Image description

ইরাক যুদ্ধ শুরুর প্রাক্কালে তৎকালীন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনির ‘মার্কিন সেনাদের মুক্তিসেনা হিসেবে স্বাগত জানানো হবে’—মন্তব্যটি ইতিহাসখ্যাত হয়ে আছে। বুশ প্রশাসনের সেই ভুল পূর্বাভাসের মতোই বর্তমান ইরান যুদ্ধ নিয়ে একের পর এক ভুল ও মেলেনি এমন দাবি করে চলেছে ট্রাম্প প্রশাসন। গত সাড়ে চার মাসে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার সহযোগীদের করা একাধিক আত্মবিশ্বাসী পূর্বাভাস দ্রুতই ভেঙে পড়েছে।

ট্রাম্প প্রশাসনের এমন কিছু বড় ভুল ও অসঙ্গতিপূর্ণ দাবি নিচে তুলে ধরা হলো

হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও শুল্ক আদায়

গত সোমবার ট্রাম্প ঘোষণা করেন, যুক্তরাষ্ট্র শিগগিরই হরমুজ প্রণালির ‘অভিভাবক’ হিসেবে এর নিয়ন্ত্রণ নেবে এবং যাতায়াতকারী জাহাজগুলোর কাছ থেকে ২০ শতাংশ কার্গো ফি বা শুল্ক আদায় করবে। কিন্তু ট্রাম্পের এই দাবি প্রশাসনের আগের অবস্থানের সম্পূর্ণ বিরোধী। গত মে মাসে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছিলেন, হরমুজ প্রণালিতে কোনো ধরনের টোল বা শুল্ক ব্যবস্থা সম্পূর্ণ অবৈধ ও গ্রহণযোগ্য নয়। এই চরম ও বাস্তবতাবর্জিত ঘোষণার পরদিনই ট্রাম্প নিজের অবস্থান থেকে সরে আসেন।

সিএনএন জানায়, উপদেষ্টারা বুঝিয়ে ট্রাম্পকে এই পরিকল্পনা থেকে বিরত রাখেন।

স্বল্পস্থায়ী যুদ্ধের দাবি

যুদ্ধ শুরুর দিকে ট্রাম্প ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে এই যুদ্ধ ‘চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ’ স্থায়ী হবে। গত ১ মে তিনি আবারও বলেন, যুদ্ধ বেশি দিন চলবে না। কিন্তু এখন সাড়ে চার মাস পার হয়ে গেলেও যুদ্ধের কোনো সমাপ্তি দেখা যাচ্ছে না।

ইরানি নেতাদের ‘যৌক্তিক’ আখ্যা দেওয়া

গত মাসে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর ট্রাম্প ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইরানি নেতাদের প্রশংসা করেছিলেন। ১৬ জুন ট্রাম্প বলেন, তারা খুবই যৌক্তিক ও ভালো মানুষ।

ভ্যান্স দাবি করেছিলেন, ইরানি শীর্ষ নেতৃত্ব ও আইআরজিসি কর্মকর্তারা ৪৭ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শত্রুতার নীতিকে ভুল হিসেবে স্বীকার করছেন। কিন্তু গত সপ্তাহে যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর ট্রাম্প তার অবস্থান বদলে ইরানি নেতাদের ‘পাগল’, ‘দুষ্টু’, ‘অসুস্থ’ ও ‘নোংরা খেলোয়াড়’ বলে গালি দেন।

জনগণের গণ-অভ্যুত্থানের আশা

গত ফেব্রুয়ারির শেষে ইরানে হামলা শুরুর সময় ট্রাম্প আশা করেছিলেন ইরানি জনগণ তাদের সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবে। তিনি ইরানিদের দেশ স্বাধীন করার আহ্বানও জানিয়েছিলেন। কিন্তু কোনো গণঅভ্যুত্থান না হওয়ায় ট্রাম্প এখন সুর বদলে বলছেন, ইরানি নেতৃত্ব অত্যন্ত সহিংস, তাই অস্ত্র ছাড়া সেখানে অভ্যুত্থান অসম্ভব।

হরমুজ প্রণালি নিয়ে উদাসীনতা

ইরান যখন হরমুজ প্রণালি বন্ধের হুমকি দেয়, তখন ট্রাম্প প্রশাসন বিষয়টিকে পাত্তাই দেয়নি। গত ১৩ মার্চ প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, এটি নিয়ে চিন্তার কিছু নেই। এর আগে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রচুর তেল থাকায় হরমুজ প্রণালি বন্ধ হলে তাদের কোনো ক্ষতি হবে না। কিন্তু বাস্তবে এই পথ বন্ধ হওয়ায় মার্কিন অর্থনীতি বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে এবং ইরান ট্রাম্পের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টির সুযোগ পেয়েছে।

জ্বালানি তেলের দাম কমার আশ্বাস

গত ৮ মার্চ জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট আশ্বাস দিয়েছিলেন যে খুব দ্রুতই প্রতি গ্যালন গ্যাসের দাম ৩ ডলারের নিচে নেমে আসবে। খারাপ পরিস্থিতিতেও এটি হতে কয়েক ‘সপ্তাহ’ লাগতে পারে বলে তিনি জানান। তবে সাড়ে চার মাস পরও দাম কমেনি, বরং নতুন করে সংঘাত ছড়ানোর পর দাম আরো বাড়ছে।

চুক্তির জন্য ইরানের ‘আকুতি’

ট্রাম্প বারবার দাবি করেছেন, তেহরান একটি চুক্তির জন্য ‘ভিক্ষা’ করছে এবং তারা চুক্তি করতে মরিয়া। কিন্তু গত তিন মাসের ঘটনাপ্রবাহ উল্টো চিত্র দেখিয়েছে। ইরান শুধু বড় ছাড়ই আদায় করেনি, বরং গত মাসের সুবিধাজনক সমঝোতা স্মারকও বাতিল করে দিয়েছে।

ইরানের আকাশসীমা সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের দাবি

যুদ্ধের শুরুতে ট্রাম্প ও হেগসেথ দাবি করেছিলেন, ইরানের সামরিক বাহিনী পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে এবং মার্কিন ও ইসরাইলি বাহিনী তাদের আকাশসীমা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করবে।

হেগসেথ দাবি করেন, ইরানের কোনো রাডার ও বিমান বিধ্বংসী ব্যবস্থা অবশিষ্ট নেই। কিন্তু ট্রাম্পের এই দাবির মুখে এপ্রিলের শুরুতেই ইরান যুক্তরাষ্ট্রের দুটি সামরিক বিমান ভূপাতিত করে।