আসন্ন সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে যাওয়া বৈধ প্রার্থীদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই বয়সে তরুণ ও যুবক। মোট প্রার্থীর ৩১ দশমিক ৩১ শতাংশের বয়স ২৫ থেকে ৪৫ বছরের মধ্যে। দলভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, শতাংশের হিসাবে তরুণ প্রার্থী সবচেয়ে বেশি জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের দল জাতীয় নাগরিক পার্টিতে (এনসিপি)। তবে মোট সংখ্যায় এই বয়সসীমার প্রার্থী আবার বেশি ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের। সংখ্যার হিসাবে এরপর ক্রমান্বয়ে রয়েছে তরুণ নেতৃত্বাধীন দল গণঅধিকার পরিষদ, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি। প্রার্থীদের একটি বড় অংশ বয়সে তরুণ হওয়ায় এবারের নির্বাচনে তারুণ্যের শক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষক ও বিশেষজ্ঞরা।
সংসদের ৩০০ আসনে ভোটে লড়তে মনোনয়নপত্র জমা পড়েছিল ২ হাজার ৫৬৮টি। যাচাই-বাছাই শেষে ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত রিটার্নিং কর্মকর্তারা ১ হাজার ৮৪২টি মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেছেন। এ ছাড়া আপিল করার পর আগে বাতিল ঘোষিত এক শর কিছু বেশি প্রার্থিতা গত দুদিনে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। আপিল চলমান থাকায় এই সংখ্যা আরও কিছু বাড়বে।
মনোনয়ন বৈধ হওয়া ১ হাজার ৮৩৯ জন প্রার্থীর হলফনামা বিশ্লেষণ করে বয়সভিত্তিক চিত্র তৈরি করেছে আজকের পত্রিকা। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সী প্রার্থীর সংখ্যা ১৭৯ জন, যা মোট প্রার্থীর ৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ। ৩৬ থেকে ৪৫ বছর বয়সী প্রার্থী রয়েছেন ৩৯৭ জন, যা মোট প্রার্থীর ২১ দশমিক ৫৮ শতাংশ। এই দুই বয়সগোষ্ঠী মিলিয়ে (২৫-৪৫) মোট প্রার্থীর সংখ্যা ৫৭৬ জন।
এ ছাড়া ৪৬ থেকে ৫৫ বছর বয়সী প্রার্থী রয়েছেন ৫৪৩ জন (২৯ দশমিক ৫৩ শতাংশ), ৫৬ থেকে ৬৫ বছর বয়সী ৪৩০ জন (২৩ দশমিক ৩৮ শতাংশ) এবং ৬৬ থেকে ৭৫ বছর বয়সী ২৪২ জন (১৩ দশমিক ১৫ শতাংশ)। ৭৬ থেকে ৮৫ বছর বয়সী প্রার্থী ৪৬ জন, যা মোটের ২ দশমিক ৫০ শতাংশ। ৮৬ থেকে ৯৫ বছর বয়সী প্রার্থী রয়েছেন মাত্র ২ জন (শূন্য দশমিক ১১ শতাংশ)।
মোট সংখ্যার বিচারে তরুণ ও যুবক বয়সী প্রার্থী বেশি ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশে। দলটির ২২৫ জন প্রার্থীর মধ্যে ৯৭ জনের বয়স ২৫ থেকে ৪৫ বছরের মধ্যে। গণঅধিকার পরিষদের ৭৮ জন প্রার্থীর মধ্যে ৫৯ জনেই বয়স ২৫ থেকে ৪৫ বছর। জামায়াতের ২৭১ জন প্রার্থীর মধ্যে এই বয়সসীমায় রয়েছেন ৪৯ জন।
অন্যদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টির ৪৪ জন প্রার্থীর মধ্যে ৪২ জনই যুবক ও তরুণ। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের ৭০ জন প্রার্থীর মধ্যে ৩৭ জন এবং জাতীয় পার্টির ১৪৭ জন প্রার্থীর মধ্যে ৩৪ জনের বয়স ২৫ থেকে ৪৫ বছর। অন্যদিকে বড় দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ২৯১ জন প্রার্থীর মধ্যে মাত্র ১৮ জনের বয়স ২৫ থেকে ৪৫ বছরের মধ্যে।
নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত বৈধ মনোনয়নপত্রের মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছেন ১১৮ জন। তাঁদের মধ্যে তরুণ রয়েছেন ১৭ জন প্রার্থী। বড়, উল্লেখযোগ্য বা তুলনামূলকভাবে বেশি সক্রিয় নয়টি দলের বাইরেও আরও অনেক দল ভোটে অংশ নিচ্ছে। নয়টি বাদে বাকি দলগুলো থেকে ৫৪৯ জনের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যেও ২০১ জন তরুণ।
এবারের সংসদ নির্বাচনের প্রার্থী এবং ভোটার উভয়ের মধ্যে তরুণদের সংখ্যা বড়; বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের আগ্রহকে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হিসেবে দেখছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মাদ মাহবুবুর রহমান। আজকের পত্রিকাকে তিনি বলেন, ‘২০২৬ সালের নির্বাচনে তরুণ ভোটারদের প্রাধান্য বিশেষভাবে লক্ষণীয়। এটি মূলত দুই কারণে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, গত গণ-অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব তরুণেরাই দিয়েছে। সে ক্ষেত্রে অভ্যুত্থান-পরবর্তী নির্বাচনে তাদের প্রভাব স্বাভাবিকভাবেই থাকবে। দ্বিতীয়ত, দীর্ঘদিন ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে না পারার কারণে তরুণদের মধ্যে নির্বাচন নিয়ে আগ্রহ বেশি। ফলে তারা নির্বাচনী তথা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নিয়ে বেশি উদ্দীপিত।’
প্রার্থী তালিকায়ও তারুণ্যের উজ্জ্বল উপস্থিতি প্রসঙ্গে অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্বে তরুণদের অংশগ্রহণ দেখা যাচ্ছে। অনেক রাজনৈতিক দলের মধ্যে তরুণদের হাতে নতুন নেতৃত্ব এসেছে; বিশেষ করে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় থাকা অভ্যুত্থানের তরুণ নেতারা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় তরুণ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠায় আগ্রহী।’
অধ্যাপক রহমান একই সঙ্গে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, তরুণেরা কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থার পতন ঘটানো এবং ভোটাধিকার ফিরে পেতে সফল হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু তারা সংসদ, সরকার বা রাজনৈতিক দলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করতে পারলে শুধু রাজনৈতিক ব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে। রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং নেতৃত্ব দারুণ সম্ভাবনার সূচনা করেছে। কিন্তু বাস্তব পরিবর্তনের জন্য রাজনৈতিক পরিবেশ এবং নীতি-প্রক্রিয়া সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
তারুণ্যের প্রভাব নিয়ে আশাবাদী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক হাসান এ শাফীও। আজকের পত্রিকাকে তিনি বলেন, ‘২৫ থেকে ৪৫ বছর বয়সের তরুণ-যুবকেরা আসন্ন নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য প্রভাব রাখতে পারে। আমরা তরুণদের শুধু বয়সের ভিত্তিতে দেখি না। শিক্ষা, ইতিহাস ও প্রযুক্তির জ্ঞান এবং শ্রমবাজারের অভিজ্ঞতা মিলিয়ে তাদের সামাজিক অবস্থান নির্ধারিত হয়। বর্তমান তরুণ প্রজন্ম রাজনৈতিকভাবে সচেতন। ডিজিটাল মিডিয়ার সঙ্গে বেড়ে উঠেছে বলে তাদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ধরন আরও সক্রিয়।’
অধ্যাপক হাসান মনে করেন, যদি তরুণেরা নির্বাচিত হয়ে সংসদে যান, তাহলে তাঁরা রাজনীতিতে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি আনবেন। তাঁদের প্রতি মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি থাকবে।
নৃবিজ্ঞানের এই অধ্যাপক আরও বলেন, ‘এখনকার তরুণেরা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, ভার্চুয়াল মিডিয়া এবং নতুন কর্মসংস্থানের সঙ্গে পরিচিত। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে তারা বেড়ে উঠেছে। তাই তরুণেরা তাদের অভিজ্ঞতা ও উদ্ভাবনী ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে সমাজ ও দেশকে নতুন দিকে পরিচালনায় সক্ষম। তারা বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে স্থানীয় প্রেক্ষাপটকে সুন্দরভাবে সমন্বয় করতে পারবে।’