ইরানের নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন মেহেরদাদ আখলাঘি কেতাবচি। এমন এক সময়ে তাকে ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত করা হয়েছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আখলাঘি ইরানের সামরিক শিল্প অবকাঠামো পুনর্গঠন ও সম্প্রসারণের দায়িত্ব পালন করবেন, যা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ব্যাপক আক্রমণের শিকার হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে অনলাইনে অনুষ্ঠিত হয়ে আসা সংসদ রোববার ৬৮ বছর বয়সী এই ব্যক্তিকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এবং সশস্ত্র বাহিনীর লজিস্টিকস বিভাগের নেতৃত্ব নেওয়ার সিদ্ধান্তে অনুমোদন দিয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধের প্রথম দিনেই ইরানের সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী আজিজ নাসিরজাদেহ সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ দেশটির বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তার সঙ্গে নিহত হন।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক কমিশনসহ সামরিক কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের পর আখলাঘির প্রতিরক্ষাসংক্রান্ত পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়।
ক্ষেপণাস্ত্র ও সামরিক প্রযুক্তিতে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, আখলাঘির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোতে কাজ করার অভিজ্ঞতা ৪২ বছরের বেশি। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, কঠিন জ্বালানিচালিত রকেট ইঞ্জিন, মহাকাশ প্রযুক্তি এবং সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদনে তার বিশেষ দক্ষতা রয়েছে।
এর আগে তিনি শহীদ বাকেরি ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রুপ, অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ অর্গানাইজেশন এবং ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিজ অর্গানাইজেশনের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এসব সংস্থা এবং আখলাঘি– উভয়ই যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছেন। তার ওপর জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞাও রয়েছে।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যম তাসনিমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত কয়েক দশকে দেশটির বিভিন্ন ক্ষেপণাস্ত্র ও অস্ত্র উন্নয়ন প্রকল্পে ভূমিকা রেখেছেন আখলাঘি।
ইরানের সেজ্জিল ও জুলফাগার সিরিজের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণে তার সম্পৃক্ততার কথা জানা যায়। এছাড়া আলমাস ক্ষেপণাস্ত্র এবং ইয়াসিন গাইডেড বোমার মতো নির্ভুল নিশানায় আঘাত হানতে সক্ষম অস্ত্রের উন্নয়নেও তিনি ভূমিকা রেখেছেন বলে প্রতিবেদনগুলোতে উল্লেখ করা হয়েছে।
মহাকাশে স্যাটেলাইট পাঠানোর রকেট, গবেষণামূলক রকেট এবং সেমনান প্রদেশের ইমাম খোমেনি মহাকাশকেন্দ্রের অবকাঠামো সম্পর্কেও তার বিশেষজ্ঞ জ্ঞান রয়েছে।
ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা
চলতি মাসে ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রেজা তালায়ি-নিক সাংবাদিকদের বলেন, কৌশলগত অস্ত্রের পরিমাণ ও গুণগত মান বাড়ানোর প্রয়োজন থেকেই আখলাঘিকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘আক্রমণাত্মক অস্ত্রগুলোর সক্ষমতা সক্রিয়ভাবে উন্নত করা হচ্ছে।’
যুক্তরাষ্ট্র বারবার দাবি করেছে, ইরানের সামরিক শিল্পের অধিকাংশ সক্ষমতা ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। তবে তেহরানের বক্তব্য, মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার নাগালের বাইরে এখনও তাদের উল্লেখযোগ্য আক্রমণাত্মক ও প্রতিরক্ষামূলক সক্ষমতা রয়েছে। যুদ্ধের অভিজ্ঞতার আলোকে এসব অস্ত্রের উন্নয়নও করা হয়েছে বলে দাবি করছে ইরান।
পার্লামেন্ট সদস্যদের আখলাঘি জানিয়েছেন, যুদ্ধ চলাকালে এবং যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে সামরিক বাহিনীর প্রয়োজনগুলো আরও ভালোভাবে বুঝতে তিনি আইআরজিসির সর্বাধিনায়ক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমাদ ওয়াহিদিসহ জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে তার অগ্রাধিকারগুলোর মধ্যে রয়েছে দ্রুত সামরিক শিল্পের উন্নয়ন, আকাশ প্রতিরক্ষা জোরদার, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার, সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের কল্যাণ এবং আন্তর্জাতিক সামরিক সহযোগিতা সম্প্রসারণ।
ট্রাম্পকে কড়া বার্তা
রোববার প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে প্রথম বক্তব্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনকে কড়া বার্তা দেন আখলাঘি। চলতি মাসে ইরানের পারমাণবিক ও জ্বালানি অবকাঠামোয় ‘সব বোমার জননী’ ব্যবহারের হুমকি দিয়েছিল ওয়াশিংটন।
আখলাঘি বলেন, ‘আমরা প্রস্তুতি নিয়েছি এবং নিশ্চিন্তে আমাদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছি।’
মার্কিন প্রেসিডেন্টকে উদ্দেশ করে তিনি আরও বলেন, ‘তার উচিত আমাদের অঞ্চল থেকে নিজের সেনাদের অক্ষত অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়ার কথা ভাবা। তিনি যদি একটি বোমাও ফেলেন, তাহলে দেখতে হবে তার কত সেনাকে অনুভূমিক অবস্থায় সরিয়ে নিতে হয়।’
তার এই বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে তেহরানের কঠোর অবস্থান এবং যুদ্ধের মধ্যে নিজেদের সামরিক সক্ষমতা ধরে রাখার বার্তা স্পষ্ট হয়েছে।
সূত্র: আল-জাজিরা