অল্প কিছুদিনের একটি ক্ষণস্থায়ী যুদ্ধবিরতির পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শত্রুতা ফের শুরু হওয়ায় ওমান ও ইরানের মধ্যবর্তী সংকীর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি আবার আলোচনায় এসেছে। ওমান উপকূল ঘেঁষে একটি দক্ষিণ করিডোর খুলে দিয়ে ওয়াশিংটন যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে, এমন অভিযোগ তুলে উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে গ্যাস ও তেল পরিবহনে ব্যবহৃত বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর ওপর পুনরায় হামলা শুরু করেছে তেহরান। জবাবে মার্কিন সামরিক বাহিনীও ইরানের উপকূলীয় অবকাঠামো, ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাঁটি এবং রেভল্যুশনারি গার্ডসের নৌযানে পাল্টা হামলা চালিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের আগে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহন করা এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে নতুন করে হামলা শুরু হওয়ায় জ্বালানি বাজারে আবার বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
তুরস্কের আঙ্কারাভিত্তিক সেন্টার ফর ইরানিয়ান স্টাডিজের গবেষক ওরাল তোগা মনে করেন, সম্প্রতি বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানের এই হামলাগুলো ছিল একটি বড় কৌশলগত ভুল, যার খেসারত লাভের চেয়ে অনেক বেশি। তিনি বলেন, ইরানের নৌবাহিনী বহুলাংশে ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় এবং ক্ষেপণাস্ত্র ক্ষমতা হ্রাস পাওয়ায়, হরমুজ প্রণালিই ছিল তাদের শেষ কার্যকর হাতিয়ার। কিন্তু সেটির কার্যকারিতা যখন কমছিল, তেহরান ঠিক তখনই সেটি ব্যবহার করে ফেললো।
তিনি আরও জানান, জুনের শেষের দিকে ওমান উপকূলের সুরক্ষিত রুট ব্যবহার করে জাহাজ চলাচল ৫০ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছিল, যা প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণের দাবিকে দুর্বল করে দেয়। নতুন করে শুরু হওয়া হামলাগুলো ছিল মূলত সেই ক্ষয় ঠেকানোর চেষ্টা, তবে লাভের চেয়ে এতে ক্ষতিই বেশি হয়েছে। ট্যাঙ্কারে প্রতিটি নতুন হামলার মাধ্যমে তেহরান ওয়াশিংটনকে তাদের লক্ষ্যবস্তুর তালিকা বাড়ানোর সুযোগ করে দিচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্ত উপসাগরীয় দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছাকাছি ঠেলে দিচ্ছে এবং তেহরানের কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতাকে আরও গভীর করছে।
ইতালির ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউটের রাজনৈতিক বিজ্ঞানী মোহাম্মদ ইসলামী বলেন, সময় যত গড়াচ্ছে, ইরান তত চাপের মুখে পড়ছে। কারণ প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের ফলে তাদের উৎক্ষেপণ যন্ত্রের অবস্থান প্রকাশ পেয়ে যাচ্ছে, যা মার্কিন বাহিনীকে সেগুলো একে একে শনাক্ত করে ধ্বংস করার সুযোগ দিচ্ছে। তবে ইরানের ভেতরে একটি কৌশলগত চিন্তাধারা রয়েছে, যা শত্রুপক্ষ তাদের অবস্থান শনাক্ত করার আগেই ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণকে প্রাধান্য দেয়।
ইসলামীর মতে, যুদ্ধক্ষেত্রেই এই যুদ্ধের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে এবং একমাত্র জয়ী ও বিজিত নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এই সামরিক সংঘাত থামবে না।
কূটনৈতিক সমাধানের সুযোগ কতটা?
বিশ্লেষকরা সংঘাত কমানোর সুযোগ অত্যন্ত সীমিত বলে মনে করছেন। গবেষক ওরাল তোগা জুলাইয়ের শুরুতে কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় হওয়া অগ্রগতির কথা উল্লেখ করেন, যেখানে যুদ্ধবিরতি ভঙ্গের আগে জব্দ করে রাখা ইরানি অর্থ ছাড় এবং যৌথ যোগাযোগ ব্যবস্থার কথা ছিল। ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি সমাপ্ত ঘোষণা করলেও আলোচনা চালিয়ে যেতে রাজি আছেন এবং ইসলামাবাদ মনে করছে যুদ্ধবিরতি এখনও পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব।
তোগা জানান, কৌশলগত শিথিলতার মাধ্যমে ইরান প্রণালিতে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ পেতে পারে এবং জব্দ হওয়া সম্পত্তি ফেরত পেয়ে নিজেদের দেশে মুখ রক্ষা করতে পারে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র উন্মুক্ত নৌপথ ও অর্থনৈতিক সাফল্য দেখিয়ে নিজেদের জয় দাবি করতে পারবে। এটি চূড়ান্ত কোনও চুক্তি না হয়ে কেবল উত্তেজনা হ্রাসের একটি ব্যবস্থা হতে পারে।
এদিকে মোহাম্মদ ইসলামী জোর দিয়ে বলেন, পরোক্ষ কূটনীতি এখনও বজায় রয়েছে, কারণ আলোচনা হলো ‘যুদ্ধের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ’। তবে জ্বালানি বাজারে বিঘ্ন ঘটিয়ে নিজেদের প্রভাব না দেখানো পর্যন্ত ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনায় বসতে পারবে না, অন্যথায় ওয়াশিংটন কোনও ছাড় দেওয়ার প্রয়োজনবোধ করবে না।
তোগার মতে, যুদ্ধবিরতি ছেড়ে সংঘাতকে বেছে নিয়ে ইরান মূলত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ফাঁদেই পা দিয়েছে। প্রতিবার ট্যাঙ্কারে আক্রমণের জবাবে কয়েক ঘণ্টার বিশাল বিমান হামলায় ইরানের উপকূলীয় অবকাঠামো ধ্বংস করা হচ্ছে, যা আলোচনার অগ্রগতি যাই হোক না কেন, তাদের রাষ্ট্রের সক্ষমতাকে ক্রমান্বয়ে শেষ করে দিচ্ছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয়ও দ্রুত বাড়ছে। ইতোমধ্যে শত বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে, সেই সঙ্গে তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়া এবং অনির্দিষ্টকালের যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন জনগণের অসন্তোষ তো রয়েছেই। ইরানের আশা ছিল, মার্কিন বাহিনীর এই ক্ষতির গতি তাদের নিজস্ব সক্ষমতা ক্ষয়ের চেয়ে দ্রুত হবে। তবে তোগা মনে করেন, বাস্তব তথ্য এখন পর্যন্ত ওয়াশিংটনের পক্ষেই রয়েছে এবং তেহরান মার্কিনিদের ধৈর্যের পরীক্ষা নিতে গিয়ে অস্তিত্বের সংকটে পড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ও অভ্যন্তরীণ চিত্র
মোহাম্মদ ইসলামী উল্লেখ করেন, জুলাইয়ের শুরুতে প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির জানাজায় লাখ লাখ মানুষের সমাগম দেখে ইরানি সরকার সম্পর্কে মার্কিন দৃষ্টিভঙ্গি বদলে গেছে। এর আগে মার্কিন নীতি নির্ধারকরা মনে করতেন, ইরানি সরকারের কোনও শক্ত জনভিত্তি নেই এবং সাধারণ মানুষ এর আমেরিকা-বিরোধী নীতির বিরোধী। কিন্তু এই দীর্ঘ জানাজার মিছিল তাদের ভুল ভাঙিয়ে দিয়েছে। এখন তারা বুঝতে পেরেছেন যে জনগণ এই চুক্তি বা আলোচনা চায় না। ফলে ওয়াশিংটনের দৃষ্টিতে এখন কেবল সামরিক বিকল্পই টেবিলে অবশিষ্ট রয়েছে।
তোগা এই সমাগমকে জাতীয়তাবাদী বার্তা হিসেবে দেখলেও এটিকে ‘মানসিক প্রতিরক্ষা, ক্ষমতার প্রদর্শন নয়’ বলে অভিহিত করেন। যুদ্ধ শুরুর আগেই ইরান ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ ঘাটতি, আকাশচুম্বী মূল্যস্ফীতি, মুদ্রার অবমূল্যায়ন ও গণবিক্ষোভের মুখে ছিল। যুদ্ধ হয়তো সাময়িকভাবে এই ক্ষোভ চেপে রেখেছে, কিন্তু জনগণের দুর্ভোগ দূর করার সব উপায়ও ধ্বংস করে দিয়েছে। পরিষেবার মান আরও খারাপ হলে এই জাতীয়তাবাদী চেতনা টিকে থাকার লড়াইয়ে রূপ নেবে এবং কোনও সংগঠিত বিরোধী দলের উত্থানের বদলে দেশজুড়ে বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা বেশি।
সূত্র: টিআরটি ওয়ার্ল্ড