ইউরোপজুড়ে চলমান দাবদাহে গত ২১ জুন থেকে এ পর্যন্ত ১ হাজার ৩০০ মানুষের মৃত্যুর তথ্য জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। সোমবার (২৯ জুন) ডব্লিউএইচওর প্রধান তেদরোস আধানোম গেব্রেয়াসুস এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
তীব্র গরমে সবচেয়ে বেশি বিপর্যয় ঘটেছে ফ্রান্সে। দেশটির জনস্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, ২০ জুন থেকে শুরু হওয়া তাপদাহে ফ্রান্সে অতিরিক্ত এক হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। তাপদাহ শুরুর আগে দেশটিতে দৈনিক মৃত্যুর গড় হার ছিল ৯০০ জনের মতো। এ ছাড়া সেখানে পানিতে ডুবে অন্তত ৪০ জন মারা গেছেন।
জার্মানিতেও অতিরিক্ত গরমে হ্রদ ও নদীতে সাঁতার কাটতে গিয়ে অন্তত সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে, স্পেনের বিলবাওয়ের একটি নার্সিং হোমে ৯০ বছর বয়সী এক নারী এবং আলমেরিয়াতে ৬৮ বছর বয়সী এক পুরুষ হিটস্ট্রোকে মারা গেছেন।
গত রোববার ইউরোপের বেশ কিছু অঞ্চলে, বিশেষ করে জার্মানি, চেক প্রজাতন্ত্র এবং পোল্যান্ডে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে (১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট) পৌঁছানোয় যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে।
ফ্রান্সে কয়েক দিনের গড় তাপমাত্রা ২৯ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকলেও একটি শহরে তা সর্বোচ্চ ৪৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠেছিল।
ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের গ্র্যানথাম ইনস্টিটিউট অব ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টের প্রভাষক গ্যারিফালোস কনস্ট্যান্টিনিডিস আল জাজিরাকে বলেন, ‘তীব্র দাবদাহ মানুষের শরীরে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। বিশেষ করে যখন শরীর নিজের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, তখন হিট স্ট্রেস হয়। এর ফলে ডিহাইড্রেশন, ক্লান্তি এবং হিটস্ট্রোক হতে পারে।’
তিনি জানান, হিটস্ট্রোকের কারণে শরীরের ভেতরের তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে উঠে যায় এবং অঙ্গ নিষ্ক্রিয় হয়ে দ্রুত মৃত্যু ঘটতে পারে।
কনস্ট্যান্টিনিডিস আরও বলেন, হিট স্ট্রেসের ফলে হৃদরোগ, স্ট্রোক এবং শ্বাসযন্ত্র বিকলের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইউরোপীয় দেশগুলোকে জনস্বাস্থ্য রক্ষা ও দীর্ঘমেয়াদি নীতি সংস্কারে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
আবহাওয়াবিদদের মতে, ইউরোপের এই চরম তাপমাত্রার কারণ হলো একটি বিশাল উচ্চচাপ বলয় বা ‘হিট ডোম’, যা বায়ুমণ্ডলের ‘ওমেগা ব্লক’ নামক পরিস্থিতির মাধ্যমে তৈরি হয়েছে।
রয়্যাল হলওয়ে ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের রিডার লরি পার্সনস আল জাজিরাকে বলেন, ‘আগে যে তীব্র দাবদাহ ৩০০ বছরে একবার হতো, তা এখন প্রতি দশকেই একবার বা তার বেশি ঘটছে।’
ইউরোপের জলবায়ু সাধারণত শীতল হওয়ায় ঐতিহ্যগতভাবে এখানকার ঘরবাড়ি তৈরি হয়েছে শীতকালে তাপ আটকে রাখার উপযোগী করে, যা এই গরমে মরণফাঁদ। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশগুলো বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে। প্যারিস ও ডেনমার্কে প্রবীণদের কল্যাণে বিশেষ নজরদারি শুরু হয়েছে এবং বার্সেলোনায় ৫০০টিরও বেশি জলবায়ু আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এ ছাড়া ইউরোপীয় ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন কর্মরতদের সুরক্ষায় একটি নির্দেশিকা জারির দাবি জানিয়েছে।
ইউরোপীয় খাদ্য, কৃষি ও পর্যটন ট্রেড ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক এনরিকো সোমাগ্লিয়া বলেন, ‘আমরা আইন প্রণেতাদের অদূরদর্শী সিদ্ধান্তের ওপর আরেকটি গ্রীষ্ম পার করতে পারি না। কর্মীদের সুরক্ষায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের একটি বাধ্যতামূলক নির্দেশিকা প্রয়োজন।’
তথ্যসূত্র: আল-জাজিরা