Image description

ইরান যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে, উপসাগরীয় দেশগুলোর সামনে ততই স্পষ্ট হয়ে উঠছে এক কঠিন কৌশলগত বাস্তবতা। একদিকে নিরাপত্তার জন্য তাদের যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। অন্যদিকে, সেই মার্কিন নিরাপত্তা-ছাতার উপস্থিতিই তাদের ইরানের সম্ভাব্য প্রতিশোধমূলক হামলার ঝুঁকিতে ফেলছে। ফলে বাহরাইন, কুয়েত, ওমান, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত—উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ বা জিসিসির ছয় সদস্যই একই ধরনের একটি সমস্যার মধ্যে পড়েছে। তারা যুক্তরাষ্ট্রকে পুরোপুরি ছেড়ে যেতে পারছে না, আবার শুধু ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভর করেও নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছে না। তাই যুদ্ধের সঙ্গে সঙ্গে তাদের কৌশলেও এসেছে বহুমুখিতা—যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা অংশীদারত্ব বাড়ানো, কূটনৈতিক যোগাযোগ বজায় রাখা এবং প্রয়োজনে সরাসরি তেহরানের সঙ্গে যোগাযোগ করা।

মার্কিন গণমাধ্যম ফরেন পলিসিতে প্রকাশিত সাবেক সিআইএ বিশ্লেষক শওন এ. হাওয়ার্ডের নিবন্ধে এই বাস্তবতাকে উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর জন্য একটি গভীর কৌশলগত দ্বন্দ্ব হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। হাওয়ার্ডের মতে, জিসিসির দেশগুলো একদিকে ইরানের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু যুদ্ধ দেখিয়ে দিয়েছে যে মার্কিন সুরক্ষারও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতা ইরানের পাল্টা হামলার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে। ফলে উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো এমন একটি ভারসাম্য তৈরির চেষ্টা করছে, যেখানে তারা ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখবে, আবার নিজেদের নিরাপত্তার জন্য বিকল্প পথও তৈরি করবে।

যুদ্ধের অর্থনৈতিক, সামরিক ও মানবিক ক্ষয়ক্ষতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর হতাশাও প্রকাশ্যে এসেছে। হাওয়ার্ড ওয়াশিংটন পোস্টের একটি প্রতিবেদনের উল্লেখ করে লিখেছেন, আগস্টের মাঝামাঝি এক উপসাগরীয় কর্মকর্তা বলেছিলেন, “ট্রাম্প এই যুদ্ধ শুরু করেছেন …আর মূল্য দিচ্ছি আমরা।” এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর অবস্থানের একটি মৌলিক দিক বোঝা যায়। যুদ্ধের সময় তারা যুক্তরাষ্ট্রকে ত্যাগ করতে পারছে না, কিন্তু যুদ্ধের মূল্য তাদের অর্থনীতি, অবকাঠামো ও নিরাপত্তাকেও দিতে হচ্ছে। ফলে সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের কৌশল ক্রমেই কম মার্কিন-কেন্দ্রিক এবং বেশি বহুমুখী হয়ে উঠছে—এটি হাওয়ার্ডের বিশ্লেষণের একটি কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষণ।

সৌদি আরব এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় উদাহরণ। যুদ্ধের আগে রিয়াদ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি আনুষ্ঠানিক, ন্যাটো-ধাঁচের পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি চেয়েছিল, যাতে সৌদি আরব আক্রান্ত হলে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তার বাধ্যবাধকতা আরও স্পষ্ট হয়। পাশাপাশি সৌদি আরব ইরানের হুমকি মোকাবিলায় উন্নত অস্ত্র, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের ব্যবস্থা চেয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ২০২৫ সালের নভেম্বরের স্ট্র্যাটেজিক ডিফেন্স অ্যাগ্রিমেন্টের মাধ্যমে রিয়াদ একটি অপেক্ষাকৃত কম বাধ্যতামূলক চুক্তি পেলেও উন্নত এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান পাওয়ার অনুমোদন পায়। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ থাকলেও সৌদি আরব যে ধরনের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা চেয়েছিল, তা পুরোপুরি পাওয়া যায়নি।

যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এই সীমাবদ্ধতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। হাওয়ার্ডের বর্ণনায়, সৌদি আরব এমন এক মিত্রের মুখোমুখি হয়, যে যুদ্ধের আগে পর্যাপ্ত পরামর্শ করেনি, যুদ্ধের লক্ষ্য ও কৌশল নিয়ে অবস্থান পরিবর্তন করেছে এবং ইরানের পাল্টা হামলা থেকে পুরো অঞ্চলকে সুরক্ষিত রাখতে পারেনি। পরে ইয়েমেনে হুতিদের সঙ্গে সংঘাত আবার তীব্র হলে সৌদি আরব সরাসরি মার্কিন বিমান হামলার অনুরোধ করলেও ট্রাম্প তা প্রত্যাখ্যান করেন বলে নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে। তারপরও রিয়াদ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মূলত প্রতিরক্ষামূলক সামরিক সহযোগিতা চালিয়ে যায়। গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের পাশাপাশি গত জুলাইয়ের শেষ দিকে ইরাকে ইরান-সমর্থিত শিয়া মিলিশিয়াদের বিরুদ্ধে একটি যৌথ হামলাতেও সৌদি বাহিনী অংশ নেয় বলে রয়টার্সের উদ্ধৃতি দিয়ে হাওয়ার্ড লিখেছেন।

 

সৌদি আরবের জাজান প্রদেশের একটি তেল স্থাপনা থেকে ধোঁয়া উঠতে দেখা যাচ্ছে। কম্পোজিট স্যাটেলাইট ছবি। ২৬ জুলাই ২০২৬। ফাইল ছবি: রয়টার্স
সৌদি আরবের জাজান প্রদেশের একটি তেল স্থাপনা থেকে ধোঁয়া উঠতে দেখা যাচ্ছে। কম্পোজিট স্যাটেলাইট ছবি। ২৬ জুলাই ২০২৬। ফাইল ছবি: রয়টার্স

 

কিন্তু এখানেই সৌদি কৌশলের দ্বিতীয় দিকটি সামনে আসে। রিয়াদ শুধু যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করেনি। মে মাসের মধ্যে পাকিস্তানকে সৌদি আরবে ৮ হাজার সেনা, এক স্কোয়াড্রন যুদ্ধবিমান এবং অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েনের অনুমতি দেয়। লোহিত সাগরে হুতিদের হামলা বাড়লে জুলাইয়ে সৌদি আরব ১৩টি আঞ্চলিক অংশীদারকে নিয়ে একটি বহুজাতিক সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোট ঘোষণা করে। এরপর আগস্টে পাকিস্তানের সঙ্গে বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা সম্পর্কের সঙ্গে তুরস্ককেও যুক্ত করে মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্স অ্যাগ্রিমেন্ট সই করে। এতে একটি স্পষ্ট যৌথ নিরাপত্তা ধারা এবং রিয়াদে স্থায়ী সচিবালয়ের ব্যবস্থা রাখা হয়। অর্থাৎ সৌদি আরবের নিরাপত্তা নীতিতে যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ থাকলেও আঞ্চলিক ও অতিরিক্ত অংশীদারত্ব তৈরির প্রবণতাও স্পষ্ট হয়েছে।

 

রিয়াদ একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্মকাণ্ডকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে, যখন মনে হয়েছে সেসব পদক্ষেপ উপসাগরীয় অঞ্চলে আরও বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। মে মাসের শুরুতে ট্রাম্প প্রশাসন ‘অপারেশন প্রজেক্ট ফ্রিডম’-এর অধীনে পারস্য উপসাগরে নৌবহর পাঠিয়ে হরমুজ প্রণালি জোর করে খুলে দেওয়ার চেষ্টা করলে সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রকে নিজেদের ঘাঁটি ও আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি দেয়নি বলে নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই সিদ্ধান্তের পর ওই অভিযান স্থগিত করা হয় বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। কয়েক সপ্তাহ পর সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের নেতাদের সঙ্গে ট্রাম্পকে আবারও হামলা থেকে বিরত থাকতে অনুরোধ করেন। আগস্টের শুরুতেও ইরানের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দেখা যায়নি এমন সামরিক শক্তি ব্যবহারের হুমকি দেওয়ার পর উপসাগরীয় নেতারা ওয়াশিংটনকে উত্তেজনা কমানোর আহ্বান জানান। পরে ট্রাম্প পরিকল্পিত হামলা বাতিল করেন এবং সৌদি আরব, কাতার ও আমিরাতের আহ্বান তার সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছিল বলে জানান।

তবে সব জিসিসি সদস্যের হাতে সৌদি আরবের মতো কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব নেই। ওমান তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। মাত্র ৫৪ লাখ জনসংখ্যার দেশ ওমানের বিপরীতে ইরানের জনসংখ্যা ৮ কোটি ৮০ লাখ। সামরিক সক্ষমতার ক্ষেত্রেও দুই দেশের মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। ফলে ওমান দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের সঙ্গে বাস্তববাদী সহাবস্থানের নীতি অনুসরণ করে এসেছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর মাসকাট কৌশলগত অস্পষ্টতা বজায় রেখে তেহরান, জিসিসি ও ওয়াশিংটনের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নেওয়ার চেষ্টা করেছে।

কিন্তু ওমানের এই কূটনীতিও দেশটিকে পুরোপুরি নিরাপদ রাখতে পারেনি। হাওয়ার্ড লিখেছেন, ইরান সম্ভবত ওমানের ভূখণ্ডে হামলা চালিয়েছে এবং তার আঞ্চলিক জলসীমার আশপাশে, এমনকি ভেতরেও নৌমাইন পুঁতেছে বলে আশঙ্কা রয়েছে। একই সময়ে হরমুজ প্রণালি ব্যবস্থাপনা নিয়ে ইরানের সঙ্গে ওমানের আলোচনা চলছিল। আবার ওমানের কূটনৈতিক তৎপরতা ওয়াশিংটনের বিরক্তির কারণও হয়েছে। নিবন্ধ অনুযায়ী, ট্রাম্প অন্তত দুইবার ওমানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের হুমকি দিয়েছেন এবং আগস্টে সতর্ক করেছেন যে ওমানের কূটনীতি যদি যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্যের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র দেশটিতে বোমা হামলা করতে পারে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের অবস্থান আরও জটিল। আবুধাবি ইরানের বিরুদ্ধে তুলনামূলক কঠোর অবস্থান নিয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় তেহরানের সঙ্গে গোপন যোগাযোগও চালিয়েছে। এর পেছনে ঐতিহাসিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক একটি কারণ। বিশেষ করে দুবাইয়ে দীর্ঘদিন ধরে বড় ইরানি প্রবাসী সম্প্রদায় এবং শক্তিশালী ব্যবসায়িক সম্পর্ক রয়েছে। নিবন্ধ অনুযায়ী, আবুধাবি আগস্টে বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থগিত করার আগে ইরানের আমদানির ৩০ শতাংশেরও বেশি সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে বা আমিরাতের মধ্য দিয়ে আসত।

তারপরও যুদ্ধ থেকে আমিরাত নিজেকে বিচ্ছিন্ন রাখতে পারেনি। যুদ্ধের শুরুতে অন্য যেকোনো জিসিসি দেশের তুলনায় আমিরাতের অবকাঠামোতে বেশি ইরানি হামলা হয় বলে হাওয়ার্ড লিখেছেন। নিবন্ধে দাবি করা হয়েছে, সংঘাতের প্রথম দিকে আমিরাত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সমন্বয় করে একটি গোপন বিমান অভিযানেও অংশ নেয়।

 

বাহরাইনে ইরানের ড্রোন হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা। ছবি: রয়টার্স
বাহরাইনে ইরানের ড্রোন হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা। ছবি: রয়টার্স

 

এপ্রিলের শুরুতে ইরানের লাভান দ্বীপের তেল শোধনাগারে হামলার কথাও সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সময়ে ইসরায়েলের সঙ্গে গোপনে সমন্বয় করে আমিরাতের মাটিতে ইসরায়েলি আয়রন ডোম প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েনের খবরও প্রকাশিত হয়। মে মাসে ইরান ফুজাইরাহ তেল শিল্প এলাকায় হামলা চালায়। পরে ইরাক থেকে ছোড়া একটি ড্রোন আমিরাতের বারাকাহ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশের একটি বৈদ্যুতিক জেনারেটরে আঘাত করে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এর বাইরে আমিরাতের আরেকটি কৌশল ছিল তেহরানের সঙ্গে গোপন সমঝোতার চেষ্টা। রয়টার্সের উদ্ধৃতি দিয়ে হাওয়ার্ড লিখেছেন, জুনে আমিরাত ইরানের অবকাঠামোতে হামলা বন্ধের বিনিময়ে ইরানকে ২০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত দেওয়ার একটি চুক্তিতে সম্মত হয়েছিল বলে খবর প্রকাশিত হয়। আবুধাবি এই চুক্তি অস্বীকার করেছিল। তবে হাওয়ার্ডের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ওই সমঝোতা হয়তো সাময়িক ও নির্বাচিত যুদ্ধবিরতিতে কিছুটা ভূমিকা রেখেছিল। জুনে আঞ্চলিক হামলা কমে আসে। জুলাইয়ে পাল্টাপাল্টি হামলা আবার শুরু হলেও ইরান কিছু সময় আমিরাতের ভূখণ্ডে হামলা চালায়নি। আগস্টের মাঝামাঝি ইরান আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত দুটি ট্যাংকারে হামলা এবং আমিরাতের জলসীমায় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করলে আবুধাবি তেহরানের সঙ্গে বাণিজ্য ও আর্থিক লেনদেন স্থগিত করে।

কাতারের অবস্থানও এই বহুমুখী ভারসাম্যের আরেকটি উদাহরণ। দেশটিতে আল উদেইদ বিমানঘাঁটি রয়েছে, যা অঞ্চলের বৃহত্তম মার্কিন বিমানঘাঁটি। যুদ্ধ শুরুর আগে কাতার যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনায় যুক্ত ছিল এবং শুরু থেকেই আঞ্চলিক উত্তেজনা বৃদ্ধির বিরোধিতা করে। যুদ্ধ শুরু হলে দোহা জানায়, তারা সংঘাতের পক্ষ নয়। তারা আক্রমণাত্মক সামরিক অভিযানের জন্য মার্কিন বাহিনীকে কাতারের আকাশসীমা ব্যবহার করতে দেয়নি এবং তেহরানের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগও বজায় রাখে। পরে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান মধ্যস্থতায় আবার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

 

কাতারের জন্য ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখার আরেকটি বাস্তব কারণ হলো দুই দেশের যৌথ গ্যাসক্ষেত্র। নর্থ ফিল্ড-সাউথ পার্স বিশ্বের বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্র। ওয়াশিংটন পোস্টের উদ্ধৃতি দিয়ে হাওয়ার্ড লিখেছেন, যুদ্ধের শুরুতে কাতার তার রাস লাফান গ্যাস কমপ্লেক্স রক্ষায় ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল বলে খবর প্রকাশিত হয়। কাতার এই প্রস্তাব অস্বীকার করেছিল। এরপরও ইরান রাস লাফানে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। এর ফলে কাতারের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি রপ্তানি সক্ষমতার প্রায় ১৭ শতাংশ বন্ধ হয়ে যায় এবং বছরে আনুমানিক ২০ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব ক্ষতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

কুয়েতও যুদ্ধের শুরুতে নিরপেক্ষতার ঘোষণা দেয়। কিন্তু একই সঙ্গে তাকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি এবং ইরানের চাপ—দুই দিক সামলাতে হয়েছে। মে মাসে যুক্তরাষ্ট্র ‘অপারেশন প্রজেক্ট ফ্রিডম’ শুরু করলে কুয়েত সাময়িকভাবে মার্কিন ঘাঁটি ও আকাশসীমা ব্যবহারে বিধিনিষেধ আরোপ করে। অভিযান স্থগিত হওয়ার কয়েক দিন পর তা তুলে নেওয়া হয়। জুলাইয়ে ইরানের হামলা বাড়লে কুয়েত ও বাহরাইন ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র সংরক্ষণাগারে গোপন হামলা চালিয়েছিল বলে খবর প্রকাশিত হয়, যদিও কুয়েত এতে অংশ নেওয়ার কথা অস্বীকার করে।

তবে কুয়েতের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছাতার গুরুত্ব অন্যদের তুলনায় কিছুটা আলাদা। প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র কুয়েতের সার্বভৌমত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখে এবং এরপর দেশটিতে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি গড়ে ওঠে। তাছাড়া কুয়েতই একমাত্র জিসিসি দেশ, যে ইরানের স্থলভাগের সম্ভাব্য হুমকির মুখে তুলনামূলকভাবে সরাসরি উন্মুক্ত। মে মাসে কুয়েতি বাহিনী চারজন সশস্ত্র ব্যক্তিকে আটক করে, যাদের কুয়েতি কর্তৃপক্ষ ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের সদস্য বলে শনাক্ত করে। জুলাইয়ে এক ইরানি আইনপ্রণেতা যুক্তরাষ্ট্র স্থলযুদ্ধ শুরু করলে কুয়েতে স্থল হামলার সম্ভাবনার কথাও প্রকাশ্যে বলেন। তবু কুয়েত প্রকাশ্যে নিরপেক্ষতার অবস্থান বজায় রেখেছে এবং নিজ ভূখণ্ড থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ইরানবিরোধী হামলা চালানোর অনুমতি দেওয়া বা নিজে ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি হামলায় অংশ নেওয়ার কথা অস্বীকার করেছে।

হাওয়ার্ডের বিশ্লেষণের কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত হলো, ছয়টি জিসিসি দেশের কৌশল আলাদা হলেও তাদের নিরাপত্তা চিন্তার ভিত্তি একই। প্রথমত, তারা এখনো যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সুরক্ষার ওপর নির্ভরশীল। দ্বিতীয়ত, তারা আঞ্চলিক নিরাপত্তা সম্পর্ক ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বহুমুখী করার চেষ্টা করছে। তৃতীয়ত, তারা তেহরানের আচরণকে প্রভাবিত করতে গোপন যোগাযোগ, সম্ভাব্য পারস্পরিক সমঝোতা এবং কূটনৈতিক চ্যানেল ব্যবহার করছে। একই সঙ্গে তারা কখনো কখনো যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্মকাণ্ড সীমিত করার চেষ্টা করছে অথবা মার্কিন অভিযানের সঙ্গে নিজেদের দূরত্ব তৈরি করছে।

কিন্তু নিবন্ধটির মূল প্রশ্ন এখানেই—এই কৌশলগুলো কি উপসাগরীয় দেশগুলোকে যুদ্ধের পরিণতি থেকে সত্যিই রক্ষা করতে পারছে? হাওয়ার্ডের উত্তর অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত তার কোনো নিশ্চয়তা দেখা যায়নি। কাতার ও আমিরাতের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, তেহরানের সঙ্গে গোপন সমঝোতা বা সীমিত সমঝোতা হলেও তা ইরানের চাপ বা হামলা থেকে স্থায়ী সুরক্ষা নিশ্চিত করে না। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীলতাও পূর্ণ নিরাপত্তা দেয়নি। যুদ্ধ সপ্তাহ থেকে মাসে গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে আঞ্চলিক ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি বেড়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক গোলাবারুদের মজুতের ওপরও চাপ পড়েছে। ফলে ওয়াশিংটন সামরিক পদক্ষেপ থেকে ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক চাপের দিকে বেশি ঝুঁকেছে বলে হাওয়ার্ড উল্লেখ করেছেন।

 

এই পরিস্থিতি উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর জন্য একটি গভীর কৌশলগত সংকট তৈরি করেছে। তারা এমন এক সংঘাতে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতে চাইছে, যেখানে যুদ্ধের পক্ষগুলোর সঙ্গে তাদের সম্পর্ক একমাত্রিক নয়। যুক্তরাষ্ট্র তাদের প্রধান নিরাপত্তা অংশীদার, আবার ইরান তাদের ভৌগোলিক প্রতিবেশী এবং অর্থনৈতিক ও আঞ্চলিক বাস্তবতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে তাদের নীতি একদিকে মিত্রতার, অন্যদিকে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার।

সৌদি আরব যেখানে আঞ্চলিক নিরাপত্তা জোট ও অতিরিক্ত সামরিক অংশীদারত্ব তৈরি করছে, ওমান সেখানে মধ্যস্থতা ও কৌশলগত অস্পষ্টতার ওপর নির্ভর করছে। আমিরাত একদিকে ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে, অন্যদিকে গোপন যোগাযোগের পথও খোলা রেখেছে। কাতার কূটনৈতিক মধ্যস্থতার সঙ্গে নিজের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামো রক্ষার চেষ্টা করছে। কুয়েত নিরপেক্ষতার দাবি বজায় রেখেও যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামো থেকে পুরোপুরি সরে যেতে পারছে না।

সুতরাং ফরেন পলিসির এই বিশ্লেষণে উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর আচরণকে পরস্পরবিরোধী বলে দেখার চেয়ে একটি ঝুঁকিপূর্ণ বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর প্রচেষ্টা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তাদের সামনে এমন কোনো একক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই, যা একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সুরক্ষা, ইরানের সঙ্গে সহাবস্থান এবং আঞ্চলিক যুদ্ধের ঝুঁকি থেকে সম্পূর্ণ নিরাপত্তা দিতে পারে। তাই তারা একই সময়ে একাধিক পথ অনুসরণ করছে। কিন্তু যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই বোঝা যাচ্ছে—ওয়াশিংটনের নিরাপত্তা ছাতা, আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা জোট এবং তেহরানের সঙ্গে গোপন যোগাযোগ—কোনোটিই একা তাদের যুদ্ধের অর্থনৈতিক, সামরিক ও কৌশলগত পরিণতি থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন রাখতে পারছে না।