পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে ক্ষমতার চেয়ার থেকে সরানো গেছে, কিন্তু আলোচনার টেবিল থেকে সরানো যাচ্ছে না। ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে তিনি কারাগারে। তাঁর মুক্তির দাবি, শারীরিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ আর দলটির আন্দোলন ঘিরে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সরকার ও বিরোধীদের বিরোধ ক্রমে তীব্র হচ্ছে। এটি এরই মধ্যে সংঘাতের দিকে চলে গেছে।
সেই সংঘাত নতুন মোড় নেয় ১১ অক্টোবর। ওই দিন খাইবার পাখতুনখাওয়ায় জরুরি অবস্থা জারি হয়। প্রাদেশিক প্রশাসনে কেন্দ্রীয় হস্তক্ষেপের পথ খুলে যায়। প্রদেশটি পিটিআইয়ের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। সরকারের যুক্তি, সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা আর নিরাপত্তা পরিস্থিতি সামলাতে কেন্দ্রের হাত দীর্ঘ করা দরকার। পিটিআইয়ের অভিযোগ উল্টো। তাদের মতে, নিরাপত্তার অজুহাতে তাদের রাজনৈতিক শক্তি খর্ব করা হচ্ছে।
এর আগে ইমরানের মুক্তি ও চিকিৎসার দাবিতে ইসলামাবাদ অভিমুখে বিক্ষোভের প্রস্তুতি নিচ্ছিল দলটি। তাই প্রাদেশিক সরকারের ওপর কেন্দ্রের হস্তক্ষেপকে পিটিআই নিছক প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছে না। একে দেখছে বড় রাজনৈতিক সংঘাতের অংশ হিসেবে। রয়টার্স লিখেছে, ইমরানকে ঘিরে সংকট এবং সরকারের সঙ্গে পিটিআইয়ের আলোচনা অচলাবস্থায় পড়েছে।
কেমন আছেন ইমরান খান, মুক্তির পথ কতটা কঠিন
ইমরান খানের বিরুদ্ধে দুর্নীতিসহ একাধিক মামলা আছে। তিনি ও তাঁর দল বলে আসছেন, এসব মামলা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সাজানো। তবে তিনটি বিষয় এক নয়: তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ, আদালতের সিদ্ধান্ত এবং মামলা যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, এই দাবি। মুক্তির প্রশ্ন ঝুলে আছে মামলাগুলোর পরিণতি, জামিন ও আপিলের সুযোগ আর রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর।
তাঁর শারীরিক সুস্থতাও আলোচনার বড় বিষয়। পরিবার ও দলের পক্ষ থেকে তাঁর দৃষ্টিশক্তি এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিয়ে উদ্বেগ জানানো হয়েছে। কারাগারে তাঁর চিকিৎসা, চিকিৎসকদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং পরিবারের সাক্ষাতের সুযোগ নিয়েও অভিযোগ আছে। সরকার পক্ষ বলছে, তিনি সুস্থ আছেন।
বাস্তবতা হলো, দীর্ঘ বন্দিদশা পিটিআইকে নেতৃত্বের সংকটে ফেলেছে। আবার একই বন্দিদশা তাঁর মুক্তির দাবিকে দলটির কর্মী-সমর্থকদের ঐক্যসূত্র বানিয়ে দিয়েছে। সরকার ইমরানকে আটকে রেখে তাঁর রাজনৈতিক প্রভাব কমাতে চাইছে। এই কৌশল কতটা কাজ করবে, তা এখনই বলা যাচ্ছে না।
ইমরানের বিকল্প কে, পিটিআইয়ের ভবিষ্যৎ কী
ইমরানের অনুপস্থিতিতে দলের কয়েকজন নেতা সামনে এসেছেন। তাঁদের মধ্যে আছেন দলের চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার গহর আলী খান, মহাসচিব সালমান আকরাম রাজা এবং খাইবার পাখতুনখাওয়ার মুখ্যমন্ত্রী সোহেল আফ্রিদি। তবে এখন পর্যন্ত কেউই ইমরানের সমান রাজনৈতিক কর্তৃত্ব দাঁড় করাতে পারেননি।
গহর আলী খান দলের সাংগঠনিক নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। সালমান আকরাম রাজা আইনি ও রাজনৈতিক কৌশল ঠিক করার কাজে যুক্ত। সোহেল আফ্রিদি আলোচনায় এসেছেন প্রাদেশিক রাজনীতি এবং ইমরানের মুক্তির দাবিতে আন্দোলন সংগঠিত করার মধ্য দিয়ে।
আল জাজিরার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, দলটির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে তিনটি বিষয়ের ওপর। ইমরানের মুক্তির দাবিতে সমর্থকদের ঐক্য ধরে রাখা। দুই. দলের বিভিন্ন স্তরের নেতাদের মধ্যে সমন্বয় বজায় রাখা এবং তিন. একজন নেতার মুক্তির দাবিতে আটকে না থেকে জাতীয় রাজনীতিতে কার্যকর কর্মসূচি ও নেতৃত্বের কাঠামো গড়ে তোলা।
দল যৌথ নেতৃত্ব দাঁড় করাতে পারলে ইমরানের দীর্ঘ অনুপস্থিতিতেও রাজনীতির চাকা ঘুরবে। আর নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব বাড়লে সংগঠন দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। তবে এখন পর্যন্ত খাইবার পাখতুনখাওয়ার বাইরে বিক্ষোভ ছড়িয়ে দিতে পারেননি পিটিআইয়ের নেতারা।
ইমরান প্রশ্নে শাহবাজ সরকার ও সেনাবাহিনী কী ভাবছে
পাকিস্তানের রাজনৈতিক সংকটের কেন্দ্রে আছে বেসামরিক সরকার আর সামরিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতার সম্পর্ক। দেশটির ইতিহাসে সেনাবাহিনী একাধিকবার সরাসরি ক্ষমতা নিয়েছে। সামরিক শাসনের বাইরেও রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, পররাষ্ট্রনীতি আর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে তাদের প্রভাব দীর্ঘদিনের বাস্তবতা।
সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের অধীনেও সামরিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা ও প্রভাব নিয়ে আলোচনা চলছে। ২০২৫ সালের সাংবিধানিক পরিবর্তন এবং ২০২৬ সালে সামরিক কমান্ড-সংক্রান্ত আইনে সংশোধন সেনাবাহিনীর প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থান নিয়ে নতুন বিতর্ক তুলেছে।
শাহবাজ সরকারের অবস্থানও এক রঙের নয়। সরকার নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা আর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার যুক্তি দিচ্ছে। বিরোধী দলের অভিযোগ, প্রশাসনিক ক্ষমতা ও আইন প্রয়োগ করে তাদের রাজনৈতিক পরিসর ছোট করা হচ্ছে। খাইবার পাখতুনখাওয়ায় কেন্দ্রের হস্তক্ষেপ এই বিরোধকে আরও ধারালো করেছে।
বিক্ষোভ কি সরকার পতন কিংবা সেনা অভ্যুত্থানের দিকে যাবে
ইমরানের মুক্তির দাবিতে আন্দোলন, প্রাদেশিক সরকারের ওপর কেন্দ্রের হস্তক্ষেপ আর আলোচনায় অচলাবস্থা মিলিয়ে পাকিস্তানে সংঘাত বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিক্ষোভ কতটা ছড়াবে, তা নির্ভর করছে কয়েকটি বিষয়ের ওপর। পিটিআই কতটা সংগঠিতভাবে বিভিন্ন প্রদেশে সমর্থকদের নামাতে পারে, সরকার আন্দোলন কীভাবে সামলায় এবং নতুন কোনো ঘটনা জনমনে প্রতিক্রিয়া তোলে কি না, এসব দেখতে হবে। ইমরানের চিকিৎসা বা কারাগারে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ নিয়ে নতুন বিরোধ তৈরি হলেও আন্দোলন তীব্র হতে পারে। কার্যকর রাজনৈতিক সংলাপে উত্তেজনা কমারও সুযোগ আছে।
সরকার পতনের প্রশ্নে আসল হিসাব পার্লামেন্টে। ক্ষমতাসীন জোট সেখানে সমর্থন ধরে রাখতে পারছে কি না, শরিকদের অবস্থান বদলাচ্ছে কি না আর খাইবার পাখতুনখাওয়ার জরুরি অবস্থা নিয়ে আদালত কী রায় দেয়, তার ওপর সরকারের স্থিতি নির্ভর করবে।
পাকিস্তানের ইতিহাসে সামরিক হস্তক্ষেপের নজির কম নেই। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেনা অভ্যুত্থান আসন্ন, এমনটি এখনই বলা যাচ্ছে না। বরং সেনাবাহিনীর জোরালো অবস্থানের কারণে সরাসরি ক্ষমতা না নিয়েও রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদের ভূমিকা বাড়তে পারে।
শাহবাজ সরকারের সামনে তাই চ্যালেঞ্জ একাধিক: বিরোধী দলের সঙ্গে সংঘাত নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা পরিস্থিতি সামলানো, আইনসভায় সমর্থন ধরে রাখা এবং বেসামরিক শাসনের কার্যকারিতা বজায় রাখা।
কোন দিকে যাবে পাকিস্তান
আপাতত পাকিস্তানের সামনে তিনটি পথ খোলা। প্রথমটি দীর্ঘ রাজনৈতিক অচলাবস্থা। ইমরান কারাগারে থাকবেন, পিটিআই আন্দোলন চালাবে, আর সরকার প্রশাসনিক ও আইনি পদক্ষেপে পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা করবে।
দ্বিতীয়টি সংঘাতের বিস্তার। গ্রেপ্তার, সহিংসতা কিংবা নতুন কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত আন্দোলনকে তীব্রতর করতে পারে।
তৃতীয়টি রাজনৈতিক সমঝোতা। এর মধ্য দিয়ে ইমরানের চিকিৎসা ও তার সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ, বিরোধী দলের রাজনৈতিক অধিকার এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা এগোতে পারে।
কোন পথে হাঁটবে দেশটি, তা বুঝতে চোখ রাখতে হবে চারটি জায়গায়—জরুরি অবস্থা নিয়ে আদালতের সিদ্ধান্ত, পিটিআইয়ের সাংগঠনিক ঐক্য, সরকারের সঙ্গে সংলাপে অগ্রগতি এবং সামরিক নেতৃত্বের ভূমিকা।
ইমরান খানকে দীর্ঘদিন কারাগারে রাখলে তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সীমিত হতে পারে। কিন্তু তাতে তাঁর সমর্থকদের অবস্থানও একই হারে দুর্বল হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। আবার তাঁর অনুপস্থিতিতে নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব ও সাংগঠনিক দুর্বলতা পিটিআইকে চাপে ফেলতে পারে।
পাকিস্তানের বর্তমান সংকট তাই শুধু ইমরানের মুক্তি কিংবা শাহবাজ সরকারের টিকে থাকার প্রশ্ন নয়। এতে আছে আরও বড় প্রশ্ন। যেমন– রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, বিচারব্যবস্থা, প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন আর সেনাবাহিনীর প্রভাবের মধ্যে ভারসাম্য কোথায়?
এই সংকট থেকে বেরোনোর পথ নির্ভর করবে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা কার্যকর থাকে এবং বিরোধী পক্ষগুলো সংঘাতের বাইরে আলোচনার জায়গা তৈরি করতে পারে কি না, তার ওপর।
তথ্যসূত্র: ডন, রয়টার্স, আল জাজিরা ও কার্নেগি এনডাওমেন্ট