Image description

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেস ও অঙ্গরাজ্যের আইনসভায় জয়ী হয়ে ইতিহাস গড়েছেন আরব বংশোদ্ভূত ও মুসলিম প্রার্থীরা। মুসলিমবিরোধী বক্তব্য ও তাদের সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে চালানো প্রচারণার মধ্যেও উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছেন তারা। এবারের নির্বাচনে প্রথমবারের মতো একজন মুসলিম সিনেটর নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি মিশিগানের ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ও মিসরীয় বংশোদ্ভূত চিকিৎসক আবদুল আল-সাইয়েদ। গাজায় ইসরাইলি হামলায় আহত ফিলিস্তিনিদের চিকিৎসা করা একজন শল্যচিকিৎসকও কংগ্রেসে নির্বাচিত হয়েছেন। এ ছাড়া বেশ কয়েকজন ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত প্রার্থীও জয় পেয়েছেন।

 

নির্বাচনের আগে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার মিত্ররা মুসলিম প্রার্থীদের লক্ষ্য করে প্রচারণা চালিয়েছিলেন। বিশেষ করে মিশিগানের আবদুল আল-সাইয়েদের বিরুদ্ধে উগ্রপন্থি গোষ্ঠীর সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার ভিত্তিহীন অভিযোগ তোলা হয়েছিল। এমন পরিস্থিতির মধ্যেও অন্তত সাতজন মুসলিম প্রার্থী কংগ্রেসে নির্বাচিত হয়েছেন। তাদের মধ্যে একজন সিনেটর এবং ছয়জন প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য।

 

নির্বাচনে জয়ী আরব ও মুসলিম বংশোদ্ভূত উল্লেখযোগ্য প্রার্থীদের কয়েকজন হলেন—

 

১. আবদুল আল-সাইয়েদ

মিশিগানে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে পরাজিত করে সিনেটর নির্বাচিত হয়েছেন ৪২ বছর বয়সি মিসরীয় বংশোদ্ভূত ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল আল-সাইয়েদ। এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সিনেটর হওয়ার কৃতিত্ব অর্জন করেছেন তিনি।

 

চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ আল-সাইয়েদ নির্বাচনি প্রচারে স্বাস্থ্যসেবা, জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং রাজনীতিতে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রভাব হ্রাসের ওপর গুরুত্ব দেন।

 

তিনি ইসরাইল ও মিসরকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তারও সমালোচনা করেছেন। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও প্রত্যাখ্যান করেছেন তিনি।

 

২. আদম হামাওয়ি

নিউ জার্সির ১২তম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্টে রিপাবলিকান প্রার্থী গ্রেগ মেলেকে হারিয়ে প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন মিসরীয় বংশোদ্ভূত শল্যচিকিৎসক আদম হামাওয়ি। এর মধ্য দিয়ে নিউ জার্সি থেকে কংগ্রেসে নির্বাচিত প্রথম মুসলিম প্রতিনিধি হয়েছেন তিনি।

 

হামাওয়ি যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর সাবেক শল্যচিকিৎসক। ২০০৪ সালে ইরাকে তার হেলিকপ্টার গুলিবিদ্ধ হয়ে ভূপাতিত হওয়ার পর ভবিষ্যতের সিনেটর ট্যামি ডাকওয়ার্থের জীবন বাঁচাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি।

 

পরবর্তী সময়ে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে গাজায় গিয়ে ইসরাইলি হামলায় আহত ফিলিস্তিনিদের চিকিৎসা করেন হামাওয়ি। আহতদের মধ্যে গুরুতর জখম হওয়া শিশুরাও ছিল।

 

৩. রাশিদা তালিব

মিশিগানের ১২তম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে পঞ্চমবারের মতো নির্বাচিত হয়েছেন ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত ডেমোক্র্যাট রাশিদা তালিব।

 

২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে নির্বাচিত প্রথম দুই মুসলিম নারীর একজন ছিলেন তিনি। গাজায় ইসরাইলের যুদ্ধের বিরুদ্ধে সোচ্চার সমালোচক হিসেবে পরিচিত রাশিদা।

 

৪. ইলহান ওমর

মিনেসোটার পঞ্চম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন সোমালি বংশোদ্ভূত ডেমোক্র্যাট ইলহান ওমর।

 

কংগ্রেসে নির্বাচিত প্রথম মুসলিম নারীদের একজন তিনি। ইসরাইলকে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তার বারবার সমালোচনা করেছেন ইলহান। এ কারণে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আক্রমণেরও শিকার হয়েছেন তিনি।

 

৫. দারিয়ালিজা আভিলা শেভালিয়ে

নিউইয়র্কের ১৩তম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে জয় পেয়েছেন ৩৩ বছর বয়সি ডেমোক্র্যাট প্রার্থী দারিয়ালিজা আভিলা শেভালিয়ের। ডোমিনিকান বংশোদ্ভূত এই নারী যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে নির্বাচিত প্রথম লাতিনা মুসলিম নারী বলে জানা গেছে।

 

নাগরিক অধিকার নিয়ে আন্দোলন এবং ফিলিস্তিনপন্থি বিক্ষোভে অংশ নিয়ে আগে থেকেই পরিচিতি পেয়েছিলেন তিনি।

 

৬. আন্দ্রে কারসন ও লতিফা সাইমন

আরো দুই মুসলিম ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি পরিষদে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন। তাদের একজন আন্দ্রে কারসন। তিনি ২০০৮ সাল থেকে ইন্ডিয়ানার সপ্তম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্টের প্রতিনিধিত্ব করছেন। এবারও আসনটি ধরে রেখেছেন তিনি।

 

অন্যদিকে নাগরিক অধিকারকর্মী লতিফা সাইমন ক্যালিফোর্নিয়ার ১২তম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে আরেক মেয়াদে নির্বাচিত হয়েছেন।

 

৭. আবের কাওয়াস

ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত সংগঠক আবের কাওয়াস নিউইয়র্কের ১২তম স্টেট সিনেট ডিস্ট্রিক্ট থেকে নির্বাচিত হয়েছেন বলে জানা গেছে।

 

১৯৪৮ সালে তার পরিবার ফিলিস্তিন থেকে বাস্তুচ্যুত হয়েছিল। পরে তারা যুক্তরাষ্ট্রে বসতি স্থাপন করেন।

 

নির্বাচনি প্রচারে সাশ্রয়ী আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা, অভিবাসীদের অধিকার এবং গাজায় ইসরাইলের গণহত্যামূলক যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়নের বিরোধিতার বিষয়গুলো তুলে ধরেন কাওয়াস।

 

৮. আব্বাস আলাউয়েহ

লেবানিজ বংশোদ্ভূত ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আব্বাস আলাউয়েহ মিশিগানের দ্বিতীয় স্টেট সিনেট ডিস্ট্রিক্ট থেকে নির্বাচিত হয়েছেন বলে জানা গেছে। এই নির্বাচনি এলাকার মধ্যে ডিয়ারবর্ন ও আশপাশের কয়েকটি সম্প্রদায় রয়েছে।

 

২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের ইসরাইলনীতির প্রতিবাদে গড়ে ওঠা ‘আনকমিটেড’ আন্দোলন প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখেছিলেন আলাউয়েহ।

 

৯. নাবিলা সাইয়েদ

ইলিনয়ের ২৬তম স্টেট সিনেট ডিস্ট্রিক্টে রিপাবলিকান প্রার্থী ডারবি হিলসকে পরাজিত করেছেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত মুসলিম ডেমোক্র্যাট নাবিলা সাইয়েদ।

 

এর আগে তিনি অঙ্গরাজ্যের প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য ছিলেন। এবারের জয়ের মধ্য দিয়ে আসনটি রিপাবলিকানদের কাছ থেকে ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে এসেছে।

 

অন্যান্য আরব ও মুসলিম প্রার্থীর জয়

ইলিনয়ের কংগ্রেসনাল আসন ধরে রেখেছেন আরব বংশোদ্ভূত রিপাবলিকান ড্যারিন লাহুড। তার প্রপিতামহ ও প্রপিতামহী লেবানন থেকে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী হয়েছিলেন। নিজের লেবানিজ বংশপরিচয় নিয়ে গর্বের কথা জানিয়েছেন তিনি।

 

লাহুড বলেছেন, ‘এই বংশপরিচয় নিয়ে আমি খুবই গর্বিত।’

 

যুক্তরাষ্ট্র-লেবানন ফ্রেন্ডশিপ ককাসের সহসভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। ওয়াশিংটন ও বৈরুতের সম্পর্ক জোরদার করতে কাজ করেছেন লাহুড।

 

এ ছাড়া অঙ্গরাজ্যগুলোর আইনসভা নির্বাচনে কয়েকজন ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত প্রার্থী জয় পেয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন কলোরাডোর ২৯তম স্টেট সিনেট ডিস্ট্রিক্টের ইমান জোদেহ এবং জর্জিয়ার সপ্তম স্টেট সিনেট ডিস্ট্রিক্টের রুয়া রোমান।

 

ইলিনয়ে ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদেলনাসের রশিদও অঙ্গরাজ্যের প্রতিনিধি পরিষদের আসন ধরে রাখবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

 

নির্বাচনে জয়ী অন্য মুসলিম নারীদের মধ্যে রয়েছেন মিনেসোটার জয়নব মোহাম্মদ, ওহাইওর মুনিরা আবদুল্লাহি, কানেকটিকাটের মরিয়ম খান এবং ডেলাওয়ারের মদিনা উইলসন-অ্যান্টন।

 

এ ছাড়া টেক্সাসে পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত আইনপ্রণেতা সালমান ভোজানি ও সুলেমান লালানি পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন। কানেকটিকাটের স্টেট সিনেট আসন ধরে রেখেছেন সৌদ আনোয়ার। পেনসিলভানিয়ার প্রতিনিধি পরিষদে আরেক মেয়াদে নির্বাচিত হয়েছেন তারিক খান।