চলতি মাসের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া ডিফেন্স অ্যান্ড ইনোভেশন সামিটে (প্রতিরক্ষা ও উদ্ভাবনবিষয়ক শীর্ষ সম্মেলন) মঞ্চে ওঠেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীদের (সিইও) পাশে নিয়ে সে সময় তাঁর লক্ষ্য ছিল শুধু একটি বার্তা দেওয়া। আর তা হলো আরও অস্ত্র তৈরি করো এবং তা করতে হবে আরও দ্রুতগতিতে। পাশে তখন দাঁড়িয়ে তাঁর প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ।
ইউএস আর্মি ওয়ার কলেজে সমবেত অস্ত্রনির্মাতাদের উদ্দেশে সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, ‘আমাদের অস্ত্রের গুণগত মান বিশ্বের মধ্যে সেরা। তবে আমাদের কাজের গতি আরেকটু বাড়ানো দরকার।’
ট্রাম্প প্রশাসন এ শীর্ষ সম্মেলনকে মূলত দ্বিমুখী এক কৌশলের অংশ হিসেবে দেখছে, যার উদ্দেশ্য মার্কিন শিল্প খাতের পুনরুজ্জীবন এবং একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ–সক্ষমতা আরও জোরদার করা। প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথের ভাষায়, এই যুদ্ধ–সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের ‘স্বাধীনতার রক্ষাকবচ’। তবে এ জমকালো আয়োজনের আড়ালে অনেকটাই ঢাকা পড়ে গেছে একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। সেটি হলো বিপুল পরিমাণ অত্যাধুনিক ও জটিল প্রযুক্তির অস্ত্রের ব্যাপক হ্রাস। চলতি বছরের শুরুর দিকে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ চলাকালে ইরানে টানা প্রায় ৪০ দিনের জোরাল সামরিক অভিযান এবং এরপর পাল্টাপাল্টি হামলায় এসব অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে।
মার্কিন সরকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ৩ হাজার ৭৫০ কোটি (৩৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন) ডলার। এর সিংহভাগই খরচ হয়েছে গোলাবারুদ ও ক্ষেপণাস্ত্রের পেছনে। ৮ এপ্রিল তেহরানের সঙ্গে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠা ও অতি সম্প্রতি ইরানে হামলা স্থগিত করার সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার আগপর্যন্ত মার্কিন বাহিনী দেশটিজুড়ে ১৩ হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে বলে জানিয়েছে হোয়াইট হাউস। একই সময়ে মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ইরানের ছোড়া ১ হাজার ৭০০-এর বেশি ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে।
গত ৮ এপ্রিল তেহরানের সঙ্গে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠা ও অতি সম্প্রতি ইরানে হামলা স্থগিত করার সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার আগপর্যন্ত মার্কিন বাহিনী দেশটিজুড়ে ১৩ হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে বলে জানিয়েছে হোয়াইট হাউস। একই সময়ে মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ইরানের ছোড়া ১ হাজার ৭০০-এর বেশি ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে।
ট্রাম্পের দাবি, আলোচনার সুযোগ তৈরি করতে যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে ইরানে তাদের হামলা স্থগিত রেখেছে। তবে নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন করে সংঘাত বৃদ্ধি না করার জন্য ট্রাম্পকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। কারণ, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভান্ডার আরও খালি হয়ে পড়বে।
গতকাল সোমবার দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অবশ্য এমন ঘাটতির কথা সরাসরি অস্বীকার করেছেন ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, ‘বিশ্বের যেকোনো দেশের চেয়ে আমাদের কাছে অনেক বেশি গোলাবারুদ আছে, এমনকি আমাদের প্রয়োজনের চেয়েও তা অনেক বেশি।’
মার্কিন প্রশাসনের ভেতরে এ বিষয় বেশ কিছুদিন ধরেই একটি সংবেদনশীল ইস্যু হিসেবে দাঁড়িয়েছে। গত মাসে এ বিষয়ে প্রশ্নের মুখে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ অস্ত্র সরবরাহ কমে যাওয়ার তথ্য অস্বীকার করেছিলেন, তবে এর পর থেকে তাঁর অবস্থানের পরিবর্তন লক্ষ করা গেছে।

গত সপ্তাহে হেগসেথ মার্কিন সিনেটের অ্যাপ্রোপ্রিয়েশনস কমিটিকে (অর্থ বরাদ্দ কমিটি) জানান, সামরিক সরঞ্জামসহ ‘জরুরি ঘাটতি’ মেটাতে পেন্টাগনের (মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর) আরও ৮ হাজার ৭০০ কোটি (৮৭ বিলিয়ন) ডলার প্রয়োজন। যুক্তরাষ্ট্রের ঠিক কী পরিমাণ গোলাবারুদ খরচ হয়েছে এবং বর্তমানে কী পরিমাণ অস্ত্র জমা আছে, সেই সুনির্দিষ্ট তথ্যগুলো এখনো রাষ্ট্রীয়ভাবে গোপন রাখা হয়েছে।
বিশ্বের যেকোনো দেশের চেয়ে আমাদের কাছে অনেক বেশি গোলাবারুদ আছে, এমনকি আমাদের প্রয়োজনের চেয়েও তা অনেক বেশি।
তবে ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএসআইএস)-এর তথ্য মার্কিন অস্ত্রাগার শূন্য হয়ে পড়ার এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে, যা স্বল্পমেয়াদে পূরণ করা অত্যন্ত কঠিন। এ বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছেন সিএসআইএসের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ও অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল মার্ক কানসিয়ান। তিনি পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘এটি (ঘাটতি পূরণ) মূলত নির্ভর করে অস্ত্রের ধরনের ওপর। তবে একটি ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতেও এক থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত লেগে যায় এবং এ উৎপাদন প্রক্রিয়া হুট করে দ্রুত করার কোনো উপায় নেই।’
কিন্তু আসলেই কি মার্কিন বাহিনী এত দ্রুত গোলাবারুদ ও অস্ত্র শেষ করে ফেলছে যে নিজেদের সামরিক দায়িত্ব ও লক্ষ্য পূরণে হিমশিম খেতে হতে পারে?
যুক্তরাষ্ট্রের খালি হতে যাওয়া অস্ত্রাগার
এ যুদ্ধে যেসব গুরুত্বপূর্ণ গোলাবারুদ ও অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে, সেগুলো মূলত দুটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়। এর একটি, দূরপাল্লার আক্রমণ পরিচালনা ব্যবস্থা ও অন্যটি ইরানের দিক থেকে ধেয়ে আসা হামলা প্রতিহত করায় ব্যবহৃত আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা।
গত সপ্তাহে হেগসেথ মার্কিন সিনেটের অ্যাপ্রোপ্রিয়েশনস কমিটিকে জানান, সামরিক সরঞ্জামসহ ‘জরুরি ঘাটতি’ মেটাতে পেন্টাগনের (যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর) আরও ৮ হাজার ৭০০ কোটি ডলার প্রয়োজন।
যুক্তরাষ্ট্রের দূরপাল্লার আক্রমণ পরিচালনা ব্যবস্থার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়েছে টমাহক ল্যান্ড অ্যাটাক মিসাইল বা টিএলএএম। অস্ত্রটি সাধারণত যুদ্ধজাহাজ বা সাবমেরিন (ডুবোজাহাজ) থেকে ছোড়া হয়, যা দিয়ে প্রায় ১ হাজার মাইল বা ১ হাজার ৬০০ কিলোমিটারের বেশি দূরে থাকা লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা সম্ভব।
কমান্ড বাংকার বা সুরক্ষিত সামরিক ঘাঁটির মতো কঠিন লক্ষ্যবস্তুগুলোতে নির্ভুলভাবে আঘাত হানতে মার্কিন বাহিনীকে সাহায্য করে এ অস্ত্রগুলো। এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো মানবচালিত যুদ্ধবিমানকে কোনো ধরনের ঝুঁকির মধ্যে না ফেলে এ হামলা চালানো যায়।

গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সিএসআইএসের হিসাব মতে, এ যুদ্ধে এক হাজারের বেশি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে ২০৩১ সালের আগে এ অস্ত্রের মজুত যুদ্ধ–পূর্ব অবস্থায় ফিরে আসার কোনো সম্ভাবনা নেই।
এটি (অস্ত্রের ঘাটতি পূরণ) মূলত নির্ভর করে অস্ত্রের ধরনের ওপর। তবে একটি ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতেও এক থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত লেগে যায় এবং এ উৎপাদন প্রক্রিয়া হুট করে দ্রুত করার কোনো উপায় নেই।
সিএসআইএস জানায়, সর্বাধুনিক প্রযুক্তির প্রতিটি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রের পেছনে খরচ হয় প্রায় ২৬ লাখ (২ দশমিক ৬ মিলিয়ন) ডলার। অন্যদিকে, ইরান যুদ্ধে ব্যবহৃত আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করা হয়েছে প্যাট্রিয়ট। এটি মাটি থেকে আকাশে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার একটি আধুনিক ব্যবস্থা, যার উদ্দেশ্য শত্রুপক্ষের বিমান, ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র নিখুঁতভাবে ধ্বংস করা।
সিএসআইএসের প্রাক্কলন অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর আগে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আনুমানিক ২ হাজার ৩৩০টি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র জমা ছিল। এর মধ্যে চলতি সংঘাতে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৪৩০টি ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ফেলা হয়েছে। প্রতিটি প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টরের (প্রতিরোধক ক্ষেপণাস্ত্র) পেছনে খরচ হয় প্রায় ৪০ লাখ (৪ মিলিয়ন) ডলার। ইরানের একেকটি ড্রোন ধ্বংস করতে এ বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে, অথচ সেই ড্রোনগুলোর নিজস্ব উৎপাদন খরচ মাত্র ২০ থেকে ৫০ হাজার ডলার।
এ বিপুল অস্ত্রের ঘাটতি পূরণ করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত কঠিন হবে। পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে মার্ক কানসিয়ান বলেন, ‘একটি ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতেও কয়েক বছর সময় লেগে যায়। আপনি যদি আজকেও এ খাতে অর্থ ঢালেন, তাহলেও আগামী তিন-চার বছর, এমনকি পাঁচ বছরের মধ্যে কোনো ক্ষেপণাস্ত্র হাতে পাবেন না।’
গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সিএসআইএসের হিসাব মতে, ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র এক হাজারের বেশি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে ২০৩১ সালের আগে এ অস্ত্রের মজুত যুদ্ধ–পূর্ব অবস্থায় ফিরে আসার কোনো সম্ভাবনা নেই।
কানসিয়ান আরও বলেন, ‘বর্তমানে আমরা যেসব ক্ষেপণাস্ত্র পাচ্ছি, সেগুলোর জন্য অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল মূলত ২০২৩ সালে।’ এ যুদ্ধে প্যাট্রিয়টের চেয়েও দীর্ঘপাল্লার ও উঁচুতে আঘাত হানতে সক্ষম ‘টার্মিনাল হাই অ্যালটিটিউড এরিয়া ডিফেন্স’ বা থাড নামের আরও একটি নতুন ও অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়েছে। তবে এ ক্ষেপণাস্ত্রের সরবরাহ আগে থেকেই বেশ সীমিত ছিল।
সিএসআইএসের হিসাবমতে, যুদ্ধ শুরুর আগে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে থাকা আনুমানিক ৩৬০টি থাড ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে ১৯০ থেকে ২৯০টিই ইতিমধ্যে ছোড়া হয়ে গেছে। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে মাত্র ৯টি থাড ব্যাটারি সচল রয়েছে, এর মধ্যে ৭টিই যুক্তরাষ্ট্রের।
এমন পরিস্থিতিতে এ অস্ত্রের ধারাবাহিক ব্যবহার মার্কিন বাহিনীকে বড় ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। কারণ, রাশিয়া, চীন কিংবা উত্তর কোরিয়ার মতো দেশগুলোর ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকি মোকাবিলায় এ ব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষার জন্য অত্যন্ত জরুরি।
নজর এখন তাইওয়ান ও প্রশান্ত মহাসাগরে
ইরানের সঙ্গে এ যুদ্ধ এমন একসময়ে এসে দাঁড়িয়েছে, যাকে সামরিক বিশ্লেষকেরা প্রায়ই ‘ডেভিডসন উইন্ডো’ বা ডেভিডসন সময়সীমা বলে অভিহিত করেন। মার্কিন সামরিক পরিকল্পনাবিদদের একাংশের মতে, এ সুনির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যেই তাইওয়ান আক্রমণ করতে পারে চীন।
প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক ভাবনার কেন্দ্রে থাকা এ বিতর্কিত ধারণার সূত্রপাত মূলত ২০২১ সালে কংগ্রেসের এক শুনানি থেকে। তখন এ অঞ্চলে দায়িত্বরত মার্কিন বাহিনীর প্রধান অ্যাডমিরাল ফিলিপ ডেভিডসন সতর্ক করে বলেছিলেন, ‘ছয় বছরের মধ্যে’–এ আক্রমণ হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র মাসে বড়জোর ৬০ থেকে ৬৫টি এবং বছরে ৭০০ থেকে ৮০০টি ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করে। অথচ ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র প্রথম দিনই মার্কিন বাহিনী ৮০৩টি ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ফেলেছে।
২০২৩ সালে সিআইএর (মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা) তৎকালীন পরিচালক উইলিয়াম বার্নসও পূর্বাভাস দিয়েছিলেন যে চীন ২০২৭ সালের মধ্যে তাইওয়ান আক্রমণের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত হয়ে যাবে। স্বায়ত্তশাসিত তাইওয়ানকে চীন দীর্ঘদিন ধরেই নিজেদের একটি বিচ্ছিন্ন প্রদেশ মনে করে এবং যেকোনো মূল্যে এটিকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে ‘একীভূত’ করার অঙ্গীকার করে আসছে। এ লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগের বিষয়টিও তারা উড়িয়ে দেয়নি। তবে চীন তাইওয়ান আক্রমণ করলে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি যুদ্ধে জড়াবে কি না, তা নিয়ে এখনো তীব্র বিতর্ক রয়েছে। এ অস্পষ্টতার মধ্যেও দ্বীপরাষ্ট্রটিকে প্রতিরক্ষামূলক অস্ত্র সরবরাহ করে আসছে যুক্তরাষ্ট্র।

অস্ত্রাগারের এ ঘাটতিকে মার্ক কানসিয়ান একটি ‘ঝুঁকিপূর্ণ সময়’ হিসেবে দেখছেন। তাঁর মতে, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যদি কোনো সংঘাত শুরু হয়, তবে মার্কিন বাহিনীর কাছে ‘প্রয়োজনীয় ও পছন্দের অস্ত্রের সেই পর্যাপ্ততা থাকবে না’। ফলে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের কোনো যুদ্ধে চীন যদি তার বিশাল ক্ষেপণাস্ত্র ও যুদ্ধবিমানের বহর নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে, তবে মার্কিন বাহিনী এক বড় ধরনের অপ্রস্তুত পরিস্থিতির মুখোমুখি পড়তে পারে বলে মার্ক কানসিয়ান মনে করেন।
মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করছে চীন। দেশটি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তিতে বিপুল বিনিয়োগ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে হাইপারসনিক গ্লাইড ক্ষেপণাস্ত্র, যা ইরানের ব্যবহার করা ক্ষেপণাস্ত্র ও সস্তা ড্রোনের চেয়ে অনেক বেশি উন্নত। পাশাপাশি বেইজিং ব্যাপকভাবে ‘ড্রোন-ঝাঁক’ বা একসঙ্গে একঝাঁক ড্রোন ব্যবহারের যুদ্ধকৌশল তৈরিতেও বড় বিনিয়োগ করেছে।
তবে মার্কিন অস্ত্রাগার খালি হয়ে যাওয়াকে সবাই শুধু একটি বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন না। সিআইএর সাবেক কর্মকর্তা ও মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মধ্যপ্রাচ্যনীতি–বিষয়ক সাবেক উপদেষ্টা জ্যাকব অলিডর্ট মনে করেন, যুদ্ধে এসব অস্ত্রের ব্যবহার আসলে শত্রুপক্ষকে একটি শক্তিশালী বার্তাও দেয়।
রক্ষণশীল ঘরানার গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ‘আমেরিকা ফার্স্ট পলিসি ইনস্টিটিউট’-এর মার্কিন নিরাপত্তানীতি–বিষয়ক বর্তমান পরিচালক জ্যাকব অলিডর্ট বলেন, ‘অস্ত্র শুধু মজুতে থাকলেই তা প্রতিরোধ গড়ে তোলে না, বরং রাষ্ট্রগুলো যে এগুলো ব্যবহারে প্রস্তুত, তা প্রদর্শনের মাধ্যমেই মূলত শক্তির জানান দেওয়া যায়।’
অলিডর্ট দাবি করেন, ‘অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ও রেকর্ড সময়ের মধ্যে ইরানের সামরিক সক্ষমতা গুঁড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের এ সাফল্য চীনসহ অন্যান্য প্রতিপক্ষ ও তাদের আগ্রাসী উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে একটি কঠোর বার্তা দেবে।’
ইউরোপের পরিস্থিতি এখন কেমন
মিত্রদের অস্ত্র সরবরাহ করা এবং একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব মজুত ধরে রাখার মধ্যকার এ দৃশ্যমান টানাপোড়েন কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে আগেই দেখা গেছে। অপারেশন এপিক ফিউরি শুরু হওয়ার কয়েক মাস আগে, ২০২৫ সালের অক্টোবরের কথা। মার্কিন অস্ত্রাগার খালি হয়ে যাওয়া ঠেকাতে সে সময় ইউক্রেনকে টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন ট্রাম্প।
ইউক্রেনের সেই ঘটনাই মূলত একটি আগাম আভাস ছিল, যা এখন ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের পর সামগ্রিক অস্ত্রভান্ডার নিয়ে মার্কিন প্রশাসনের ভেতরের দর-কষাকষির রূপরেখা তৈরি করে দিচ্ছে।
ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা বলছেন, রাশিয়ার একের পর এক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা রুখতে তাদের জরুরি ভিত্তিতে প্যাট্রিয়ট ও অন্যান্য আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা প্রয়োজন। গত মার্চে বিবিসির সঙ্গে আলাপকালে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেন, ‘জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি ইরান যুদ্ধের অর্থ হলো মার্কিন মজুত ফুরিয়ে যাওয়া এবং আকাশ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনকারীদের সক্ষমতা শেষ হয়ে আসা।’ ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, ‘এর ফলে আমাদেরও (ইউক্রেন) সম্পদের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।’
জেলেনস্কি তাঁর এ উদ্বেগের পেছনে কিছু সুনির্দিষ্ট সংখ্যাও তুলে ধরেন। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্র মাসে বড়জোর ৬০ থেকে ৬৫টি এবং বছরে ৭০০ থেকে ৮০০টি ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করে। অথচ অপারেশন এপিক ফিউরির প্রথম দিনই মার্কিন বাহিনী ৮০৩টি ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ফেলেছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্প অনেক ইউরোপীয় কর্মকর্তাকেই বেশ চমকে দিয়েছেন। তিনি ইউক্রেনকে তাদের নিজেদের দেশেই প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির অধিকার দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন। জার্মানি ও জাপানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিমধ্যেই এ ধরনের চুক্তি ও যৌথব্যবস্থা চালু রয়েছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে দীর্ঘ ১৩ বছর কাজ করার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ইলেইন ম্যাককাস্কার বর্তমানে ‘আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউট’-এর একজন বিশেষজ্ঞ হিসেবে কর্মরত। তিনি মনে করেন, রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেনের লড়াই এবং ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ—উভয় অভিজ্ঞতাই এখন কম খরচে বিপুল অস্ত্র তৈরির পথ দেখাবে, যা বর্তমানের চড়া দামের অস্ত্রগুলোর বিকল্প শক্তি হিসেবে কাজ করবে। ম্যাককাস্কার বলেন, ‘আমরা অনেক আগে থেকেই জানি যে মাত্র ১ হাজার ডলারের একটি ড্রোন ধ্বংস করার জন্য আমরা কোনোভাবেই ৬০ লাখ ডলারের প্রতিরোধক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে চাই না।’
এই বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, ‘আমার মনে হয়, এখন এ সমাধানের ওপর বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে। অনেক মানুষই এখন এমন সব টেকসই ও যুদ্ধোপযোগী অস্ত্র তৈরিতে মনোযোগ দিচ্ছেন, যেগুলোর উৎপাদন খরচ অতটা বেশি নয়।’
ইরান যুদ্ধের পরিণতি
এত কিছুর পরও নিকট ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের গোলাবারুদ ফুরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা নিয়ে মার্কিন প্রশাসনের ভেতরে তেমন কোনো বড় উদ্বেগ বা হুলুস্থুল নেই। তবে এর কারণ এ নয় যে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভান্ডার অসীম, বরং আসল কারণ হলো ইরানের নিজস্ব অস্ত্রের মজুত এখন যুক্তরাষ্ট্রের চেয়েও ‘বেশি শোচনীয়’ অবস্থায় রয়েছে।
বিবিসিকে দেওয়া এক বিবৃতিতে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অ্যানা কেলি বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সব কৌশলগত লক্ষ্য এবং এর বাইরের প্রয়োজনীয়তা পূরণের জন্য মার্কিন সামরিক বাহিনীর কাছে পর্যাপ্ত গোলাবারুদ ও অস্ত্রের মজুত রয়েছে। আর অপারেশন এপিক ফিউরি ইতিমধ্যেই প্রমাণ করে দিয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্রের গায়ে হাত দিলে কী পরিণতি ভোগ করতে হয়।’
মুখপাত্র আরও বলেন, ‘এমনকি এরপরও প্রেসিডেন্ট আমাদের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রতিনিয়ত আরও বেশি “মেড ইন আমেরিকা” অস্ত্র উৎপাদনের তাগিদ দিয়ে যাচ্ছেন।’
ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ডের পক্ষ থেকে সম্প্রতি যেসব হামলার কথা ঘোষণা করা হয়েছে, সেগুলোর মূল লক্ষ্যই ছিল হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হুমকি দেওয়ার ক্ষেত্রে তেহরানের সামরিক সক্ষমতা গুঁড়িয়ে দেওয়া। উল্লেখ্য, এ গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটি বর্তমানে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র—উভয় পক্ষই অবরুদ্ধ করে রেখেছে।

মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের একের পর এক হামলায় ইরানের সামরিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে বহুগুণ বেশি। সবচেয়ে বড় সংকট হলো নিকট ভবিষ্যতে এ বিশাল ঘাটতি কাটিয়ে ওঠার মতো অত্যন্ত সীমিত সক্ষমতা রয়েছে দেশটির।
গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ‘ইউনাইটেড অ্যাগেইনস্ট নিউক্লিয়ার ইরান’-এর নীতিবিষয়ক পরিচালক জেসন ব্রডস্কি বলেন, ‘অনেক বিশ্লেষকই ইরানকে এমনভাবে উপস্থাপন করেন যেন তাদের কাছে অস্ত্রের এক অফুরন্ত ভান্ডার রয়েছে।’
পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে এই বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, ‘তবে আমার মনে হয়, আমাদের এখন বাস্তবতাকে মেনে নিতে হবে যে তেহরানেরও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র তাদের সামরিক প্রতিরক্ষা শিল্পের মূল ভিত্তি বা উৎপাদন কাঠামোকে ইতিমধ্যে এক বিশাল বড় মাত্রায় ধ্বংস করে দিতে সক্ষম হয়েছে।’
জেসন ব্রডস্কি মনে করেন, ইরানের প্রয়োজনীয় ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও অন্যান্য আধুনিক যুদ্ধাস্ত্র বড় স্কেলে বা ব্যাপকভাবে উৎপাদন করার যে ক্ষমতা ছিল, তা এখন অনেকটাই মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। ব্রডস্কির আরও দাবি, ইরানের কাছে এখন যে সামান্য অস্ত্র অবশিষ্ট রয়েছে, সেগুলো তেহরান তাদের একমাত্র ‘তুরুপের তাস’ হিসেবে ব্যবহার করতে চাচ্ছে। আর তা হলো হরমুজ প্রণালিতে হামলার হুমকি টিকিয়ে রাখা। তবে তাঁর চোখে ইরানের এ ক্ষমতাও এখন দিন দিন ফিকে হয়ে আসছে। তিনি বলেন, ‘ইরানি শাসকগোষ্ঠীর হাতে সময় আসলে দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।’
ইরানের সঙ্গে চলমান এ সংঘাতকেই মার্কিন সামরিক বাহিনীর এ মুহূর্তের প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে দেখছেন ব্রডস্কি। যদিও মার্কিন কর্মকর্তারা স্বীকার করছেন, দীর্ঘমেয়াদে অস্ত্রভান্ডারের সামগ্রিক ঘাটতির চিত্রকে উপেক্ষা করা হবে চরম দায়িত্বহীনতা।
ব্রডস্কি বলেন, ‘ইন্দো-প্যাসিফিক (ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয়) অঞ্চলের ঝুঁকিটি এই মুহূর্তে কিছুটা দূরের বিষয়। নীতিনির্ধারকদের সব সময় অগ্রাধিকার ঠিক করতে হয়, আর এ মুহূর্তে মধ্যপ্রাচ্যই মার্কিন প্রেসিডেন্টের সম্পূর্ণ মনোযোগ কেড়ে নিয়েছে।’
আপাতত ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে ছোড়া প্রতিটি মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র, ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রের সম্মুখভাগে পাঠানো সামরিক সাহায্য কিংবা তাইওয়ানের সুরক্ষায় তুলে রাখা অস্ত্র—সবই আসছে একটি নির্দিষ্ট ভান্ডার থেকে। এটি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে। তা সত্ত্বেও ওয়াশিংটন বাজি ধরছে যে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন পুরোপুরি গতি পাওয়ার আগপর্যন্ত তারা এ চলমান সংকট ভালোভাবেই কাটিয়ে উঠতে পারবে।
অনুবাদ: মো. আবু হুরাইরাহ্