Image description

ভারতের কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধী ইসরায়েল-গাজা সংঘাতের বিষয়ে মোদি সরকারের অবস্থানের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি যুক্তি দিয়েছেন, গাজায় ইসরায়েলের ‘গণহত্যা’র ঘটনায় ভারতের ‘পাথরের মতো নীরবতা’ এবং ‘নিষ্ক্রিয়তা’ কেবল নৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্যই নয়, বরং দেশের কৌশলগত স্বার্থেরও পরিপন্থি।

 

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে প্রকাশিত এক প্রবন্ধে কংগ্রেস সংসদীয় দলের এই চেয়ারপার্সন দাবি করেন, ভারত ফিলিস্তিন, ইরান এবং বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যে তার ঐতিহাসিক মিত্রদের থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করেছে, বিশ্ব জনমত থেকে দূরে সরে গেছে এবং পাকিস্তানকে কূটনৈতিক পরিসর ছেড়ে দিয়েছে। তিনি আরও বলেন, ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল হামলার ঠিক আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ইসরায়েল সফর একটি ‘বিস্ময়কর সিদ্ধান্ত’।

তার মতে, গাজা এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ভারতের নৈতিক দায়বদ্ধতা এবং জাতীয় স্বার্থ উভয়ের জন্যই আরও জোরালো প্রতিক্রিয়া প্রয়োজন। ফিলিস্তিনিরা নিষ্ঠুরভাবে বাস্তুচ্যুতি ও সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত’ হয়েছেন বলেও অভিমত ব্যক্ত করেন তিনি। তিনি লিখেছেন, ‘মোদি সরকারের ক্রমাগত নীরবতাকে কোনোভাবেই যৌক্তিকভাবে বা নৈতিকভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না।’

অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড বিষয়ক জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের অনুসন্ধানের কথা উল্লেখ করে কংগ্রেস নেত্রী বলেন, সংস্থাটি সেপ্টেম্বর ২০২৫-এ এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিল যে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ গাজায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে গণহত্যা চালাচ্ছে। তিনি কমিশনের জুন ২০২৬-এর প্রতিবেদনের কথাও উল্লেখ করেন। বলেন, এই প্রতিবেদনে পুনরায় বলা হয়েছে যে, শিশুদের লক্ষ্য করে গাজায় ফিলিস্তিনিদের অস্তিত্বকেই ধ্বংস করা ইসরায়েলি কর্মকাণ্ডের উদ্দেশ্য।

সোনিয়া লিখেছেন, ‘৯৪ পৃষ্ঠার এই প্রতিবেদনটি এক মর্মান্তিক পাঠ, যেখানে গাজায় ইসরায়েলের চালানো ধ্বংসযজ্ঞের ব্যাপকতা এবং এর পেছনের গণহত্যার উদ্দেশ্য সম্পর্কে ভয়াবহ বিবরণ রয়েছে। অন্তত ২০ হাজার শিশু নিহত হয়েছে এবং আরও ৪৪ হাজার শিশু আহত হয়েছে, যাদের অনেকেই আজীবন ক্ষত বহন করবে।’

শিশুদের লক্ষ্যবস্তু করাটা আকস্মিক নয়, বরং ইচ্ছাকৃত ছিল বলে যুক্তি দেন তিনি। বলেন, প্রতিবেদনের পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি বলেন, নিহত বা আহতদের ২৭ শতাংশই ছিল শিশু এবং গাজার ৯৭ শতাংশ স্কুল ধ্বংস হয়ে গেছে। তিনি আরও অভিযোগ করেন, শিশু হাসপাতালসহ স্বাস্থ্যসেবা পরিকাঠামো ধ্বংসের ফলে গর্ভপাত এবং প্রসবকালীন জটিলতা বৃদ্ধি পেয়েছে ৩০০ শতাংশ।

হামাসের বিরুদ্ধেও নিজের অভিমত ব্যক্ত করেন সোনিয়া। ২০২৩ সালের অক্টোবরে ফিলিস্তিনের সশস্ত্র গোষ্ঠীটির ইসরায়েলের ওপর চালানো হামলাকে ‘কাপুরুষোচিত, ভয়াবহ এবং একেবারেই অগ্রহণযোগ্য’ হিসেবে বর্ণনা করেন তিনি। এরপর শুরু হওয়া ইসরায়েলের আগ্রাসনের বিষয়েও তিনি বলেন, ইসরায়েলের পরবর্তী সামরিক প্রতিক্রিয়া ছিল বেপরোয়া নিষ্ঠুরতা ও বর্বরতায় পরিপূর্ণ।

তিনি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং তার মন্ত্রিসভার সদস্যদের সহ শীর্ষ ইসরায়েলি নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন যে, তারা গাজাকে ‘সম্পূর্ণ অবরোধ’ এবং ‘পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন’ করার আহ্বানের মাধ্যমে ‘গণহত্যার ক্ষেত্র’ তৈরি করেছে। সোনিয়া আরও যুক্তি দেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের অব্যাহত সমর্থন ইসরায়েলকে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে একটি ‘নিষ্ঠুর অভিযান’ চালিয়ে যেতে সক্ষম করেছে।

 

তিনি জানান, যদিও মার্কিন বাধার কারণে জাতিসংঘ সীমাবদ্ধ ছিল, তবুও এর সংস্থাগুলো ইসরায়েলের যুদ্ধাপরাধ নথিভুক্ত করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বিশ্ব জনমতের পরিবর্তনের দিকে ইঙ্গিত করে সোনিয়া উল্লেখ করেন, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, কানাডা এবং অস্ট্রেলিয়াসহ ঐতিহ্যগতভাবে পশ্চিমা জোটের সঙ্গে যুক্ত দেশগুলো ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিয়েছে।

আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে দক্ষিণ আফ্রিকার মামলা, ইসরায়েলের কাছে অস্ত্র বিক্রির ওপর বেশ কয়েকটি ইউরোপীয় দেশের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা এবং বেশ কয়েকটি লাতিন আমেরিকান দেশের কূটনৈতিক মর্যাদা হ্রাসের বিষয়টিও তুলে ধরেন কংগ্রেস নেত্রী। এ বিষয়ে ভারতের অবস্থানের বিষয়ে সোনিয়া গান্ধী বলেন, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান জনরোষ এবং গাজায় সংঘটিত অন্যায্য নৃশংসতার বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সচেতনতার মাঝেও ভারত একাকী নীরব রয়েছে।’

 

এ বিষয়ে তিনি আরও বলেন, বিচারপতি মুরলীধরের প্রতিবেদনের বিষয়ে নরেন্দ্র মোদি সরকারের নীরবতা আশ্চর্যজনক নয়। তিনি স্মরণ করেন, ২০২০ সালের দিল্লি দাঙ্গার আগে বিজেপি নেতাদের কথিত উসকানিমূলক মন্তব্যের বিষয়ে দিল্লি পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার সমালোচনা করার পর তাকে দিল্লি হাইকোর্ট থেকে বদলি করা হয়েছিল।

 

এ সময় ভারতের ঐতিহাসিক পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন সোনিয়া। বলেন, ভারত ঐতিহাসিকভাবে ঔপনিবেশিক-পরবর্তী সংহতি, জাতীয় সার্বভৌমত্ব এবং আন্তর্জাতিক শান্তির প্রতি তার অঙ্গীকারের মাধ্যমে নিজেকে স্বতন্ত্র করেছে। তিনি লিখেছেন, ‘আজ আমরা বৈশ্বিক নিয়ম-ভিত্তিক ব্যবস্থার নির্লজ্জ লঙ্ঘন, গ্লোবাল সাউথের আমাদের সহ-মানুষদের দুর্ভোগ এবং গাজা ও পশ্চিম তীরে প্রকাশ্যে প্রদর্শিত মানব মর্যাদার অবমাননার প্রতি আমাদের অব্যাহত উদাসীনতার জন্য ব্যতিক্রমী।’

 

পাঁচ বছর বয়সী হিন্দ রাজাবের মৃত্যুর কথা স্মরণ করে সোনিয়া তাকে গাজার ওপর চাপানো ‘অকথ্য নিষ্ঠুরতার’ প্রতীক হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘মাত্র পাঁচ বছরের একটি মেয়ে, তার পরিবারের সাথে গাজা শহর থেকে পালিয়ে যাওয়ার সময় ইসরায়েলি বাহিনী তাদের গাড়ির ওপর ৩৩৫ রাউন্ড গুলি চালায়। তার পরিবারের ছয় সদস্যকে হত্যা করে, প্যারামেডিকরা যখন তাকে উদ্ধারের চেষ্টা করছিল, তখন ওই ছোট্ট মেয়েটি তার পরিবারের মৃতদেহের সাথে গাড়িটিতে আটকা পড়েন। পরে তিনি এবং দুজন প্যারামেডিকও নিহত হন।’

 

ভারতের নীরবতা নৈতিক ও কৌশলগত উভয় দিক থেকেই ক্ষতিকর ছিল, এই কথা পুনর্ব্যক্ত করে তিনি যুক্তি দেন, যখন বিশ্বের বেশিরভাগ দেশ ইসরায়েলের কৌশলগত কক্ষপথ থেকে সরে যাচ্ছে, তখন নয়াদিল্লি আরও গভীরে প্রবেশ করছে। সোনিয়া লিখেছেন, ‘আমরা ফিলিস্তিন, ইরান এবং বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যে আমাদের ঐতিহাসিক মিত্রদের থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছি। আমরা বিশ্বজনমত থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে নিয়েছি। আর আমরা পাকিস্তানকে মধ্যস্থতাকারীর স্থান দখল করতে দিয়েছি।’

 

মোদি নেতানিয়াহুর ব্যক্তিগত সখ্যতা ছাড়া আর কিছুই লাভ করেনি বলেও মন্তব্য করেছেন সোনিয়া। এক্স-এ নিবন্ধটি শেয়ার করে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে এটিকে একটি ‘কঠোর অনুস্মারক’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন যে কীভাবে ভারতের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতি ফিলিস্তিন, ইরান এবং বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যে তার ঐতিহাসিক মিত্রদের বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে।

 

রাহুল গান্ধীও নিবন্ধটি শেয়ার করে বলেছেন, এটি ভারতকে একটি স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি পুনরুদ্ধার করতে, মানবিক মূল্যবোধ সমুন্নত রাখতে এবং নৈতিক স্বচ্ছতার সাথে গাজা বিষয়ে কথা বলতে আহ্বান জানিয়েছে। তবে, সোনিয়া গান্ধীর সমালোচনার পাল্টা জবাব দিয়েছে ক্ষমতাসীন বিজেপি এবং কংগ্রেস নেত্রীকে গাজা সংঘাতে ভারতের অবস্থানকে ভুলভাবে উপস্থাপন করার জন্য অভিযুক্ত করেছে।

 

নিবন্ধটির প্রতিক্রিয়ায় বিজেপির জাতীয় মুখপাত্র শেহজাদ পুনাওয়ালা অভিযোগ করেন, এটি আবারও প্রমাণ করে, কীভাবে ‘ভোটব্যাঙ্কের রাজনীতি’ প্রাধান্য পায়। সোনিয়া গান্ধী তার প্রবন্ধের মাধ্যমে জনগণকে বিভ্রান্ত করার এবং আসল সত্য গোপন করার চেষ্টা করছেন। ভারত গাজা ও ফিলিস্তিন বিষয়ে বারবার তার অবস্থান স্পষ্ট করেছে, মানবিক সহায়তা পাঠিয়েছে এবং যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়ে সমর্থন করেছে জাতিসংঘের প্রস্তাবকে।

 

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, ফিলিস্তিন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে তাদের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা প্রদান করেছে বলেও জানান শেহজাদ। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী মোদিই একমাত্র ব্যক্তি যিনি একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রেখে একই সাথে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন, আমেরিকা, রাশিয়া ও ইউক্রেন এবং পশ্চিমা শিবির ও ইরানের সঙ্গে কথা বলতে সক্ষম হয়েছেন। এটি জোটনিরপেক্ষতার নীতি নয়, বরং সর্বদলীয়তার নীতি।

 

মোদির কূটনৈতিক তৎপরতার কথা তুলে ধরে বিজেপির এই মুখপাত্র উল্লেখ করেন, প্রধানমন্ত্রী বেশ কয়েকটি মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ৩০টিরও বেশি সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা পেয়েছেন। কংগ্রেসের সমালোচনা করে তিনি বলেন, বিদেশে মুসলিমদের প্রভাবিত করে এমন বিষয়গুলোকে বেছে বেছে দলটি কথা বলে, অথচ পাশের দেশে ‘হিন্দুদের দুর্দশা’র বিষয়ে নীরব থাকে।

 

সূত্র: টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়া