উচ্চশিক্ষার সুযোগ, সংখ্যালঘু প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্য, এই তিন প্রশ্নকে সামনে এনে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে ভারতের উত্তর প্রদেশের মোহাম্মদ আলী জওহর বিশ্ববিদ্যালয়। অধিকাংশ ভবন ভেঙে ফেলার সরকারি নির্দেশ ঘিরে টানা বিক্ষোভ চলছে ক্যাম্পাসে। শিক্ষার্থীদের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়টি বিলুপ্ত হলে হাজারো তরুণ-তরুণীর শিক্ষাজীবন অনিশ্চয়তায় পড়বে।
উত্তর প্রদেশের রামপুর জেলার ২৫০ একরজুড়ে গড়ে ওঠা মোহাম্মদ আলী জওহর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০টি ভবনের মধ্যে ৩৮টি ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেয় রামপুর ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (আরডিএ)। কর্তৃপক্ষের দাবি, মাত্র দুটি ভবনের অনুমোদন বৈধ। বাকি ভবনগুলো নির্মাণ হয়েছে বিধিবহির্ভূতভাবে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে ৫ আগস্টের মধ্যে নিজ উদ্যোগে ভবন অপসারণের নির্দেশ দেওয়া হয়। তা না হলে প্রশাসন নিজেই ভাঙার কাজ করবে এবং ব্যয়ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছ থেকে আদায় করবে বলে জানায়।
সোমবার রাজ্য প্রশাসন ওই নির্দেশে অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ দিলেও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, এতে ভাঙার সিদ্ধান্ত বাতিল হয়নি। উপাচার্য জহিরউদ্দিনের মতে, আপাতত শুধু নির্ধারিত সময়সীমা স্থগিত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় এখন আদালতের মাধ্যমে পুরো আদেশ বাতিলের চেষ্টা করছে।
বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা আজম খান। স্বাধীনতাসংগ্রামী মোহাম্মদ আলী জওহরের নামে প্রতিষ্ঠিত এই বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুলতে ২০০৩ সালে একটি ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠা করেন সমাজবাদী পার্টির জ্যেষ্ঠ নেতা আজম খান। তিন বছর পর শুরু হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম। উত্তর প্রদেশের মুসলিম রাজনীতিতে তিনি দীর্ঘদিন প্রভাবশালী মুখ হিসেবে পরিচিত।
২০১৭ সালে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর আজম খানের বিরুদ্ধে জমি দখল, জালিয়াতি ও বিদ্বেষমূলক বক্তব্যসহ প্রায় ১০০টি মামলা হয়। এর মধ্যে অনেকগুলোর সঙ্গে জওহর বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পর্ক রয়েছে। দুই বছরের বেশি সময় কারাভোগের পর ২০২২ সালে তিনি জামিন পান। পরে জাল জন্মসনদ ও ভুয়া আয়কর নথিসংক্রান্ত পৃথক মামলায় তিনি ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা দণ্ডিত হন। সমর্থকদের অভিযোগ, এসব মামলা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অংশ। তবে রাজ্য সরকার সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
বিশ্ববিদ্যালয় ভাঙার সিদ্ধান্ত নিয়েও একই বিতর্ক দেখা দিয়েছে। সমাজবাদী পার্টির সংসদ সদস্য জাভেদ আলী খানের অভিযোগ, শিক্ষাবিরোধী মনোভাব এবং রাজনৈতিক প্রতিশোধ থেকেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তার মতে, বিশ্ববিদ্যালয়টি আজম খানের প্রতিষ্ঠা, সমাজবাদী পার্টির নেতাদের সম্পৃক্ততা এবং সংখ্যালঘু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হওয়ার কারণেই লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।
অন্যদিকে বিজেপির মুখপাত্র রাকেশ ত্রিপাঠীর দাবি, এটি রাজনৈতিক নয়; অবৈধ স্থাপনার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা মাত্র। তার বক্তব্য, অবৈধ জমিতে নির্মিত ভবনের ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ীই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
১৫ জুলাই থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন শিক্ষার্থী, সাবেক শিক্ষার্থী ও স্থানীয় বাসিন্দারা। প্রায় তিন হাজার শিক্ষার্থীর এই বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন বিষয়ে পড়াশোনা চলছে। তাদের প্রায় অর্ধেকই নারী।
আইনের শিক্ষার্থী ইকরার ভাষ্য, নিরাপদ পরিবেশের কারণেই তা র পরিবার এই বিশ্ববিদ্যালয় বেছে নিয়েছিল। প্রতিষ্ঠানটি ভেঙে দেওয়া হলে অন্য কোথাও পড়তে যাওয়ার অনুমতি হয়তো তিনি আর পাবেন না। সরকার অন্য প্রতিষ্ঠানে ভর্তির জন্য পরামর্শকেন্দ্র চালু করলেও সেখানে যেতে আগ্রহী নন বলে জানান তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের এক-তৃতীয়াংশের বেশি শিক্ষার্থী হিন্দু। প্যারামেডিক্যাল বিভাগের শিক্ষার্থী চাঁদনি দিবাকর বলেন, সংখ্যালঘু বিশ্ববিদ্যালয় হলেও কখনো নিজেকে ভিন্ন ধর্মের শিক্ষার্থী বলে মনে হয়নি। শিক্ষক-শিক্ষার্থী সবার কাছ থেকেই তিনি সমান আচরণ পেয়েছেন।
আরডিএর দাবি, আঞ্চলিক কর্মকর্তার তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে উপাচার্য জহিরউদ্দিনের বক্তব্য, ভবনগুলো নির্মাণের সময় ওই এলাকা আরডিএর আওতায় ছিল না। তাই সে সময় অনুমোদনের প্রয়োজনও ছিল না। তাঁর অভিযোগ, সংবিধানস্বীকৃত শিক্ষার অধিকারের পরিপন্থী এই সিদ্ধান্ত বাস্তবে আজম খানকে লক্ষ্য করেই নেওয়া হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে আদালতে আদেশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করেছে। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বিক্ষোভ বন্ধ করতে পুলিশ তাদের পরিবারের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। যদিও এ বিষয়ে প্রশাসনের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সম্প্রতি সমাজবাদী পার্টির কয়েকজন সংসদ সদস্য আন্দোলনস্থল পরিদর্শন করেছেন। এদিকে ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে মুসলিমদের বাড়িঘর, মসজিদ ও অন্যান্য স্থাপনা ভাঙার ঘটনা বেড়েছে বলে বিভিন্ন অধিকার সংগঠনের অভিযোগ। যদিও প্রশাসনের দাবি, অবৈধ দখল ও নির্মাণের বিরুদ্ধেই এসব অভিযান পরিচালিত হচ্ছে।
আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, দিল্লিতে শিক্ষা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনের মাধ্যমে একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। অথচ একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় ভেঙে ফেলার প্রশ্নটি জাতীয় আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে না। তাদের আশঙ্কা, এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, হাজারো শিক্ষার্থী ও সাবেক শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎও অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে।