Image description

গাজায় যুদ্ধবিরতি চুক্তি শেষে বিশ্বনেতাদের সামনে ভাষণ দিচ্ছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। হঠাৎ তিনি ঘুরে তাকালেন পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা এক দীর্ঘদেহী সেনাকর্তার দিকে। স্মিত হেসে ট্রাম্প বলে উঠলেন, আমার প্রিয় ফিল্ড মার্শাল।

মুহূর্তেই ক্যামেরার লেন্স ঘুরে গেল সেই ব্যক্তির দিকে। হোয়াইট হাউসের সর্বোচ্চ নেতার এই ব্যক্তিগত পছন্দ কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না, বরং এটি ছিল এক বছরের সুনিপুণ কূটনৈতিক ও সামরিক কৌশলের চূড়ান্ত পরিণতি। তিনি আর কেউ নন, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান সৈয়দ আসিম মুনির। এক সময় যে দেশটির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক ছিল তিক্ততায় ভরা, সেই পাকিস্তানের এই সেনাপ্রধানই এখন ডোনাল্ড ট্রাম্পের সবচেয়ে বিশ্বস্ত মিত্রদের একজন। কিন্তু কীভাবে সম্ভব হলো এই অসম্ভব সমীকরণ?

বিশ্লেষকদের মতে, এই নাটকীয় পরিবর্তনের প্রেক্ষাপট রচিত হয় ২০২৫ সালের মে মাসে। কাশ্মীর সীমান্তকে কেন্দ্র করে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে শুরু হওয়া ৪ দিনের এক রক্তক্ষয়ী আকাশযুদ্ধ পুরো দক্ষিণ এশিয়াকে পারমাণবিক যুদ্ধের কিনারে দাঁড় করিয়েছিল। সেই সংকটকালে পর্দার আড়ালে ট্রাম্পের জোরালো ভূমিকা এবং পাকিস্তানের পাল্টা আঘাতের সক্ষমতা ওয়াশিংটনের নজর কাড়ে। ভারত যখন ট্রাম্পকে কৃতিত্ব দিতে নারাজ, তখন আসিম মুনির ও প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ সেই শূন্যস্থান পূরণ করেন। ট্রাম্পকে শান্তি রক্ষাকারী হিসেবে তুলে ধরে তারা হোয়াইট হাউসের সুনজরে আসেন।

ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই আসিম মুনির নিজেকে এক সৈনিক-কূটনীতিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। ২০২১ সালে কাবুল বিমানবন্দরে হামলার মূল পরিকল্পনাকারীকে গ্রেপ্তারে পাকিস্তানের সহযোগিতা ট্রাম্পকে মুগ্ধ করে। ট্রাম্পের ভাষায়, মুনির একজন দুর্দান্ত যোদ্ধা এবং অসাধারণ মানুষ। কেবল নিরাপত্তা নয়, খনিজ সম্পদ ও ক্রিপ্টো মাইনিংয়ের মতো অর্থনৈতিক ইস্যুতেও এখন দুই দেশ এক টেবিলে বসছে।

বিদেশে প্রভাব বাড়ানোর পাশাপাশি দেশের ভেতরেও মুনির এখন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। ২০২৫ সালে তাকে ফিল্ড মার্শাল পদে উন্নীত করা হয় এবং সংবিধান সংশোধন করে চিফ অব ডিফেন্স ফোর্সেস-সিডিএফ পদ তৈরির মাধ্যমে ৩ বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ তার হাতে ন্যস্ত করা হয়। বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের বরফ গলানো থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়ায় পাকিস্তানের কূটনৈতিক প্রভাব পুনরুদ্ধারেও তিনি পালন করেছেন মুখ্য ভূমিকা।

বিদেশের মাটিতে এই অভাবনীয় সাফল্যের চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে দেশের ভেতরে। একদিকে যখন আসিম মুনির ট্রাম্পের সঙ্গে হোয়াইট হাউসে বৈঠক করছেন, অন্যদিকে পাকিস্তানে বিরোধী দলগুলোর ওপর দমন-পীড়ন ও সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠরোধের অভিযোগ উঠছে তুঙ্গে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের কারাবাস এবং বেলুচিস্তানে ক্রমবর্ধমান অস্থিরতা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ থাকলেও ট্রাম্পের সঙ্গে মুনিরের মধুচন্দ্রিমা সেই বিতর্ককে আড়ালে ঢেকে দিচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, আশির দশকের জিয়া-উল-হক কিংবা ২০০১-এর পারভেজ মোশাররফের মতো আসিম মুনিরও মার্কিন স্বার্থের সমীকরণে নিজেকে অপরিহার্য করে তুলেছেন। তবে এই সামরিক-কূটনৈতিক প্রেম পাকিস্তানের ভঙ্গুর গণতন্ত্রের জন্য আশীর্বাদ নাকি অভিশাপ, সেই প্রশ্নই এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।