Image description

দীর্ঘদিন অপেক্ষা ও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পর এবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের সঙ্গে মতপার্থক্যগুলো প্রকাশ্যেই তুলে ধরছে ভারত। দেশের অভ্যন্তরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের ওপর চাপ বাড়তে থাকায় ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্কের বিভিন্ন বিষয়ে আরো সরব হচ্ছে নয়াদিল্লি।

সম্প্রতি নিউইয়র্কে এক অনুষ্ঠানে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক নিয়ে বেশ স্পষ্ট ও কঠোর মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, সন্ত্রাসবাদ নিয়ে ভারতের উদ্বেগের প্রতি যুক্তরাষ্ট্র যথেষ্ট সংবেদনশীলতা দেখাচ্ছে না। একই সময়ে ভারতের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের ঘনিষ্ঠতা বাড়ছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের ‘আত্মকেন্দ্রিক’ বাণিজ্যনীতি বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোকে তুলনামূলক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, নয়াদিল্লির এই বক্তব্য ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারতের অবস্থানে নতুন ধরনের প্রকাশ্য কঠোরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। গত কয়েক মাসে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা ও মতপার্থক্য ক্রমেই বেড়েছে।

বহু দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রসহ বন্ধুত্বপূর্ণ দেশগুলোর সঙ্গে স্পর্শকাতর বিষয়গুলো সাধারণত প্রকাশ্যে না এনে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করেছে ভারত। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কও দীর্ঘদিন ধরে দুই দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ব্যাপক সমর্থন পেয়েছে। কিন্তু ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর পরিস্থিতি বদলেছে।

গত কয়েক মাসের উত্তেজনার পর ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতার মোকাবিলায় এখন ওয়াশিংটনের প্রতি প্রকাশ্য সমালোচনার পথ বেছে নিচ্ছে নয়াদিল্লি। এ সময় ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিরোধীরা অভিযোগ করছে, মোদি সরকার বারবার যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কাছে নতি স্বীকার করছে। বুধবার ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন মোদি। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর ভাষায়, আলোচনা ছিল ‘ফলপ্রসূ’। তবে আগের বছরগুলোতে ট্রাম্পকে ‘ভালো বন্ধু’ হিসেবে বর্ণনা করা মোদির তুলনায় এবারের ভাষা ছিল অনেক বেশি আনুষ্ঠানিক ও সংযত।

বাণিজ্য নিয়ে বড় মতপার্থক্য

যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্কের অন্যতম প্রধান বিরোধ এখন বাণিজ্য। যুক্তরাষ্ট্র ভারতের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। ২০২৫ সালে দুই দেশের পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১৪৯ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে ভারতের পক্ষে বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ছিল ৫৮ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার।

জয়শঙ্কর বলেন, কোনো দেশকে এমন আত্মকেন্দ্রিক হওয়া উচিত নয় যে নিজের স্বার্থেই সিদ্ধান্ত নিয়ে পরে বলে, ‘অন্যের জীবন কঠিন করে তোলার কোনো ইচ্ছা আমাদের ছিল না।’

ইরান ও ইউক্রেনের যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে যে প্রভাব পড়েছে, সে প্রসঙ্গও তিনি তুলে ধরেন। তার মতে, এ ধরনের পরিস্থিতিতে ‘সাধারণ বুদ্ধিবোধ’ দিয়ে নিশ্চিত করতে হবে, যাতে বিভিন্ন দেশের মৌলিক প্রয়োজন উপেক্ষিত না হয়।

যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মধ্যে বাণিজ্য নিয়ে আলোচনা চললেও এখনো চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি। জয়শঙ্কর বলেন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মাথাপিছু আয়, উৎপাদনব্যবস্থা এবং সমাজের কাঠামোর মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। ফলে দ্রুত সমঝোতায় পৌঁছানোর প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির মিল হয়নি।

কৃষি খাত দুই দেশের আলোচনায় সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর একটি। কৃষকদের সুরক্ষার জন্য ভারত কয়েক দশক ধরে তার কৃষিপণ্য বাজার অনেকাংশে সুরক্ষিত রেখেছে। জয়শঙ্কর বলেন, এ ক্ষেত্রে দ্রুত অগ্রগতির প্রত্যাশা বাস্তবতার জটিলতার মুখে পড়েছে। তবে বাণিজ্য চুক্তির বিষয়ে মোটামুটি একটি বোঝাপড়া তৈরি হয়েছে বলেও তিনি জানান।

ট্রাম্পের শুল্কনীতির কারণে একসময় ভারত সবচেয়ে বেশি শুল্কের মুখোমুখি দেশগুলোর একটি হয়ে ওঠে। পরে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের ব্যাপকভিত্তিক শুল্ক বাতিল করলে তার প্রশাসন নতুন কৌশল নেয়। এর মধ্যে ছিল ১০ শতাংশ বৈশ্বিক শুল্ক। চলতি মাসের শুরুতে ট্রাম্প এমন একটি আইনে স্বাক্ষর করেন, যার আওতায় রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনা ভারতের মতো দেশগুলোর ওপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

ভারতের সাবেক কূটনীতিক অজয় বিসারিয়ার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের নতুন করে প্রকাশ্যে কথা বলার অন্যতম কারণ হলো—ভারতে এমন একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে চাপ দিচ্ছে, অথচ ভারত এতদিন নীরব ছিল।

তার ভাষায়, এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে কার্যকর হওয়ার কথা থাকা ১০০ শতাংশ শুল্ক বাস্তবায়িত হলে তা দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

‘সন্ত্রাসবাদ’ নিয়ে ভারতের ক্ষোভ

বাণিজ্যের পাশাপাশি সন্ত্রাসবাদও ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে বড় ধরনের বিরোধের কারণ হয়ে উঠেছে। গত বছরের মে মাসে ভারতশাসিত কাশ্মীরে সশস্ত্র হামলায় ২৬ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার পর পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের চার দিনের যুদ্ধ হয়। একপর্যায়ে ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন এবং দাবি করেন, দুই দেশকে অর্থনৈতিক ক্ষতির হুমকি দিয়ে তিনি সংঘাত থামাতে ভূমিকা রেখেছেন।

কিন্তু কাশ্মীর প্রশ্নে ভারতের অবস্থান দীর্ঘদিনের। নয়াদিল্লি মনে করে, এটি ভারত ও পাকিস্তানের দ্বিপক্ষীয় বিষয় এবং এতে তৃতীয় কোনো দেশের হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই।

তারপরও ট্রাম্প বিভিন্ন সময়ে দাবি করেছেন, তিনিই দুই পারমাণবিক শক্তিধর দেশের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ঘটিয়েছেন। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনেও তিনি এমন দাবি করেন। এতে ভারত অসন্তোষ প্রকাশ করেছে।

অন্যদিকে পাকিস্তানের নেতারা ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়েছেন, তার প্রশংসা করেছেন এবং তাকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন দিয়েছেন। এরপর ওয়াশিংটন ও ইসলামাবাদের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে, যা নয়াদিল্লির জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জয়শঙ্কর বলেন, ভারতের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সন্ত্রাসবাদ। পাকিস্তানের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, বহু দশক ধরে একটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে পরিকল্পিতভাবে যে ধরনের সন্ত্রাসবাদের শিকার ভারত হয়েছে, এমন অভিজ্ঞতা খুব কম দেশেরই রয়েছে।

তিনি বলেন, ভারতের কাছে বিষয়টি এত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার পরও যদি যুক্তরাষ্ট্র এ বিষয়ে যথেষ্ট উপলব্ধি, সহানুভূতি বা বোঝাপড়া না দেখায়, তাহলে সেটি সম্পর্কের ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি করে। তার মতে, ভারতের প্রধান উদ্বেগগুলো যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে পুরোপুরি উপলব্ধি করা হচ্ছে না।

অভ্যন্তরীণ চাপও বাড়ছে মোদি সরকারের ওপর

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের পরিবর্তনের পেছনে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও ভূমিকা রাখছে বলে বিশ্লেষকদের মত।

আগামী বছর ভারতের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি রাজ্যে নির্বাচন রয়েছে। একই সঙ্গে কিছু এলাকায় সরকারবিরোধী মনোভাবও তৈরি হয়েছে। সাবেক কূটনীতিক অজয় বিসারিয়ার মতে, এই পরিস্থিতিতে মোদি সরকারের ওপর অভ্যন্তরীণ চাপ বাড়ছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে চাপ মেনে নেওয়া সরকারের জন্য রাজনৈতিকভাবে কঠিন হয়ে উঠছে।

ভারতীয়দের একটি বড় অংশ যুক্তরাষ্ট্রের এইচ-১বি ভিসা কর্মসূচির সুবিধাভোগী। বিশেষ দক্ষতার বিদেশি কর্মীদের নিয়োগের সুযোগ দেওয়া এই কর্মসূচি দীর্ঘদিন ধরে ভারতীয়দের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন এর আওতায় আবেদনকারীদের জন্য বাধা ও ফি বাড়িয়েছে। একই সময়ে তার ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ বা ম্যাগা আন্দোলনের সমর্থকদের মধ্যেও এই কর্মসূচি নিয়ে সমালোচনা রয়েছে।

জয়শঙ্কর বলেন, বহু বছর ধরে মানুষের বিদেশে চলাচলকে অর্থনৈতিক সুবিধা হিসেবে দেখা হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে অভিবাসন ও শ্রমিক চলাচলের অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং রাজনৈতিক অবস্থান পরস্পরের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে।

বিশ্লেষক হর্ষ পান্তের মতে, অভিবাসনের মতো বিষয়গুলো ভারতের সাধারণ মানুষের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। এ কারণেই এতদিন যুক্তরাষ্ট্রকে ভারতের বিপুলসংখ্যক মানুষের কাছে আকর্ষণীয় অংশীদার হিসেবে দেখা হতো। এখন একই বিষয়গুলো দুই দেশের সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

ট্রাম্পকে পাশ কাটিয়ে সময়ের অপেক্ষায় নয়াদিল্লি?

ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসে ফেরার সময় ভারতের কৌশলগত মহলের অনেকেই দুই দেশের সম্পর্ক নিয়ে আশাবাদী ছিলেন। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে মোদির সঙ্গে তার ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল উষ্ণ। কিন্তু পরবর্তী কয়েক মাসে সেই আশাবাদ অনেকটাই ভেঙে পড়ে।

তবুও বিশ্লেষক চিয়েটিগ বাজপেয়ির মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মধ্যে মতপার্থক্য বাড়লেও দুই দেশই সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের চেষ্টা পুরোপুরি ছেড়ে দেয়নি।

তার মতে, ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের অবনতি শুধু ভারতকে লক্ষ্য করে নেওয়া কোনো নীতি নয়; বরং এটি ট্রাম্প প্রশাসনের লেনদেননির্ভর এবং অনেক ক্ষেত্রে অনিশ্চিত ও পরিবর্তনশীল পররাষ্ট্রনীতির প্রতিফলন।

তিনি মনে করেন, ভবিষ্যতে দুই দেশের সম্পর্ক নতুন করে স্বাভাবিক করার সুযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হতে পারে।

তবে নয়াদিল্লির বর্তমান অবস্থানকে বিশ্লেষক হর্ষ পান্ত কিছুটা ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তার মতে, ভারতের সামনে এখন মূলত ট্রাম্পের মেয়াদ ও নীতির পরিবর্তনের অপেক্ষা করার বিষয়টি রয়েছে।

তিনি বলেন, শুধু ভারত নয়, অনেক দেশই এখন একইভাবে অপেক্ষা করছে। কারণ ট্রাম্প রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক সম্পর্কের প্রচলিত রীতি ও কূটনৈতিক নিয়মকে খুব বেশি গুরুত্ব দেন না। ফলে তার সঙ্গে কীভাবে সম্পর্ক পরিচালনা করা হবে—এটাই এখন অনেক দেশের জন্য বড় প্রশ্ন।