ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ভারসাম্য কিংবা আঞ্চলিক রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এই সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা, সামরিক কৌশল, বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা এবং রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা-চিন্তাকে দীর্ঘমেয়াদে বদলে দিতে পারে। যুদ্ধের তাৎক্ষণিক প্রভাব হিসেবে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব, গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি এবং যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র উৎপাদন ও সংগ্রহব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা ইতিমধ্যে আলোচনায় এসেছে।
কিন্তু এসব দৃশ্যমান পরিবর্তনের আড়ালে আরও গভীর কিছু রূপান্তরের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো নিজেদের প্রতিরক্ষার পাশাপাশি আক্রমণাত্মক সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে পারে, চীন উপসাগরীয় অঞ্চলে সরাসরি সামরিক উপস্থিতি প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন অনুভব করতে পারে, ইসরায়েল দীর্ঘস্থায়ী সীমান্তযুদ্ধের নীতি গ্রহণ করতে পারে এবং ইরান যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও আঞ্চলিক রাজনীতিতে নিজের প্রভাব বাড়ানোর সুযোগ পেতে পারে।
প্রভাবশালী মার্কিন সাময়িকী ফরেন পলিসিতে মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের নীতিবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট কেনেথ এম. পোলাক গত সোমবার তার বিশ্লেষণে এসব সম্ভাব্য পরিবর্তনের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তার মূল বক্তব্য হলো, যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। কিন্তু এর মধ্যেই এমন কিছু প্রবণতার সূচনা হয়েছে, যেগুলো ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রতিষ্ঠিত ধারণাগুলোকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করতে পারে। কয়েক দশক পর ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকালে এই যুদ্ধকে আধুনিক ভূরাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ হিসেবে বিবেচনা করা হতে পারে।
যুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, আধুনিক আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা অত্যন্ত কার্যকর হলেও প্রতিপক্ষের আক্রমণ পুরোপুরি বন্ধ করার নিশ্চয়তা দিতে পারে না। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল, ইউরোপের কয়েকটি দেশ এবং দক্ষিণ কোরিয়ার তৈরি প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র বা ইন্টারসেপ্টর ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে বলে পোলাক উল্লেখ করেছেন। পশ্চিমা যুদ্ধবিমানও ড্রোন ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের সক্ষমতা কমাতে ভূমিকা রেখেছে। ফলে ইরানের আক্রমণে যে পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হতে পারত, বাস্তবে তা অনেকাংশে সীমিত রাখা সম্ভব হয়েছে।
কিন্তু এই সাফল্যের মধ্যেই প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মৌলিক দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে। আক্রমণকারী ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র তুলনামূলকভাবে সস্তায় তৈরি করা যায়, মজুত রাখা যায় এবং বিভিন্ন স্থান থেকে উৎক্ষেপণ করা যায়। বিপরীতে, সেগুলো প্রতিহত করতে ব্যবহৃত অনেক উন্নত ইন্টারসেপ্টরের উৎপাদন ব্যয় বেশি এবং উৎপাদনেও সময় লাগে। অর্থাৎ, আক্রমণকারী তুলনামূলক কম ব্যয়ে বিপুলসংখ্যক অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে, অথচ আত্মরক্ষাকারীকে প্রতিটি হুমকি মোকাবিলায় ব্যয়বহুল অস্ত্র ব্যবহার করতে হয়। এটা শতকরা ৯০ ভাগ আক্রমণ ঠেকাতে পারলেও অবশিষ্ট ১০ ভাগের আঘাত অর্থনীতি ও সমাজে বড় ধরনের বিপর্যয় সৃষ্টি করতে পারে।
পোলাকের মতে, ইসরায়েল দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা অভিজ্ঞতা এবং অবকাঠামোগত প্রস্তুতির কারণে এ ধরনের আক্রমণের ধাক্কা সামলাতে তুলনামূলকভাবে বেশি সক্ষম। কিন্তু উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনৈতিক মডেল ভিন্ন। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইন, কুয়েত ও ওমানের অর্থনৈতিক বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো স্থিতিশীলতা, জ্বালানি উৎপাদন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ, আর্থিক সেবা ও পর্যটন। এসব দেশের শহর, বন্দর, শিল্পাঞ্চল ও জ্বালানি অবকাঠামোকে আন্তর্জাতিক ব্যবসার জন্য নিরাপদ পরিবেশ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। নিয়মিত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার আশঙ্কা সেই ধারণাকে দুর্বল করে দিতে পারে।
এখানে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণের পাশাপাশি আস্থার প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো দেশের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা অধিকাংশ হামলা ঠেকাতে সক্ষম হলেও বিনিয়োগকারী, জাহাজ চলাচলকারী প্রতিষ্ঠান, বিমা কোম্পানি কিংবা পর্যটকেরা যদি মনে করেন যে সেখানে নিয়মিত আক্রমণের ঝুঁকি রয়েছে, তাহলে অর্থনৈতিক কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে। জ্বালানি স্থাপনায় হামলার আশঙ্কা উৎপাদন ও রপ্তানির খরচ বাড়াতে পারে। বন্দর ও সমুদ্রপথের ঝুঁকি পণ্য পরিবহনে অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। বিমা ব্যয় বাড়লে বাণিজ্য আরও ব্যয়বহুল হবে। পর্যটন ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়বে। ফলে সামরিকভাবে অধিকাংশ আক্রমণ প্রতিহত করার সাফল্য অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য যথেষ্ট নাও হতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা-চিন্তায় বড় পরিবর্তন ঘটতে পারে। আগে এসব দেশের অনেকেই মনে করত, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি এবং ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কের মাধ্যমে ইরানের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব। ইরান বড় ধরনের আক্রমণ চালালে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল পাল্টা ব্যবস্থা নেবে—এমন ধারণাও তাদের নিরাপত্তা হিসাবের অংশ ছিল। সেই বিশ্বাসের ভিত্তি ছিল, ইরান বৃহত্তর সংঘাতের আশঙ্কায় নিজের প্রতিক্রিয়া সীমিত রাখবে।
কিন্তু পোলাকের ব্যাখ্যায়, বর্তমান যুদ্ধ সেই হিসাবকে দুর্বল করে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটানোর চেষ্টা করেও তা অর্জন করতে পারেনি। পরবর্তী সময়ে ওয়াশিংটন সেই লক্ষ্য থেকে সরে আসার ফলে তেহরানের সামনে নতুন হিসাব তৈরি হয়েছে। ইরান এখন বুঝতে পারে যে, উপসাগরীয় দেশগুলোকে সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের হুমকিতে রাখা এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য শুধু আকাশপথে আক্রমণ চালিয়ে ইরানের শাসনব্যবস্থা উৎখাত করা সম্ভব নয়-এমন উপলব্ধিও তেহরানের ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতাকে প্রভাবিত করতে পারে।
এই বাস্তবতায় উপসাগরীয় দেশগুলো কেবল প্রতিরক্ষামূলক অস্ত্রের ওপর নির্ভর না করে নিজেদের আক্রমণাত্মক সক্ষমতা বাড়াতে আগ্রহী হতে পারে। পোলাক উল্লেখ করেছেন, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও কুয়েত তুরস্কের তৈরি ড্রোন কেনার উদ্যোগ নিয়েছে বা এ ধরনের সক্ষমতা অর্জনে আগ্রহ দেখিয়েছে। সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোর সঙ্গে নিজেদের ড্রোন উৎপাদনের ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়ে কাজ করছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ইসরায়েল, চীন ও ইউক্রেনের কাছ থেকেও ড্রোন এবং ড্রোন উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করছে। কাতার ও বাহরাইনও একই ধরনের উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা করছে।
পোলাক এ পরিস্থিতিকে পারমাণবিক অস্ত্রের ভারসাম্যের সঙ্গে তুলনা করার সীমাবদ্ধতাও তুলে ধরেছেন। শীতল যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিরোধের কার্যকারিতা অনেকাংশে নির্ভর করত পারমাণবিক অস্ত্রের বিধ্বংসী ক্ষমতা এবং তার পরিণতি সম্পর্কে উভয় পক্ষের স্পষ্ট ধারণার ওপর। কিন্তু প্রচলিত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের ক্ষেত্রে সেই ধরনের নিশ্চিত হিসাব নেই। কোনো পক্ষ মনে করতে পারে যে, সীমিত আক্রমণের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানো যাবে, কিন্তু প্রতিপক্ষ সেটিকে বড় আক্রমণের সূচনা হিসেবে বিবেচনা করতে পারে। ফলে ভুল হিসাব, পাল্টা হামলা এবং অনিচ্ছাকৃত উত্তেজনা বৃদ্ধির ঝুঁকি থেকে যায়।
এ ছাড়া উপসাগরীয় দেশগুলো একবার নিজেদের সীমান্তের বাইরে সামরিক শক্তি প্রয়োগের সক্ষমতা অর্জন করলে সেই শক্তি শুধু আত্মরক্ষায় সীমাবদ্ধ থাকবে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। পোলাকের ঐতিহাসিক উদাহরণ অনুযায়ী, ১৯৭০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তৎকালীন শাহকে অস্ত্র দিয়ে আঞ্চলিক নিরাপত্তার দায়িত্বে বড় ভূমিকা রাখতে উৎসাহিত করেছিল। কিন্তু শাহ সেই সামরিক শক্তি ব্যবহার করে এমন কিছু পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, যা ওয়াশিংটনের পছন্দের সঙ্গে সব সময় সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। একইভাবে, গত এক দশকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির পর দেশটি ইয়েমেন, লিবিয়া, সুদান এবং হর্ন অব আফ্রিকা অঞ্চলে নিজস্ব স্বার্থে সক্রিয় হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে তার অবস্থান কখনো কখনো যুক্তরাষ্ট্রের নীতির সঙ্গে বিরোধপূর্ণ হয়েছে।
ইরান যুদ্ধের আরেকটি সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব চীনের ভূমিকাকে ঘিরে। পোলাকের মতে, গত প্রায় চার দশক ধরে চীন মধ্যপ্রাচ্যে এক ধরনের সুবিধাভোগী শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো নির্মাণ এবং জ্বালানি আমদানির মাধ্যমে দেশটি এ অঞ্চলে নিজের অর্থনৈতিক উপস্থিতি বিস্তৃত করেছে। কিন্তু আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব মূলত যুক্তরাষ্ট্রের ওপরই ছিল। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, আন্তরাষ্ট্রীয় বিরোধ এবং অভ্যন্তরীণ সংঘাত মোকাবিলায় ওয়াশিংটন সামরিক শক্তি ব্যবহার করেছে, আর বেইজিং তুলনামূলকভাবে কম নিরাপত্তা ব্যয়ে অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জন করেছে।
পোলাক লিখেছেন, একবার চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন উপমন্ত্রী তাকে বলেছিলেন, চীন মধ্যপ্রাচ্যের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক জটিলতা বোঝে না, তাই অঞ্চলটির শান্তি বজায় রাখার দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্রের। এই বক্তব্যের মাধ্যমে পোলাক বোঝাতে চেয়েছেন, চীন দীর্ঘদিন ধরে এ অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করার বিষয়টি গোপন করেনি। তবে তার মতে, বর্তমান সংঘাত সেই ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
চীনের জন্য মধ্যপ্রাচ্য কেবল একটি দূরবর্তী রাজনৈতিক অঞ্চল নয়; এটি তার জ্বালানি সরবরাহ, বাণিজ্য এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। পোলাকের হিসাবে, চীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল আমদানিকারক দেশ এবং তার তেল আমদানির সর্বোচ্চ প্রায় ৫০ শতাংশ উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আসে। উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে চীনের বার্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ৫০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি, যা ২০৩০ সালের মধ্যে ৮০০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। একই সঙ্গে এই অঞ্চল চীনা পণ্য ইউরোপ, পশ্চিম এশিয়া ও আফ্রিকায় পাঠানোর গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক পথ।
চীন অবশ্য কূটনৈতিকভাবে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় নয়। পাকিস্তানের মাধ্যমে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে মধ্যস্থতার চেষ্টা তার একটি উদাহরণ। কিন্তু পোলাকের মতে, এ প্রচেষ্টা এখনো সংঘাতের অবসান ঘটাতে পারেনি এবং আলোচনায় চীনের স্বার্থ কতটা বিবেচিত হচ্ছে, সেটিও স্পষ্ট নয়। ফলে বেইজিংয়ের সামনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, নিজের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার জন্য কি তাকে আরও প্রত্যক্ষ সামরিক সক্ষমতা অর্জন করতে হবে?
চীন যদি সেই পথে এগোয়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তাব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন ঘটতে পারে। ভারত মহাসাগর এবং উত্তর আরব সাগরে চীনা বিমানবাহী রণতরীর উপস্থিতি ভবিষ্যতে নতুন কৌশলগত গুরুত্ব পেতে পারে। তবে চীন এমন সিদ্ধান্ত নেবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত। সামরিক শক্তি বাড়ানো মানেই সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়া নয়; আবার সামরিক উপস্থিতি তৈরি করলেও আঞ্চলিক জটিলতা সামাল দেওয়া সহজ হবে না। তবু ইরান যুদ্ধ বেইজিংকে তার অর্থনৈতিক স্বার্থ ও সামরিক সক্ষমতার মধ্যে বিদ্যমান ব্যবধান নতুন করে মূল্যায়ন করতে বাধ্য করতে পারে। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের প্রতিযোগিতা শুধু এশিয়া বা প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সীমাবদ্ধ না থেকে মধ্যপ্রাচ্যেও আরও প্রত্যক্ষ রূপ নিতে পারে।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ইরানকে দুর্বল করার উদ্দেশ্যে শুরু হওয়া যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত দেশটির আঞ্চলিক প্রভাব বাড়িয়ে দিতে পারে কি না। পোলাকের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল ইরানের শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটানো। সেই লক্ষ্য অর্জিত না হলে অন্তত দেশটির আঞ্চলিক শক্তি প্রয়োগের সক্ষমতা ধ্বংস বা সীমিত করার পরিকল্পনা ছিল। যুদ্ধের প্রাথমিক আক্রমণে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনিসহ শীর্ষ নেতৃত্বের বড় অংশ নিহত হলেও শাসনব্যবস্থার পতন ঘটেনি। বরং পোলাকের মূল্যায়নে, এর ফলে ওয়াশিংটনকে আপাতত আরও কঠোর অবস্থানসম্পন্ন একটি নেতৃত্বের মুখোমুখি হতে হয়েছে।
খামেনি ছিলেন রক্ষণশীল এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি সম্পর্কে সতর্ক। পোলাকের মতে, তিনি প্রায়ই ইরানের কট্টরপন্থীদের আরও বড় আকারের সামরিক আক্রমণ চালানোর ইচ্ছাকে সীমিত করতেন। তার আশঙ্কা ছিল, সংঘাত বাড়লে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের শাসনব্যবস্থা উৎখাতের জন্য আরও ব্যাপক পদক্ষেপ নিতে পারে। কিন্তু তার মৃত্যুর পর যারা নেতৃত্বে এসেছে, তারা তুলনামূলকভাবে বেশি আক্রমণাত্মক ও ঝুঁকি নিতে আগ্রহী। ফলে যুদ্ধ ইরানের সামরিক সক্ষমতার কিছু অংশ ধ্বংস করলেও দেশটির নীতিনির্ধারণে সংযমের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাধা সরিয়ে দিতে পারে।
অবশ্য সামরিক ক্ষয়ক্ষতি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। পোলাকের ধারণা, যুদ্ধ ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎপাদন কর্মসূচিকে কয়েক মাস বা তারও বেশি সময়ের জন্য পিছিয়ে দিতে পারে। দেশটির নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীরও ক্ষতি হয়েছে। পারমাণবিক কর্মসূচি কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা নির্ধারণ করা কঠিন। তবে ইরান পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে এবং রাশিয়া ও চীনের সহায়তায় তার অস্ত্রব্যবস্থার গুণগত মান উন্নত করার সম্ভাবনাও রয়েছে। ফলে যুদ্ধের সামরিক ফলাফলকে শুধু ধ্বংস হওয়া অস্ত্র বা স্থাপনার হিসাব দিয়ে বিচার করা যথেষ্ট নয়; ইরান ভবিষ্যতে কীভাবে তার অবশিষ্ট সক্ষমতা ব্যবহার করবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
পোলাকের বিশ্লেষণে হরমুজ প্রণালি এই যুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত বিষয়গুলোর একটি। ইরান এখন উপলব্ধি করতে পারে যে, এই নৌপথে জাহাজ চলাচল সীমিত বা বন্ধ করার হুমকি দিয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব। একই সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর হাজার হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করে সরাসরি আঘাতের তুলনায় অনেক বড় অর্থনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব তৈরি করা যায়। ইরান যদি মনে করে যে এসব পদক্ষেপের পরও যুক্তরাষ্ট্র তার শাসনব্যবস্থা উৎখাতের জন্য সর্বাত্মক সামরিক অভিযান চালাবে না, তাহলে ভবিষ্যতে একই ধরনের চাপ প্রয়োগের প্রবণতা বাড়তে পারে।
এখানে পারমাণবিক কর্মসূচির প্রশ্নটিও নতুন গুরুত্ব পাচ্ছে। পোলাক উল্লেখ করেছেন, ইরানের বর্তমান নেতৃত্বের একটি অংশ ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তির বিরোধিতা করেছিল। তাদের ধারণা ছিল, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেয়ে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করা বেশি কার্যকর হতে পারে। পারমাণবিক অস্ত্র থাকলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আক্রমণ ঠেকানো যাবে এবং একই সঙ্গে ইরান আঞ্চলিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগের স্বাধীনতা পাবে—এমন বিশ্বাস তাদের মধ্যে থাকতে পারে। যদি যুদ্ধ সেই গোষ্ঠীর অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করে, তাহলে নতুন পারমাণবিক সমঝোতা অর্জন করা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
অর্থাৎ, ইরানের সামরিক স্থাপনা ধ্বংস করা হলেও যুদ্ধ দেশটির নিরাপত্তা-চিন্তাকে এমন দিকে ঠেলে দিতে পারে, যেখানে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের আকাঙ্ক্ষা আরও প্রবল হবে। ইরানের ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে নেতৃত্বের অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য, যুদ্ধের চূড়ান্ত ফলাফল, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং কূটনৈতিক সমঝোতার সুযোগের ওপর।

রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে ইরানের সম্পর্কও যুদ্ধের কারণে আরও ঘনিষ্ঠ হতে পারে। পোলাকের মতে, ২০২৫ সালের জুনের সংঘাতের পর ইরানের কিছু কট্টরপন্থী রাশিয়া ও চীনের সহায়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। কিন্তু এবারের যুদ্ধে দুই দেশই ইরানকে সামরিক সরঞ্জাম, আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের যন্ত্রাংশ এবং লক্ষ্যবস্তুসংক্রান্ত তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছে। এই সহায়তা ইরানের অস্ত্রভান্ডার পুনর্গঠন ও উন্নত করতে ভূমিকা রাখতে পারে। ফলে যুদ্ধের আগে যে সহযোগিতা সীমিত ও অনিশ্চিত ছিল, যুদ্ধের পরে তা আরও কার্যকর অংশীদারত্বে রূপ নিতে পারে।
এই পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি কৌশলগত দ্বন্দ্ব তৈরি করে। ওয়াশিংটন যদি ইরানের আঞ্চলিক শক্তি সীমিত করতে চায়, তাহলে তাকে শুধু দেশটির সামরিক স্থাপনা ধ্বংস করলেই চলবে না; ইরান যাতে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করতে না পারে এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর নির্বিচারে হামলার মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি করতে না পারে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় যুদ্ধের শেষে ইরান সামরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কৌশলগতভাবে আরও প্রভাবশালী হয়ে উঠতে পারে। বিপরীতে, ইরানের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র যদি সংঘাতকে আরও দীর্ঘায়িত করে, তাহলে উপসাগরীয় অর্থনীতি, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে।
কেনেথ এম. পোলাকের বিশ্লেষণ ইরান যুদ্ধের এমন কিছু সম্ভাব্য পরিণতি সামনে এনেছে, যা তাৎক্ষণিক সামরিক ফলাফলের চেয়ে অনেক বেশি বিস্তৃত। ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যাপক ব্যবহার যুদ্ধের ব্যয় ও প্রতিরক্ষার হিসাব বদলে দিচ্ছে। উপসাগরীয় দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তার জন্য আক্রমণাত্মক সক্ষমতা বাড়াতে পারে, যার ফলে আঞ্চলিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হতে পারে। চীন তার অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর প্রয়োজন অনুভব করতে পারে। ইসরায়েল সীমান্তের বাইরে দীর্ঘস্থায়ী সামরিক অভিযানকে নিরাপত্তা কৌশলের স্থায়ী অংশ হিসেবে গ্রহণ করলে তার সমাজ, অর্থনীতি ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক নতুন চাপের মুখে পড়তে পারে। আর ইরান যদি যুদ্ধের মধ্য দিয়ে হরমুজ প্রণালি ও উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর চাপ প্রয়োগের কার্যকারিতা সম্পর্কে আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে, তাহলে দেশটির সামরিক ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও আঞ্চলিক প্রভাব বাড়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে এসব পরিবর্তন অনিবার্য নয়। যুদ্ধের সমাপ্তি কীভাবে ঘটবে, আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলো নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে কী সিদ্ধান্ত নেবে এবং যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়া ভবিষ্যতে কী ভূমিকা পালন করবে—এসবের ওপর পরিণতি নির্ভর করবে। পোলাকের শেষ সতর্কবার্তাটি তাই বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ: ইতিহাসের বড় পরিবর্তন সাধারণত অতীতের দিকে ফিরে তাকালে স্পষ্ট হয়, কিন্তু নীতিনির্ধারণের সবচেয়ে কঠিন কাজ হলো পরিবর্তনের লক্ষণগুলো বর্তমানেই শনাক্ত করা। ইরান যুদ্ধের ক্ষেত্রে সেই লক্ষণগুলো ইতিমধ্যে দৃশ্যমান।