Image description

ইসরায়েলের এবারের নির্বাচনে প্রথমবার ভোট দিয়েছেন দেশটির ফিলিস্তিনি নাগরিক ও সাংবাদিক নাঘাম জবিদাত। দীর্ঘদিন ভোট বর্জন করে আসা জবিদাত শেষ পর্যন্ত ভোটকেন্দ্রে গেলেও বাড়ি ফিরে স্বস্তি পাননি। বরং তার মনে হয়েছে, নিজের জনগণকে নিপীড়নকারী একটি ব্যবস্থাকে গণতান্ত্রিক বৈধতা দেওয়ার প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়েছেন তিনি। তাই ভোট দিয়ে বাড়ি ফিরে ‘লজ্জা নিয়ে’ ঘুমাতে গিয়েছিলেন। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম হারেৎজে প্রকাশিত এক মতামতধর্মী নিবন্ধে নিজের এই অভিজ্ঞতার কথা লিখেছেন তিনি।

জবিদাতের এই অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলে যায় এবারের নির্বাচনে ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের বৃহত্তর চিত্র। ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে দেশটির আরব সম্প্রদায়ের ভোটদানের হার বেড়ে প্রায় ৭৬ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছেছে। কোনো কোনো হিসাবে তা প্রায় ৮০ শতাংশ। ২০২২ সালের নির্বাচনে এই হার ছিল ৫৩ দশমিক ২ শতাংশ। একই নির্বাচনে দেশটির সামগ্রিক ভোটার উপস্থিতিও ৭৭ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছেছে, যা ১৯৯৯ সালের পর সর্বোচ্চ।

ভোটার উপস্থিতি বৃদ্ধির পাশাপাশি পার্লামেন্ট নেসেটে (ইসরায়েলের পার্লামেন্ট) প্রতিনিধিত্বও বেড়েছে আরব দলগুলোর। এবারের নির্বাচনে আরব নেতৃত্বাধীন জয়েন্ট লিস্ট ও রা’আম যৌথভাবে ১৯টি আসন পেয়েছে। আগের পার্লামেন্টে দল দুটির আসন ছিল মোট ১০টি। নতুন এই ফল ইসরায়েলের রাজনীতিতে ফিলিস্তিনি নাগরিকদের অংশগ্রহণের গুরুত্ব বাড়িয়েছে। তবে নির্বাচনে অংশ নিয়েও রাজনৈতিকভাবে উপেক্ষিত থাকার অভিযোগ তুলেছেন জবিদাত।

হারেৎজে প্রকাশিত নিবন্ধে তিনি লিখেছেন, অনেক আগেই এবারের নির্বাচনে ভোট না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কারণ, নেসেটে ফিলিস্তিনিদের উপস্থিতি কখনো অর্থবহ রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হতে দেখেননি তিনি। তার ভাষায়, ‘আমাদের ইস্যুগুলো সব সময়ই উপেক্ষিত হয়। আরব রাজনীতিকদেরও নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে থেকেই রাজনীতি করার সুযোগ দেওয়া হয়।’

ব্যালট বাক্সে খামটি ফেলার পরও কোনো স্বস্তি আসেনি। মনে হয়নি, সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছি

তাই ভোট না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন জবিদাত। তার আশঙ্কা ছিল, ভোট দিলে এমন একটি ব্যবস্থাকে গণতান্ত্রিক হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হবে, যে ব্যবস্থা তার জনগণকে নিপীড়ন করে।

তবে নির্বাচনের দিন নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে দ্বিধায় পড়েন তিনি। আশপাশে বছরের পর বছর ভোট বর্জন করে আসা অনেক মানুষকেও এবার ভোট দিতে যেতে দেখেন। তখন নিজেকে প্রশ্ন করেন, বাড়িতে থেকে কি নিজের নীতিতে অটল থাকবেন, নাকি ভোট না দেওয়ার সিদ্ধান্তকে ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ না করার অভিযোগ তোলার সুযোগ করে দেবেন?

শেষ পর্যন্ত দিনের বেশির ভাগ সময় উত্তরাঞ্চলের আরব অধ্যুষিত শহরগুলোতে ঘুরে ভোটারদের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। জানতে চান, তারা কেন ভোট দিতে এসেছেন এবং কী পরিবর্তনের প্রত্যাশা করছেন। দিনের শেষ দিকে নিজের শহর সাখনিনের পুরনো মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে স্থাপিত ভোটকেন্দ্রে যান।

শেষ পর্যন্ত ভোট দিলেও কোনো স্বস্তি পাননি জবিদাত। তিনি লিখেছেন, ‘ব্যালট বাক্সে খামটি ফেলার পরও কোনো স্বস্তি আসেনি। মনে হয়নি, সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’ তবে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার সময় তার মনে একটি আশা ছিল—গাজা বা পশ্চিম তীরের কোনো একটি পরিবার যেন কিছুটা হলেও কম একাকিত্ব অনুভব করে।

জবিদাতের মতে, ইসরায়েলের গণতন্ত্রের প্রতি নতুন করে বিশ্বাস জন্মানোয় তিনি ভোট দেননি। বরং ফিলিস্তিনিদের নিজেদের বঞ্চনার জন্য দায়ী করার অভিযোগের জবাব দিতেই ভোট দিয়েছেন। তার ভাষায়, ‘শেষ পর্যন্ত ভোট দিয়েছি, কারণ হঠাৎ করে ইসরায়েলের গণতন্ত্রে বিশ্বাস জন্মেছে, তা নয়।’

তিনি লিখেছেন, ফিলিস্তিনিদের প্রায়ই বলা হয়, তারা নিজেদের বাড়িঘর ছেড়ে চলে গেছেন, যথেষ্ট রাজনৈতিক অংশগ্রহণ করেন না কিংবা যথেষ্ট সহযোগিতা করেন না। এসব অভিযোগ তুলে তাদের বঞ্চনার দায় তাদের ওপরই চাপানো হয়। এই অভিযোগের সুযোগ বন্ধ করতেই ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিকরা উত্তরের আরব শহর শফারামে ভোট দেওয়ার অপেক্ষায় আছেন— নাঘাম জবিদাতএবারের নির্বাচনে ফিলিস্তিনি নাগরিকদের ব্যাপক অংশগ্রহণের পেছনে ক্ষোভ ও নিরাপত্তাহীনতাও কাজ করেছে বলে মনে করেন জবিদাত। তার মতে, যা অবশিষ্ট আছে, তা হারানোর ভয়, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং ভোট না দিলে আরও বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ার আশঙ্কা অনেককে ভোটকেন্দ্রে নিয়ে গেছে। তবে তার বক্তব্য, ভোট দিতে হলে এই ব্যবস্থার ওপর আস্থা রাখতে হবে, এমন কোনো শর্ত নেই।

নির্বাচনে আরব দলগুলোর আসন বৃদ্ধির পরও সরকার গঠনের প্রশ্নে তাদের রাজনৈতিক অবস্থান কতটা গুরুত্ব পাবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। ১২০ আসনের নেসেটে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ৬১টি আসন। চূড়ান্ত ফল অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ৫৩টি আসন। অন্যদিকে গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট পেয়েছে ৪৮টি। ফলে আরব দলগুলোর ১৯টি আসন সরকার গঠনের সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

কিন্তু নির্বাচনের পর বিরোধী জোটের নেতা আইজেনকোট একটি জায়নবাদী সরকার গঠনের পক্ষে অবস্থান জানান। জবিদাতের মতে, এই বক্তব্য তার কাছে ছিল আরেকটি অপমান। কারণ, ফিলিস্তিনি নাগরিকেরা বিপুলসংখ্যায় ভোট দিয়ে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশ নিলেও তাদের সমান অংশীদার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে না।

তিনি লিখেছেন, ‘আমার ভোট আমাকে ইহুদি ইসরায়েলিদের সমান অংশীদার করেনি।’ তার মতে, রাজনীতিকেরা যে জনগণের ইচ্ছার প্রতিনিধিত্ব করার দাবি করেন, সেই জনগণের অংশ হিসেবেও ফিলিস্তিনি নাগরিকদের স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। তাদের অংশগ্রহণকে নির্বাচনী হিসাবে রাখা হয়েছে, কিন্তু তাদের উপস্থিতি মেনে নেওয়া হয়নি।

নিবন্ধে ইসরায়েলের রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বৈষম্য ও নিপীড়নের অভিযোগও তুলেছেন জবিদাত। তার দাবি, এই ব্যবস্থার অধীনেই গাজায় ফিলিস্তিনিরা নিহত হচ্ছেন, পশ্চিম তীর থেকে তাদের উচ্ছেদ করা হচ্ছে এবং ইসরায়েলের ভেতরেও তারা সশস্ত্র সহিংসতার ঝুঁকিতে রয়েছেন।

জবিদাত মনে করেন, একটি ভোট দিয়ে সহিংসতা বন্ধ করা কিংবা ফিলিস্তিনিদের ক্ষয়ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। তবে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় ফিলিস্তিনিদের অংশগ্রহণের সুযোগ রয়েছে, সেটি দেখানো জরুরি ছিল।

নিবন্ধের শেষাংশে নেতানিয়াহুবিরোধী জোটকে ভোট দেওয়া ইহুদি নাগরিকদের উদ্দেশে আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তার বক্তব্য, ফিলিস্তিনি নাগরিকেরা বিপুলসংখ্যায় ভোট দিয়ে নিজেদের দায়িত্ব পালন করেছেন। এবার তাদের নিরাপত্তা ও মর্যাদাকে ভবিষ্যৎ ইসরায়েলের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করার দায়িত্ব অন্যদের।

জবিদাত লিখেছেন, নিজের জনগণকে নিপীড়নকারী ব্যবস্থাকে গণতান্ত্রিক বৈধতা দেওয়ার বিরোধিতা করেন তিনি। সেই নীতিতে এখনো বিশ্বাস করেন। তবে একটি পরিবারের কষ্ট কিছুটা কমানোর সম্ভাবনা তৈরি করতে নিজের অবস্থানের সঙ্গে আপস করেছেন। তার প্রত্যাশা, ইসরায়েলের ইহুদি নাগরিকেরা ফিলিস্তিনিদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে তাকে ভুল প্রমাণ করবেন।