চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বড় পতন হয়েছে বাংলাদেশের। এই সময়ে প্রধান পোশাক রপ্তানিকারক দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পতন রেকর্ড করেছে বাংলাদেশ।
চীনের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক বাংলাদেশ। বিশ্বের সবচেয়ে বড় পোশাকবাজারের জোট ইইউতে সামগ্রিক চাহিদা যতটা কমেছে, বাংলাদেশের রপ্তানি কমেছে তার চেয়েও দ্রুত।
যদিও একই সময়ে চীন এবং তৃতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ ভিয়েতনাম তাদের বাজার অংশীদারত্ব বাড়িয়েছে।
বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের সংকলিত ইউরোস্টেটের ডাটা অনুযায়ী, জানুয়ারি-জুলাই সময়ে মূল্য ও পরিমাণ—উভয় দিক থেকেই ইইউর পোশাক আমদানি কমেছে এবং পাশাপাশি কমেছে গড় দাম।
ইইউ এই সময়ে ৫১ দশমিক ৬১ বিলিয়ন ইউরো মূল্যের পোশাক আমদানি করেছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫ দশমিক ১০ শতাংশ কম। আমদানির পরিমাণ ৩ দশমিক ২৩ শতাংশ কমে ২ দশমিক ৬০ বিলিয়ন কেজিতে নেমেছে। এছাড়া দুর্বল চাহিদা ও মূল্য চাপের কারণে আমদানির গড় দাম ১ দশমিক ৯৩ শতাংশ কমে প্রতি কেজি ১৯ দশমিক ৮৪ ইউরো হয়েছে।
ইইউতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ১৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ কমে ১০ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন ইউরোতে দাঁড়িয়েছে, যা প্রধান সরবরাহকারীদের মধ্যে সবচেয়ে বড় পতন।
রপ্তানির পরিমাণ ৫ দশমিক ৬৬ শতাংশ কমে ৭৫১ দশমিক ৯১ মিলিয়ন কেজিতে নেমেছে। অন্যদিকে গড় রপ্তানিমূল্য ৮ দশমিক ৪৭ শতাংশ কমে প্রতি কেজি ১৩ দশমিক ৮০ ইউরো হয়েছে, যা পাকিস্তানের পর প্রধান সরবরাহকারীদের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন।
পরিমাণের তুলনায় রপ্তানি মূল্য বেশি হারে কমার অর্থ হলো, দুর্বল বাজারে কার্যাদেশ ধরে রাখতে উৎপাদকদের প্রতিযোগিতায় নামতে হওয়ায় কম দামও আয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
ইইউর বৃহত্তম পোশাক সরবরাহকারী চীন রপ্তানি ১ দশমিক ৮৯ শতাংশ বাড়িয়ে ১৬ দশমিক ৪২ বিলিয়ন ইউরোতে উন্নীত করেছে। অন্যদিকে ভিয়েতনাম ৩ দশমিক ৯২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করে ২ দশমিক ৫৫ বিলিয়ন ইউরোতে পৌঁছেছে।
ভিয়েতনামের গড় রপ্তানিমূল্য ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ বেড়ে প্রতি কেজি ২৯ ইউরো হয়েছে। অন্যদিকে কম্বোডিয়ার রপ্তানি মূল্য ৬ দশমিক ৬৯ শতাংশ কমা সত্ত্বেও গড় দাম ৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ বেড়ে প্রতি কেজি ১৮ দশমিক ৬৭ ইউরো হয়েছে। এটি উচ্চমূল্যের চালানগুলোর ক্ষেত্রে শক্তিশালী মূল্য প্রাপ্তির ইঙ্গিত দেয়।
অন্যান্য প্রধান সরবরাহকারী দেশগুলোও দরপতনের মুখে পড়েছে। তুরস্কের রপ্তানি ১৩ দশমিক ৩২ শতাংশ কমে ৪ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ইউরোতে নেমেছে, যেখানে রপ্তানির পরিমাণ ১৪ দশমিক ৬৪ শতাংশ কমে ১৫৪ দশমিক ৮৫ মিলিয়ন কেজি হয়েছে। তবে এর গড় রপ্তানিমূল্য ১ দশমিক ৫৫ শতাংশ বেড়ে প্রতি কেজি ২৮ দশমিক ৩১ ইউরো হয়েছে।
ভারতের রপ্তানি ১২ দশমিক ২৪ শতাংশ কমে ২ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ইউরোতে নেমেছে এবং রপ্তানির পরিমাণ ১০ দশমিক ৬৭ শতাংশ কমে ১৩৩ দশমিক ০৩ মিলিয়ন কেজি হয়েছে। এর গড় দাম ১ দশমিক ৭৬ শতাংশ কমে প্রতি কেজি ২০ দশমিক ৬২ ইউরো হয়েছে।
পাকিস্তান রপ্তানির পরিমাণ ৩ দশমিক ৪৪ শতাংশ বাড়িয়ে ১৮১ দশমিক ৮৩ মিলিয়ন কেজিতে উন্নীত করা সত্ত্বেও রপ্তানি মূল্য ১১ দশমিক ৮১ শতাংশ কমে ১ দশমিক ৯৬ বিলিয়ন ইউরোতে নেমেছে। এর গড় রপ্তানিমূল্য ১৪ দশমিক ৭৪ শতাংশ কমে প্রতি কেজি ১০ দশমিক ৭৭ ইউরো হয়েছে, যা তালিকায় থাকা সরবরাহকারীদের মধ্যে সর্বনিম্ন।
শ্রীলঙ্কা ও ইন্দোনেশিয়ারও রপ্তানি মূল্য যথাক্রমে ১১ দশমিক ৮৩ শতাংশ এবং ১২ দশমিক ১২ শতাংশ কমেছে। দেশ দুটি সামান্য গড় দাম বাড়াতে পারলেও তাদের রপ্তানি পরিমাণ কমেছে।
রপ্তানিকারকরা জানান, বৈশ্বিক মন্দার মধ্যে কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা সচল রাখতে বাংলাদেশি উৎপাদকরা মুনাফা কমিয়ে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার চেষ্টা করেছেন।
বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও মহিউদ্দিন রুবেল জানান, বছরের মাঝামাঝি সময়ে এসে রপ্তানি হ্রাসের গতি কিছুটা মন্থর হওয়ার লক্ষণ দেখা গেছে। জুন ও জুলাই মাসে প্রবৃদ্ধির ফলে জানুয়ারি-জুন সময়ের ১৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ থেকে কমে জানুয়ারি-জুলাইয়ে ইইউতে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি হ্রাসের হার ১৩ দশমিক ৬৫ শতাংশে নেমে এসেছে।
তিনি বলেন, ইইউতে জুনে রপ্তানি শূন্য দশমিক ৮৭ শতাংশ বেড়ে ১ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন ইউরো এবং জুলাইয়ে ৩ দশমিক ৭২ শতাংশ বেড়ে ১ দশমিক ৭৩ বিলিয়ন ইউরো হয়েছে।
তবে রপ্তানিকারকরা সতর্ক করে বলেছেন যে, দেশের ভেতরের সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার ঘটনাগুলো এই ঘুরে দাঁড়ানোর প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে। বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) ১৩৪টি সদস্য কারখানার ওপর করা এক জরিপে দেখা গেছে, ৫৫ দিন ধরে চলা গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে জরিপভুক্ত ৮৭ শতাংশ কারখানার চালান দেরিতে পৌঁছেছে।
জরিপ অনুযায়ী, চালান দেরিতে হওয়ার কারণে ৬০ শতাংশ কারখানা ক্রেতাদের ছাড় দিতে বাধ্য হয়েছে এবং ৫৫ শতাংশ কার্যাদেশ হ্রাস বা বাতিলের মুখে পড়েছে।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, বৈশ্বিক বাজার পরিস্থিতির কারণে অধিকাংশ দেশের পোশাক রপ্তানি চাপের মধ্যে রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে রপ্তানি কমে যাওয়ায় চীন এখন ইউরোপীয় বাজারের প্রতি বেশি মনোযোগ দিচ্ছে এবং ক্রেতাদের প্রতিযোগিতামূলক দাম অফার করছে।
মাহমুদ হাসান খান বলেন, ‘বাংলাদেশের উচিত নির্দিষ্ট কোনো বাজারের স্বল্পমেয়াদি ওঠানামার দিকে না তাকিয়ে সার্বিক রপ্তানি প্রবৃদ্ধি এবং মূল্য সংযোজন খাতের ওপরের দিকে এগিয়ে যাওয়ার ওপর জোর দেওয়া।’
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশিষ্ট ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের এই পতনের কারণ শুধু ইইউয়ের কম চাহিদা নয়।
তিনি বলেন, ‘প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়েছে এবং বাজার হারাচ্ছে।’
তিনি জানান, ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো বাণিজ্য সুবিধার সুফল পাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, ‘আগে ইইউ বাজারে ভিয়েতনামের তুলনায় বাংলাদেশ প্রায় ১২ শতাংশ শুল্ক সুবিধা পেত, কিন্তু মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির পর সেই ব্যবধান আর নেই।’
মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, কেবল পোশাকের দাম কমিয়ে প্রতিযোগিতা ধরে রাখা সম্ভব নয়।
শ্রমিকদের মজুরি তুলনামূলক কম হলেও উৎপাদনশীলতা বড় একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
উচ্চ মূলধন ব্যয়, গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতি এবং দীর্ঘ লিড টাইম বা সময়ক্ষেপণ উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। এছাড়া চালান সময়মতো না পৌঁছানোও রপ্তানিকারকদের ক্ষতিগ্রস্ত করছে বলে জানান এই অর্থনীতিবিদ।
মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, চীন থেকে সরে যাওয়া কার্যাদেশের একটি বড় অংশ বাংলাদেশের পরিবর্তে ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার মতো দেশগুলোতে চলে যাচ্ছে।
তিনি প্রযুক্তি ও দক্ষতায় বিনিয়োগের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডো ও জাতীয় লজিস্টিকস নীতি বাস্তবায়ন এবং পণ্য ও কাঁচামাল বৈচিত্র্যকরণে জোর দেওয়ার পরামর্শ দেন।
তাছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়ন তুলাভিত্তিক পোশাক থেকে কৃত্রিম তন্তু (ম্যান-মেড ফাইবার) এবং পলিয়েস্টারভিত্তিক পণ্যের দিকে বেশি ঝুঁকছে। ফলে বাংলাদেশকে এই খাতগুলোতে সক্ষমতা বাড়াতে হবে এবং পোশাকবহির্ভূত রপ্তানি খাতগুলোকে বিকশিত করতে হবে।
খাতটির পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে এবং প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বজায় রাখতে জ্বালানি, নীতি ও সুদের হার স্থিতিশীল করা অত্যন্ত জরুরি বলে উল্লেখ করেছেন রপ্তানিকারকরা।