জাপানের পশ্চিমাঞ্চলীয় ইয়াওয়াতা শহরের মেয়র শোকো কাওয়াতা সম্প্রতি মাতৃত্বকালীন ছুটিতে যাওয়ার ঘোষণা দেন। তিনি ভেবেছিলেন, এ ঘোষণা শুনে বড়জোর কেউ কেউ ভ্রু কুঁচকাবেন। তবে এ ঘোষণার প্রতিক্রিয়া যে এতটা তীব্র হবে এবং তা নিয়ে দেশজুড়ে এত বিভক্ত মতামত তৈরি হবে, তা ৩৫ বছর বয়সী কাওয়াতা কল্পনাও করেননি।
এই মেয়রের মাতৃত্বকালীন ছুটিকে ঘিরে এখন জাপানে জাতীয় পর্যায়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। মূল প্রশ্ন হলো, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সন্তান জন্মদানের জন্য ছুটি নেওয়া উচিত কি না। এমন এক সময়ে এই বিতর্ক দেখা দিল, যখন দেশটি জন্মহার বৃদ্ধির চেষ্টা করছে।
বিবিসিকে কাওয়াতা বলেন, ‘আমি সত্যিই অবাক হয়েছি। কারণ, বিষয়টি নিয়ে মানুষের প্রতিক্রিয়া এত বড় আকার ধারণ করবে, তা আমি ভাবতেই পারিনি।’
স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সন্তান জন্মদানের সময় ছুটি নেওয়ার জন্য বর্তমানে জাপানে কোনো আইনি কাঠামো নেই। তাই শোকো কাওয়াতা আনুষ্ঠানিকভাবে মাতৃত্বকালীন ছুটিতে যেতে পারছেন না। এর পরিবর্তে, তিনি সাময়িকভাবে নিজের দায়িত্বগুলো সামলাতে উপ–মেয়র শিগেতো নোসেকে বলেছেন।
গত মে মাসে এক সংবাদ সম্মেলনে কাওয়াতা তাঁর পরিকল্পনার কথা জানান। তিনি বলেন, সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে তাঁর সন্তান প্রসবের সম্ভাব্য তারিখ নির্ধারণ করা আছে। ওই তারিখের আগে দুই মাস এবং পরে আরও দুই মাস তিনি দায়িত্ব থেকে বিরত থাকবেন। এর মাধ্যমে জাপানের ইতিহাসে প্রথম কোনো মেয়র হিসেবে মাতৃত্বকালীন ছুটিতে যাওয়ার নজির গড়তে যাচ্ছেন তিনি।
কাওয়াতা বলেছেন, তাঁর কর্মস্থলের সবাই তাঁকে পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছেন।
তবে সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া ভিন্ন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রকাশিত হাজারো পোস্ট এবং ইউটিউবের বিভিন্ন ভিডিওতে বিষয়টি নিয়ে নানা ধরনের মতামত ও বিতর্ক দেখা গেছে।
অনেকেই কাওয়াতার পাশে দাঁড়িয়েছেন। তাঁদের মতে, সন্তান জন্ম দেওয়া ও লালন-পালন সহজ নয়, আর কাওয়াতা পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন। একজন মন্তব্য করেছেন, জাপানের সমাজ এখনো এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেনি, যেখানে গর্ভধারণ ও মাতৃত্বের বিষয়টি যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়।
সমালোচনাকে গুরুত্ব দেননি কাওয়াতা। এ মেয়র গর্বের সঙ্গে বলেছেন, তিনি তাঁর কাজ ভালোবাসেন। একই সঙ্গে তাঁর বিশ্বাস, এখনই সন্তান নেওয়া এবং পরিবার গড়ে তোলার জন্য তাঁর জীবনের উপযুক্ত সময়।
আরেকজনের মতে, পরিবারকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাওয়াতা একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। এতে ভবিষ্যতে আরও বেশি নারী রাজনীতিতে আসতে উৎসাহিত হবেন।
তবে সমালোচকদের মত ভিন্ন। তাঁদের দাবি, জনসেবার দায়িত্ব থেকে সাময়িকভাবে সরে দাঁড়ানোটা ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন’ আচরণ। কেউ কেউ বলেছেন, কাওয়াতা যদি সন্তান নিতে চাইতেন, তাহলে নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব গ্রহণের আগেই তা করা উচিত ছিল। আবার কেউ বলেছেন, উচ্চপদস্থ কোনো জনপ্রতিনিধি যদি দীর্ঘ সময়ের ছুটি নিতে চান, তাহলে তাঁর পদত্যাগ করা উচিত। অনেকে আবার মাতৃত্বকালীন ছুটির সময় তাঁর বেতন কমিয়ে দেওয়ারও দাবি তুলেছেন।
তবে এসব সমালোচনাকে গুরুত্ব দেননি কাওয়াতা। এই মেয়র গর্বের সঙ্গে বলেছেন, তিনি তাঁর কাজ ভালোবাসেন। একই সঙ্গে তাঁর বিশ্বাস, এখনই সন্তান নেওয়া এবং পরিবার গড়ে তোলার জন্য তাঁর জীবনের উপযুক্ত সময়।
কাওয়াতা বলেন, ‘মাতৃত্বকালীন ছুটি নেওয়ার কারণে রাজনীতিকদের সমালোচনা করার অর্থ হলো কার্যত ২০ থেকে ৪০ বছর বয়সী, অর্থাৎ সন্তান ধারণে সক্ষমতা থাকা সব নারীকেই জনপ্রতিনিধি হওয়ার সুযোগ থেকে বাদ দেওয়া।’
হিরোশিমার আকিতাকাতা শহরের সাবেক মেয়র শিনজি ইশিমারুর মতে, মাতৃত্বকালীন ছুটির সময় কীভাবে জনপ্রতিনিধির দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা হবে, তার কার্যকর ব্যবস্থা করাটাই আসল বিষয়।
নিজের ইউটিউব চ্যানেলে ইশিমারু বলেন, অধিকাংশ মানুষই মাতৃত্বকালীন ছুটিকে ইতিবাচকভাবে দেখেন। তবে তিনি চান, এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এমন একটি গঠনমূলক আলোচনা শুরু হোক, যেন পৌরসভার স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত না করেই সমস্যাটির কার্যকর সমাধান খুঁজে বের করা যায়।
শোকো কাওয়াতা ৩৩ বছর বয়সে জাপানের ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ নারী হিসেবে মেয়র নির্বাচিত হন। তিনি কিয়োটো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেছেন। এরপর স্থানীয় সরকার ও রাজনীতিতে ক্যারিয়ার গড়ে তোলেন।
সরকারিভাবে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কাওয়াতা অবসরে চা–চক্রে অংশ নিতে, কিমোনো পোশাক পরতে এবং বিভিন্ন শিন্তো মন্দির ও বৌদ্ধ মন্দির পরিদর্শন করতে পছন্দ করেন। জাপানে পুরুষ আধিপত্যপূর্ণ রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা বাধা পেরিয়ে তিনি ধাপে ধাপে নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন। গত বছরের তথ্য অনুযায়ী, জাপানে ১ হাজার ৭২০টি পৌরসভার প্রধানের মধ্যে মাত্র ৪ শতাংশ ছিলেন নারী।
দেশটি ইতিমধ্যে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী পেয়েছে। তবে রাজনীতিতে আরও বেশি নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পর্যাপ্ত উদ্যোগ না নেওয়ার অভিযোগে জাপান সরকার নিয়মিত সমালোচনার মুখে পড়ে।
অনেকের মতে, পুরুষপ্রধান মন্ত্রিসভা এবং ক্ষমতাসীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) এ সমস্যার অন্যতম কারণ। এই এলডিপি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের অধিকাংশ সময় জাপানের শাসনক্ষমতায় আছে।
২০২৫ সালের জুলাইয়ে জাপানের মন্ত্রিপরিষদ কার্যালয়ের এক জরিপে দেখা গেছে, নারীদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণের পথে কয়েকটি বড় প্রতিবন্ধকতা আছে। এর মধ্যে আছে গর্ভধারণ ও মাতৃত্বের বিষয়, রাজনীতি পুরুষদের কাজ—এমন প্রচলিত ধারণা এবং বিভিন্ন ধরনের হয়রানি।
জাপান বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ হলেও লিঙ্গসমতার সূচকে দেশটির অবস্থান দীর্ঘদিন ধরেই নিচের দিকে। ২০২৫ সালের জুনে প্রকাশিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের সর্বশেষ প্রতিবেদনে ১৪৬টি দেশের মধ্যে জাপানের অবস্থান ছিল ১১৮তম। লিঙ্গসমতার ক্ষেত্রে এটি জি–৭–ভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা দেশ।

জাপানে মাতৃত্বকালীন ও পিতৃত্বকালীন ছুটির ব্যবস্থা আছে। বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, নারীরা সন্তান জন্মের নির্ধারিত সময়ের আগে ছয় সপ্তাহ এবং সন্তান জন্মের পর আট সপ্তাহ ছুটি নিতে পারেন। অন্যদিকে বাবারা সন্তানের জন্মের পরবর্তী আট সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ চার সপ্তাহের সবেতন ছুটি পাওয়ার অধিকার রাখেন।
সন্তানের বয়স এক বছর হওয়া পর্যন্ত মা–বাবা দুজনই শিশুর দেখাশোনার জন্য ছুটি নেওয়ার অধিকার রাখেন। এ সময় যোগ্য কর্মীরা প্রথম ১৮০ দিন তাঁদের বেতনের ৬৭ শতাংশ এবং এরপর ৫০ শতাংশ হারে ভাতা পান। ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে চালু হওয়া নতুন নিয়ম অনুযায়ী, মা–বাবা দুজনই যদি ছুটি নেন, তাহলে প্রথম ২৮ দিনের জন্য কিছু পরিবার আরও বেশি আর্থিক সহায়তা পেতে পারে।
উপ–মেয়র শিগেতো নোসে বলেন, ‘আমার মনে হয়, কোনো নারী মেয়র দায়িত্বে থাকা অবস্থায় সন্তান জন্ম দিলে বাস্তবে সেই পরিস্থিতি কীভাবে সামাল দেওয়া হবে, তা অনেকেই এখন দেখার অপেক্ষায় আছেন।’
কাওয়াতার অনুপস্থিতিতে ৬২ বছর বয়সী নোসে মেয়রের সব নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে তিনি সপ্তাহে একবার দূর থেকে কাওয়াতার সঙ্গে আলোচনা করবেন।
দুই সন্তানের বাবা নোসে বলেন, তিনি নিজে কখনোই পিতৃত্বকালীন ছুটি নেননি। সন্তানদের দেখাশোনার প্রায় পুরো দায়িত্বই তাঁর স্ত্রী পালন করেছেন। তিনি আরও বলেন, ‘কাজ শেষে বাড়ি ফিরলে আমি খুব ক্লান্ত থাকতাম। রাতে বাচ্চা কাঁদলেও আমি সেটি আমার স্ত্রীর ওপরই ছেড়ে দিতাম। এখন পেছন ফিরে তাকালে সত্যিই মনে হয়, বিষয়টি নিয়ে আমার আত্মসমালোচনা করা উচিত।’
তবে সময় বদলেছে বলে মনে করেন নোসে। তাঁর জামাতা বর্তমানে ছয় মাসের ছুটি নিয়ে তাঁর মেয়েকে তাঁদের দ্বিতীয় সন্তানের দেখাশোনায় সহযোগিতা করছেন। তিনি বলেন, ‘এটা দেখে আমি খুব আনন্দ পাই। সময় সত্যিই বদলেছে। তাদের এভাবে একসঙ্গে দায়িত্ব ভাগ করে নিতে দেখে খুব ভালো লাগে।’
কাওয়াতার মতে, তাঁকে ঘিরে সমালোচনার একটি বড় কারণ হলো সমাজে প্রচলিত একটি ধারণা। সেটা হলো, জনপ্রতিনিধির মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত জীবন ছেড়ে পুরোপুরি জনগণের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করতে হবে।
গর্ভধারণকে ঘিরে এত আলোচনা-সমালোচনা সম্পর্কে তাঁর অনাগত সন্তান ভবিষ্যতে কী ভাববে—এমন প্রশ্নের জবাবে কাওয়াতা বলেন, ‘আমার ধারণা, সে বিস্মিত হবে।’
এই নারী মেয়র আরও বলেন, ‘আমাদের এমন একটি সমাজ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে নারীরা একই সঙ্গে কাজ ও পরিবার—দুটিই স্বাভাবিকভাবে সামলাতে পারবেন। তাঁদের যেন আর চাকরি ও পরিবার—এ দুটির মধ্যে একটিকে বেছে নিতে না হয়।’