আওতায় এই পরমাণু অস্ত্রও রয়েছে।
তাছাড়া যদিও এটি এশিয়ার সবচেয়ে দরিদ্র দেশগুলোর মধ্যে একটি; তারপরও ৬ লাখ সেনাসমৃদ্ধ পাকিস্তানের সেনাবাহিনী বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনীগুলোর মধ্যে অন্যতম।
চুক্তিত স্বাক্ষরের দুই দিন পর ১৯ সেপ্টেম্বর এক সাক্ষাৎকারে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেছিলেন, আমাদের এই চুক্তিটি ন্যাটোর আদলে তৈরি করা হয়েছে; অর্থাৎ এটি প্রতিরক্ষামূলক, আক্রমণাত্মক নয়। কোনো দেশে হামলা বা আগ্রাসন চালানোর কোনো সুযোগ এখানে রাখা হয়নি। তবে যদি সৌদি আরব কিংবা পাকিস্তানের ওপর হামলা হয়, তাহলে আমরা সম্মিলিতভাবে তা প্রতিহত করব।
যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ন্যাটোর একমাত্র এশীয় দেশ তুরস্ক। তবে বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ানের মতানৈক্যের জেরে দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ক শীতল।
তাছাড়া মধ্যএশীয় ও মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে প্রভাবশালী তুরস্ক এশিয়া ও আফ্রিকা অঞ্চলেও নিজেদের প্রভাব বিস্তারে আগ্রহী। এক্ষেত্রে পাকিস্তান ও সৌদির সহায়তা আঙ্কারার জন্য বেশ সহায়ক হবে বলে মনে করেন তুরস্কের রাজনীতি ও কূটনীতি বিশ্লেষকদের একাংশ।