Image description

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দিতে নিবন্ধন করেছেন ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ৬৮২ জন। তাঁদের প্রায় অর্ধেক প্রবাসী বাংলাদেশি। প্রবাসীরা এবারই প্রথম ভোট দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। নির্বাচন কমিশন বলেছে, পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার নিবন্ধনে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি সাড়া পাওয়া গেছে।

কিছু আসনে পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে নিবন্ধনকারীর সংখ্যা ১০ হাজারের বেশি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, নিবন্ধনকারীরা সুষ্ঠুভাবে ভোট দিতে পারলে এসব আসনে জয়-পরাজয়ের নির্ধারক হতে পারে পোস্টাল ব্যালট।

তফসিল অনুযায়ী, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোট হবে। নির্বাচন কমিশন (ইসি) পোস্টাল ভোট বিডি নামের অ্যাপের মাধ্যমে পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে আগ্রহী ব্যক্তিদের নিবন্ধন সম্পন্ন করে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকা বাংলাদেশিরা এবং দেশে নিজ এলাকার বাইরে থাকা সরকারি কর্মচারী, ভোট গ্রহণ কর্মকর্তা এবং কারাগারের কয়েদিরা এই অ্যাপে নিবন্ধন করেন। একাধিকবার সময় বাড়িয়ে এই নিবন্ধন শেষ হয় ৫ জানুয়ারি। দেশ-বিদেশ থেকে মোট ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ৬৮২ ভোটার নিবন্ধন করেন। তাঁদের মধ্যে দেশ থেকে নিবন্ধন করেন ৭ লাখ ৬১ হাজার ১৪০ জন এবং বিদেশ থেকে ৭ লাখ ৭২ হাজার ৫৪২ প্রবাসী বাংলাদেশি।

ইসির ওয়েবসাইটের তথ্যমতে, জাতীয় সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে ১৮টিতে ১০ হাজারের বেশি ভোটার পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে নিবন্ধন করেছেন। ৯৭টি আসনে নিবন্ধনকারীর সংখ্যা ৫ হাজার থেকে ১০ হাজারের মধ্যে। ১৮৫টি আসনে নিবন্ধনকারীর সংখ্যা ৫ হাজারের কম।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘যেসব আসনে পোস্টাল ব্যালটের নিবন্ধন বেশি, সেগুলোতে পোস্টাল ভোট ডিসাইডিং ফ্যাক্টর হিসেবে দাঁড়াতে পারে। তবে সব ভোট একদিকে যাবে কি না, সেটা বড় বিষয়।’

যেসব আসনে কম ভোটের ব্যবধানে জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয়, সেসব আসনে ফলাফল নির্ধারণে পোস্টাল ব্যালটের প্রভাব থাকবে বলে মনে করেন নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার। তিনি গণমাধ্যমকে বলেছেন, ভোটের লড়াইয়ে কখনো কখনো একাধিক প্রার্থী সমান সমান ভোট পান; অনেক সময় ৫-১০ ভোটের ব্যবধানেও জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয়। সেখানে প্রবাসীদের ভোট জয়-পরাজয় নির্ধারণের নিয়ামক (ফ্যাক্টর) হিসেবে কাজ করবে।

দেশে পোস্টাল ভোটের নিয়ম পুরোনো হলেও বিষয়টি বিগত নির্বাচনগুলোতে আলোচনায় ছিল না। অতীতে যেসব সরকারি কর্মকর্তা নির্বাচনী দায়িত্ব পালনের জন্য নিজ এলাকার বাইরে থাকতেন, প্রিসাইডিং ও পোলিং কর্মকর্তাসহ নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তা ও কারাগারের কয়েদিদের জন্য পোস্টাল ভোটের সুযোগ ছিল। তবে তা নিয়ে প্রচার না থাকায় সংশ্লিষ্টদের ভোট দিতে তেমন দেখা যায়নি।

দেশে অতীতে ১২টি সংসদ নির্বাচন হলেও প্রবাসীরা ভোট দিতে পারেননি। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রবাসীদের ভোটাধিকারের সুযোগ দেওয়ার দাবি জানায় প্রবাসী এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। পরে আইন সংশোধন করে প্রবাসীদের ভোটাধিকারের সুযোগ করেছে সরকার। প্রবাসীদের ভোট নেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে রাজনৈতিক দল, প্রবাসীসহ সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের সঙ্গে বৈঠক করে নির্বাচন কমিশন। সেখানে পোস্টাল ব্যালটে প্রবাসীদের ভোট নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

বিদেশে থেকেও প্রথমবারের মতো ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়ে খুশি প্রবাসীরা। যুক্তরাজ্যের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তাহিম আমানত খান বলেন, ‘বিদেশে থাকায় জীবনের প্রথম ভোট দেওয়া নিয়ে চিন্তিত ছিলাম। কিন্তু পোস্টাল ব্যালটের সুবিধা করায় আমি প্রবাসে থেকেই পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারব। সরকারের এই প্রশংসনীয় উদ্যোগে আমি অত্যন্ত আনন্দিত।’ প্রবাসে থাকলেও জীবনে প্রথম ভোট দিতে পারবেন ভেবে খুশি মালয়েশিয়ার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ আবিরও।

মালয়েশিয়া প্রবাসী আরিফুল ইসলাম বলেন, পোস্টাল ভোট দেওয়ার সুযোগ প্রবাসীদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। একই সঙ্গে অনেক প্রবাসীর জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) সমস্যারও সমাধান হয়ে গেছে।

পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে সর্বোচ্চ নিবন্ধন হয়েছে ফেনী-৩ আসনে, ১৬ হাজার ৯৩ জন। চট্টগ্রাম-১৫ আসনে ১৪ হাজার ৩০১ জন, কুমিল্লা-১০ আসনে ১৩ হাজার ৯৭৭, নোয়াখালী-১ আসনে ১৩ হাজার ৬৫৮, নোয়াখালী-৩ আসনে ১২ হাজার ৮২৯, ফেনী-২ আসনে ১২ হাজার ৭৯৭, কুমিল্লা-১১ আসনে ১২ হাজার ৫৮৩, সিলেট-১ আসনে ১২ হাজার ৪৫৮, কুমিল্লা-৫ আসনে ১২ হাজার ৩৭৩, কুমিল্লা-৬ আসনে ১১ হাজার ৯৪৩, চাঁদপুর-৫ আসনে ১১ হাজার ৮৫২, নোয়াখালী-৫ আসনে ১১ হাজার ৬৭৫ ভোটার পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে নিবন্ধন করেছেন। সবচেয়ে কম নিবন্ধন হয়েছে বাগেরহাট-৩ আসনে, ১ হাজার ৫৯৫ জন ভোটার। প্রবাসীদের মধ্যে সৌদি আরব থেকে সর্বোচ্চ ২ লাখ ৩৯ হাজার ১৮৬ জন পোস্টাল ভোটের জন্য নিবন্ধন করেন। এরপর মালয়েশিয়া থেকে ৮৪ হাজার ২৯২ এবং কাতার থেকে ৭৬ হাজার ১৩৯ জন।

অতীতের নির্বাচনগুলোতে দেখা গেছে, ২০-৩০টি আসনে ভোটের ফলাফল নির্ধারণ হয়েছে ৫ হাজারের মতো ভোটে। বেশ কিছু আসনে ১০ হাজারের ব্যবধানে জয়-পরাজয় নির্ধারণ হয়েছে। প্রবাসীরা বলছেন, এবার প্রবাসীদের ভোট অনেক আসনের ফলাফলে ভূমিকা রাখতে পারে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হওয়ার কথা বলছেন রাজনীতিবিদেরা। সে ক্ষেত্রে সঠিকভাবে পোস্টাল ব্যালট প্রয়োগ হলে তা অনেক আসনেই জয়-পরাজয়ের নির্ণায়ক হয়ে দাঁড়াবে।

বেশ কয়েকজন প্রবাসী বলেছেন, কোন প্রতীকে ভোট দিয়েছেন তা প্রকাশ হওয়ার আশঙ্কায় প্রবাসীদের কেউ কেউ নিবন্ধন করেননি। তবে ইসি বলেছে, ভোটারদের শতভাগ সুরক্ষা দেওয়া হবে। একই সঙ্গে রিয়েল-টাইম ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে ব্যালট কখন পৌঁছাবে সেই তথ্যও নিবন্ধনকারী ভোটাররা জানার সুযোগ পাবেন।

পোস্টাল ভোটে কিছুটা জটিলতার আশঙ্কা করছেন একাধিক নির্বাচন বিশেষজ্ঞ। সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘পোস্টাল ভোটের একাধিক ধাপ আছে। সেগুলো ঠিকভাবে প্রয়োগ না হলে জটিলতা সৃষ্টি করবে। কারণ এগুলো অদৃশ্য। কারসাজির অভিযোগও উঠতে পারে। তবে আমি মনে করি নির্বাচন কমিশন সঠিকভাবে করবে। তবু ঝুঁকি থেকেই যায়।’

ইসির পক্ষ থেকে পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে নিবন্ধনকারী প্রবাসীদের ফিরতি খামসহ নির্বাচনী প্রতীক ও গণভোটের ব্যালট পাঠানো হচ্ছে। ইতিমধ্যে অনেক প্রবাসী পোস্টাল ব্যালট পাওয়ার কথা জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিয়েছেন।

রেইনট্রি সফটওয়্যার মালয়েশিয়ার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘একজন রেমিট্যান্স যোদ্ধা হিসেবে এখন বুক ফুলিয়ে বলতে পারব দেশের আগামীর উন্নয়নে আমারও সরাসরি অংশগ্রহণ আছে। এটি শুধু একটি ভোট নয়, বরং প্রবাসীদের প্রতি রাষ্ট্রের শ্রেষ্ঠ সম্মান। এই প্রাপ্তি দেশের প্রতি আমাদের দায়িত্ববোধ ও ভালোবাসা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।’

সলিডব্রেইন টেক এসডিএন বিএইচডি-মালয়েশিয়ার সিইও ফয়সাল আহমেদ বলেন, ‘ভোট শুধু একটি কাগজে সিল মারা নয়; এটি একটি স্বপ্নের প্রতি সমর্থন, একটি ভবিষ্যতের পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত।’