Image description

ভারতের নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা ও কার্যক্রম নিয়ে রিতিকা চোপড়ার সাম্প্রতিক প্রতিবেদন তাকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে। প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে প্রকাশিত প্রতিবেদনটি ঘিরে দেশটির রাজনৈতিক ও গণমাধ্যম অঙ্গনে রীতিমতো আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে।

তবে রিতিকা চোপড়ার সাংবাদিকতা জীবন শুধু এই প্রতিবেদনকে ঘিরে নয়। প্রায় ১৯ বছর ধরে রাজনীতি, সরকার, শিক্ষা, জননীতি ও গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নিয়ে রিপোর্ট করছেন তিনি।

তার কাজের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো তথ্য ও নথির ওপর গুরুত্ব দেওয়া। দ্রুত খবর প্রকাশের চেয়ে একটি প্রতিবেদনের তথ্য কতটা যাচাই করা হয়েছে, সেটিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার জন্য সহকর্মীদের কাছে পরিচিত রিতিকা।

কলকাতা থেকে দিল্লি

রিতিকা চোপড়ার জন্ম কলকাতায়। সেখানে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে গণযোগাযোগ ও ভিডিওগ্রাফিতে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি।

২০০৬ সালে হিন্দুস্তান টাইমসে ইন্টার্ন হিসেবে সাংবাদিকতা শুরু করেন রিতিকা। পরের বছর দিল্লিতে যান। সেখানে রাজনীতি, প্রশাসন, শিক্ষা, সামাজিক খাত ও সরকারি নীতি নিয়ে রিপোর্ট করতে শুরু করেন।

এরপর তিনি ভারতের আরেক প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য ইকোনমিক টাইমসের রাজনৈতিক ব্যুরোতে কাজ করেন। এই সময়ে রাজনৈতিক সাংবাদিকতার পাশাপাশি সরকারের নীতি ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন করেন তিনি।

২০১৫ সালে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে যোগ দেন রিতিকা।

গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রিতিকা

 

রিতিকা চোপড়া/ ছবি: ইনস্টাগ্রাম
 
রিতিকা চোপড়া/ ছবি: ইনস্টাগ্রাম

 

দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে কাজের সময় তার দায়িত্বও ধীরে ধীরে বাড়ে। তিনি ন্যাশনাল এডুকেশন এডিটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে হন ন্যাশনাল ব্যুরো চিফ (গভর্নমেন্ট)। এই দায়িত্বে কেন্দ্রীয় সরকার, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় এবং গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নিয়ে রিপোর্টিং করেন তিনি।

বর্তমানে তিনি দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের মুম্বাই সংস্করণের রেসিডেন্ট এডিটর। এই দায়িত্বে মুম্বাই ও বৃহত্তর অঞ্চলের সম্পাদকীয় কাভারেজ এবং রিপোর্টিং তদারক করেন তিনি।

নির্বাচন কমিশন নিয়ে দীর্ঘদিনের অনুসন্ধান

ভারতের নির্বাচন কমিশন রিতিকার সাংবাদিকতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। বছরের পর বছর তিনি নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রম ও নির্বাচনি প্রশাসনের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে রিপোর্ট করেছেন।

২০২১ সালে এই কাজের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি পান রামনাথ গোয়েঙ্কা এক্সেলেন্স ইন জার্নালিজম অ্যাওয়ার্ড। নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম নিয়ে করা একটি সিরিজ রিপোর্টের জন্য তাকে এই পুরস্কার দেওয়া হয়।

সাম্প্রতিক প্রতিবেদনেও নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা ও কার্যক্রম নিয়ে তার দীর্ঘদিনের কাজের ধারাবাহিকতা দেখা যায়। গত ২৫ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে ভারতের নির্বাচন কমিশন (ECI)-এর অভ্যন্তরীণ বিরোধ ও অনিয়ম নিয়ে একটি বিস্ফোরক তদন্তমূলক রিপোর্টের মাধ্যমে দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করেন।

কী ছিল এই অনুসন্ধানী রিপোর্টে

  • কমিশনারদের অভূতপূর্ব আপত্তি: প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হয় যে, গত ১০ মাসে ভারতের নির্বাচন কমিশনের মোট তিনজন সদস্যের মধ্যে দুইজন নির্বাচন কমিশনার (সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক জোশী) বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও নির্দেশের বিরুদ্ধে কমপক্ষে ১৪ বার নথিবদ্ধ (on record) আপত্তি জানিয়েছিলেন।
  • না জানিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ: কমিশনারদের অভিযোগ ছিল, তাদের অজান্তেই এবং অন্ধকারে রেখে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (CEC) জ্ঞানেশ কুমার ও প্যানেল বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
  • ভোটার তালিকা সংশোধন ও নাম বাদ: স্পেশাল ইন্টেন্সিভ রিভিশন (SIR), ভোটার তালিকায় নতুন নাম যুক্ত করা, ভোটার তালিকা থেকে ব্যাপক হারে নাম বাদ দেওয়া এবং ‘ফর্ম ৬’ (Form 6) সংক্রান্ত বিতর্কিত পরিবর্তনের মতো বিষয়গুলো এই আপত্তির মূল কেন্দ্রে ছিল।

জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাব: এই রিপোর্টটি প্রকাশের পর বিরোধী দলগুলো মোদী সরকার ও নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন তুলেছে এবং দেশজুড়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ শুরু হয়েছে।

এ নিয়ে ভারতের নির্বাচন কমিশনও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে বাধ্য হয়েছে। যদিও বিষয়টিকে স্বাভাবিক ‘সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার অংশ’ হিসেবে উল্লেখ করে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছে তারা।

একের পর এক পুরস্কার

রিতিকা চোপড়ার সাংবাদিকতা বিভিন্ন পুরস্কার ও স্বীকৃতি পেয়েছে।

২০১৮ সালে তিনি পান ইউএনএফপিএ-লাডলি মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড। হরিয়ানায় পঞ্চায়েত নির্বাচনে অশিক্ষিত প্রার্থীদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিষিদ্ধ করার আইন বহাল রেখে সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া রায় নিয়ে প্রতিবেদনের জন্য তিনি এই পুরস্কার পান।

২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচন কাভারেজের জন্য ২০২২ সালে তিনি পান ইন্টারন্যাশনাল প্রেস ইনস্টিটিউটের ইন্ডিয়া অ্যাওয়ার্ড ফর এক্সেলেন্স ইন জার্নালিজম।

২০২৪ সালে তিনি পান চামেলি দেবী জৈন অ্যাওয়ার্ড ফর আউটস্ট্যান্ডিং উইম্যান মিডিয়া পারসন অব দ্য ইয়ার।

সরকারি নীতি প্রণয়নে ঘাটতি, স্বাধীন প্রতিষ্ঠান নিয়ে প্রশ্ন এবং ইতিহাস পুনর্লিখনের প্রচেষ্টার মতো বিষয় নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের জন্য তাকে এই পুরস্কার দেওয়া হয়।

এ ছাড়া ভারতের প্রকৌশল শিক্ষার মান নিয়ে করা চার পর্বের অনুসন্ধানী সিরিজ ‘ডিভ্যালুড ডিগ্রি’র জন্য ২০১৮ সালের এসিজে ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম অ্যাওয়ার্ডে বিশেষ উল্লেখ পান তিনি।

সূত্র: দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, দ্য ইন্ডিয়ান আওয়াজ