Image description

চলতি বছরের বসন্তে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের গোপন শান্তি আলোচনা চলছিল। মার্কিন কর্মকর্তাদের আশঙ্কা ছিল, ঠিক ওই সময়েই ইরানের শীর্ষ প্রতিনিধিদের হত্যার ছক কষেছিল ইসরাইল।

যুদ্ধের শুরু থেকেই জ্যেষ্ঠ ইরানি নেতাদের হত্যা করা ইসরাইলের মূল কৌশল ছিল। তবে গত এপ্রিল মাসে যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা শুরু হলে মার্কিন উদ্বেগ অনেক বেড়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের ভয় ছিল মূলত ইরানের দুই শীর্ষ নেতাকে নিয়ে। একজন হলেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। অন্যজন পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ।

যুক্তরাষ্ট্রের আশঙ্কা ছিল, ইসরাইল যদি এই দুই নেতাকে হত্যা করে, তবে শান্তি আলোচনা পুরোপুরি ভেস্তে যাবে। এই ভয় থেকে মার্কিন প্রশাসন মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের সাহায্য নেয়। সেসব দেশের মাধ্যমে ইরানের কাছে সতর্কবার্তা পাঠানো হয় যে, ইসরাইল তাদের লক্ষ্যবস্তু করতে পারে।

মার্কিন কর্মকর্তারা অবশ্য স্বীকার করেছেন, যুদ্ধের তীব্র পর্যায় চলাকালে আরাগচি ও গালিবাফ ইসরাইলের জন্য বৈধ লক্ষ্যবস্তু হতে পারতেন। কারণ ইসরাইলের মূল উদ্দেশ্য ছিল ইরানের কট্টরপন্থি সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা। কিন্তু এপ্রিল মাসে আলোচনা শুরু হওয়ার পর মার্কিনরা মনে করত, এখন এই নেতাদের ওপর হামলা হলে আলোচনা বন্ধ হয়ে যাবে। ফলে নতুন করে আবার যুদ্ধ শুরু হবে।

চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরাইলি বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং অন্য শীর্ষ নেতারা নিহত হন। এর মাধ্যমেই এই যুদ্ধের সূচনা হয়। ওই হামলায় আংশিকভাবে মার্কিন গোয়েন্দা তথ্যের সাহায্য নেওয়া হয়েছিল।

যুদ্ধের শুরুতে মার্কিন বাহিনী ইরানের নৌ ও ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিতে হামলা চালায়। তবে ইসরাইলের অগ্রাধিকার ছিল ইরানের নেতৃত্ব ধ্বংস করা। তারা ট্রাম্প প্রশাসনের পছন্দের বাস্তববাদী বা নরমপন্থি নেতাদেরও হত্যা করে। এদের মধ্যে ছিলেন ইরানের শীর্ষ জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তা আলী লারিজানি এবং সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী কামাল খরাজি। এই দুই নেতাই আমেরিকার সঙ্গে আলোচনা প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলেন এবং ইসরাইলি বিমান হামলায় মারা যান।

ইরানি প্রতিনিধিদের হত্যার বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের এই সন্দেহ একটি বিষয় প্রমাণ করে। যুদ্ধের শুরুতে মার্কিন ও ইসরাইলি লক্ষ্য এক থাকলেও, পরে তা পুরোপুরি আলাদা হয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্র একটি শান্তি চুক্তি চাইলেও, ইসরাইল প্রথম থেকেই যুদ্ধবিরতির বিরোধিতা করে আসছিল।

এপ্রিল মাসে দুই সপ্তাহের প্রাথমিক যুদ্ধবিরতি দেওয়া হয়। ইসরাইলি সরকার অনিচ্ছা সত্ত্বেও এটি মেনে নেয়। তবে ইসরাইলের জনগণের মধ্যে ক্ষোভ ছিল যুক্তরাষ্ট্র খুব দ্রুত যুদ্ধ শেষ করে দিচ্ছে। তাছাড়া ইরানের ধর্মীয় সরকার ক্ষমতা হারানোর বদলে আরো কট্টরপন্থি হয়ে ওঠে। ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোরের (আইআরজিসি) দেশের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরো শক্ত করে।

সব বাধা সত্ত্বেও আরাগচি ও গালিবাফ আমেরিকার সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী শান্তির লক্ষ্যে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যান। জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি প্রাথমিক চুক্তিতে পৌঁছায়। এর উদ্দেশ্য ছিল হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করা। পাশাপাশি তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে পরবর্তী আলোচনার পথ তৈরি করা।

ইসরাইলের কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকরা এই চুক্তিকে একটি বড় বিপর্যয় হিসেবে দেখেন। কারণ এটি ইসরাইলের যুদ্ধের লক্ষ্যগুলো পূরণ করতে পারেনি। ইসরাইলের লক্ষ্য ছিল ইরানের শাসনব্যবস্থার বদল, তাদের প্রক্সি বাহিনী ধ্বংস এবং ক্ষেপণাস্ত্র ক্ষমতা গুঁড়িয়ে দেওয়া। ইসরাইলি কর্মকর্তাদের ভয় ছিল, এই চুক্তির ফলে ইরানে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার আসবে। সেই টাকা দিয়ে ইরান দ্রুত নিজেকে পুনর্গঠন করবে এবং তাদের পারমাণবিক আকাঙ্ক্ষাও থামানো যাবে না।

এ বিষয়ে ওয়াশিংটনে ইসরাইলি দূতাবাসের মুখপাত্র কোনো মন্তব্য করতে চাননি। অন্যদিকে এক মার্কিন কর্মকর্তা জানান, দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে আলোচনা এখনও চলছে। বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং প্রেসিডেন্টের জামাতা জ্যারেড কুশনার কাতারে ভালো বৈঠক করেছেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চান এই শান্তি প্রক্রিয়া যেন এগিয়ে যায়।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল মার্চ মাসে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। সেখানে বলা হয়, ইসরাইলের লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় আরাগচি ও গালিবাফের নাম ছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা শুরু হওয়ায় সাময়িকভাবে তাদের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল।

মার্কিন এবং মধ্যপ্রাচ্যের একজন কর্মকর্তা জানান, ট্রাম্প প্রশাসন জানতে পেরেছিল যে অন্তত গালিবাফ ইসরাইলের তালিকায় আছেন। এরপরই যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে এই কাজ থেকে বিরত থাকার অনুরোধ করে।

গালিবাফ গত ২০২৫ সালের জুনের ১২ দিনের যুদ্ধে এবং এবারের সংঘাত উভয় সময়ই অল্পের জন্য বেঁচে যান। এবারের যুদ্ধে ইসরাইল পাহাড়ের নিচের একটি গোপন বাংকারে হামলা চালিয়েছিল। সেখানে জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তাদের বৈঠক চলছিল।

ইরানি কর্মকর্তাদের মতে, দুই বারই গালিবাফকে ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে জীবিত উদ্ধার করা হয়।

এপ্রিলের শেষ দিকে ইসলামাবাদ বৈঠকের পর ইরানের একজন আইনপ্রণেতা মোহসেন জাঙ্গানেহ স্থানীয় গণমাধ্যমে বলেন, ‘আজ জনাব গালিবাফ ও জনাব আরাগচি মারাত্মক নিরাপত্তা ঝুঁকি জেনেও জীবন বাজি রেখে চলছেন। একে রাজনৈতিক চাল বলা যায় না, এটি প্রকৃত ত্যাগ।’

আলোচনা চলাকালে শীর্ষ নেতাদের সুরক্ষায় ইরান বাড়তি সতর্কতা নেয়। এপ্রিলে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সঙ্গে গালিবাফের সাক্ষাতের কথা ছিল। কিন্তু ইরানি নিরাপত্তা দল আশঙ্কা করছিল, আলোচনা নষ্ট করতে ইসরাইল গালিবাফ বা আরাগচিকে হত্যা করতে পারে।

এই কারণে ইরানিরা পাকিস্তান ও কাতারের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে একটি নিশ্চয়তা চায়। তারা নিশ্চয়তা চায় যেন ইসরাইল কোনো গোপন হামলা না চালায়। সফরের সময় পাকিস্তানের যুদ্ধবিমানগুলো ইরানি প্রতিনিধিদলের বিমানটিকে সীমান্ত পর্যন্ত পাহারা দিয়ে নিয়ে যায় এবং আসার সময়ও পাহারা দেয়।

কিন্তু তেহরানে ফেরার পথে একটি বড় হুমকি তৈরি হয়। ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী গালিবাফের বিমানটিকে জানায়, ইসরাইল বিমানটিতে হামলার ছক কষেছে। দুটি ইসরাইলি যুদ্ধবিমান ইরাক সীমান্ত দিয়ে ইরানের আকাশসীমায় ঢুকে পড়েছে।

গালিবাফের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা মাহদি মোহাম্মদী ওই বিমানেই ছিলেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই খবরের সত্যতা নিশ্চিত করেন। এরপর বিমানটি পাকিস্তানের সীমান্ত সংলগ্ন ইরানের মাশহাদ বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করে। সেখান থেকে ইরানি প্রতিনিধিদল সড়কপথে প্রায় আট ঘণ্টা জার্নি করে তেহরানে পৌঁছায়।

সূত্র: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস