ন্যাড়া একবার বেলতলা যায়। বেলতলা বারবার যায় কেবল বেকুবরাই। ২০০৬ সালের এপ্রিলে চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাটে আন্দোলন গড়ে উঠেছিলো নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের দাবিতে। একই বছর মে মাসে রাজধানীর যাত্রাবাড়িতে আন্দোলন হয় বিদ্যুৎ ও পানি সঙ্কট নিরসনের দাবিতে। বিক্ষুব্ধ মানুষের ধাওয়ার মুখে দৌড়ে প্রাণে রক্ষা পান ওই নির্বাচনি এলাকার তৎকালীন এমপি সালাহউদ্দিন আহমেদ।
‘ঢাকায়ও লোশেডিং দিতে হবে’। ‘কারিগরি ত্রুটির কারণে দেশের দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেছে।’ ‘প্রায় তিন হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন থেকে বেরিয়ে গেছে। এ কারণে দেশের বিভিন্ন জায়গায় লোডশেডিং দিতে হচ্ছে।’ সংসদে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রীর এমন বক্তব্য দুই দশক আগের কানসাঁ-ডেমরার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। মনে করিয়ে দেয়-ঠিক কীভাবে তখন আ’লীগ বিক্ষুব্ধ মানুষকে বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলেছিলো। এ কারণে লোডশেডিং মামুলি কোনো পণ্য সঙ্কট নয়। এটি এমন এক সঙ্কট, যা সকল সঙ্কটকে ছাপিয়ে সরকার ব্যবস্থায় ধাক্কা দিতে পারে। ‘লোডশেডিং’ তাই শুধু অন্ধকার কিংবা বিদ্যুৎ না থাকার নাম নয়। এটি বরং একটি স্ফুলিঙ্গ। একটি টাইম বোমা। সরকারের অসতর্ক মুহূর্তে যা বিস্ফোরিত হতে পারে যেকোনো সময়।
সরকার অনেক সম্ভাবনার কথা বলছে। প্রধানমন্ত্রীর চীন ও মালয়েশিয়া সফরের পর অনেক সম্ভাবনাই হয়তো উঁকি দিচ্ছে। কিন্তু বড় বাস্তবতা হচ্ছে, দেশে চাহিদানুগ বিদ্যুৎ নেই। এ কারণে বহুমাত্রিক সঙ্কটে নিপতিত দেশ। বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের বিষয়টি এখন সরকার পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে নিজেই স্বীকার করছে। অথচ বিদ্যুৎ হচ্ছে দেশের অর্থনীতির ‘লাইফলাইন’। গ্রীষ্ম মৌসুমে বিঘœ ঘটছে এই লাইফ লাইনে। কর্মক্লান্ত শ্রমিক যখন বাসায় ফেরেন, তখন বিদ্যুৎ পাচ্ছেন না। ফ্যানের পাখা ঘুরছে না। পানি ওঠানোর মটর অচল। ট্যাপে পানি নেইতো গোসল নেই। হয় না ধোয়া-মোছার কাজ। ঘুটঘুটে অন্ধকারে হাতরাতে হয় মোবাইল ফোন। বিদ্যুৎ না থাকায় দেয়া যাচ্ছে না মোবাইল চার্জ। ফ্রিজ বন্ধ। সকালে রান্না করে যাওয়া খাবার রাতে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। নিম্ন আয়ের শ্রমিকের অধিকাংশের বসত ছাপড়া ঘরে। তীব্র গরমে দিনে স্বস্তি নেই। রাতেও ঘুম হয়না তাদের। ঘুম না হলে মেজাজ খিটখিটে থাকে। ক্লান্তি ভর করে। কাজে মন বসে না। শ্রমিক আক্রান্ত হয় নানাবিধ অসুখ-বিসুখে। এটি সরাসরি শ্রমজীবী মানুষের উৎপাদন ক্ষমতার ওপর আঘাত। শ্রমজীবী মানুষ অর্থনীতির চালিকা শক্তি। চাকা না ঘুরলে যেমন উৎপাদন হয় না, শ্রমিক কাজ না করলে থেমে যায় জাতীয় অর্থনীতির চাকা। দৈনন্দিন জীবনচক্রে ছন্দপতন ঘটে। লোডশেডিং শুধু ব্যক্তি জীবনকেই বিপর্যস্ত করছে না। সামষ্টিক অর্থনীতিতেও ফেলছে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব।
গাজীপুর, সাভার ও নারায়ণগঞ্জের মতো প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোতে দৈনিক কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হওয়ায় কারখানাগুলোকে বিকল্প হিসেবে ডিজেল জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচ ব্যাপকভাবে বাড়ছে এবং বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতা কমছে।
বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে কারখানাগুলো যথাসময়ে উৎপাদন শেষ করতে পারছে না। ফলে ক্রেতাদের ডেডলাইন মিস হওয়া এবং শেষ মুহূর্তে অতিরিক্ত খরচে ‘এয়ার শিপমেন্ট’ বা পণ্য জাহাজীকরণে বাধ্য হতে হচ্ছে। এটি বড় ধরনের আর্থিক লোকসান তৈরি করছে।
গ্রামীণ এবং মফস্বল এলাকায় লোডশেডিংয়ের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি। দৈনিক ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। এর ফলে গ্রামীণ অর্থনীতি সচল রাখা ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প- হালকা প্রকৌশল, ওয়েল্ডিং কারখানা, রাইস মিল, এবং তাঁত শিল্পের উৎপাদন অর্ধেক কমিয়ে আনতে হয়েছে। অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা জেনারেটর কেনার খরচ বহন করতে না পেরে ব্যবসা বন্ধ করে দিচ্ছেন। বিদ্যুৎ সংকটের কারণে হ্যাচারি ও প্রোল্ট্রি খামারগুলোতে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। এতে ব্রয়লার মুরগি ও মাছের পোনা মারা যাচ্ছে। যা বাজারে গোশত ও মাছের সরবরাহ কমিয়ে দিচ্ছে। বাড়িয়ে দিচ্ছে দাম। লোডশেডিংয়ের এমন বহুমাত্রিক প্রতিক্রিয়া জনজীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলছে কানাকানায়।
আগামী ২ জুন শুরু হচ্ছে এইচএসসি, আলিম ও সমমানের পরীক্ষা। চলবে মধ্য আগস্ট পর্যন্ত। এবার প্রায় ১২ লাখ ৭০ হাজার শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। পরীক্ষার আগেই ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছে পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। চলমান জ্বালানি সংকটের মধ্যে আষাঢ়ের তীব্র গরমে বাড়তি ভোগান্তিতে পড়েছে পরীক্ষার্থীরা।
মাধ্যমিক স্কুলগুলোতে শুরু হয়েছে সান্মাষিক ও প্রি-টেস্ট পরীক্ষা। বাসায় বিদ্যুৎ থাকছে না। পরীক্ষার্থীরা প্রস্তুতি নিতে পারছে না। পরীক্ষার হলেও যদি বিদ্যুৎ না থাকে তাহলে পরীক্ষাও খারাপ হবে।
সাধারণত বর্ষা মৌসুমে লোডশেডিংয়ের ভোগান্তি কমে যায়। এবার হয়েছে উল্টো। এখন সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতেও থাকছে ব্যাপকমাত্রায় লোডশেডিং। অনেকে অভিযোগ করছেন, বিদ্যুতের কোনো সঙ্কট নেই। এটি হতে পারে পরিকল্পিত স্যাবোটাজ। অন্তর্ঘাতমূলক। বিদ্যুৎ বিভাগের বিভিন্ন পর্যায়ে আওয়ামীলীগের ফ্যাসিবাদী ভূত এখনো দায়িত্ব পালন করছেন। বিদ্যুতের কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি করে সরকারকে অজনপ্রিয় করতে চাইছে। যে কারণে সরকার সাড়ে ৪ মাসেও বিদ্যুৎ চাহিদা ও সঙ্কটের মধ্যে সমন্বয় ঘাটতে পারেনি।
জাতীয় সংসদে ৩০০ বিধিতে দেওয়া বিবৃতি বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেছেন, দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গতকাল লোডশেডিং দিতে হয়েছিল। এখন বিদ্যুতের উৎপাদন ১৪ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট। আর চাহিদা ১৪ হাজার ৮৩৯। এখন লোডশেডিং হবে ৩৩৯ মেগাওয়াট। আমরা চেষ্টা করছি, এই ৩৩৯ মেগাওয়াটও নামিয়ে আনার। কিছু কিছু জায়গায় লোডশেডিং থাকবে। যাতে না থাকে, সে জন্য আমরা সচেষ্ট আছি।
সাভার ডিজিটাল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের এক অভিভাবক ইনকিলাবকে বলেন, আগামী ২ জুলাই থেকে এইচএসসি ও আলিম পরীক্ষা শুরু হয়ে ৮ আগস্ট পর্যন্ত চলবে। প্রচ- গরম চলছে। পরীক্ষার আগেই ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে চরম ভোগান্তি বাড়ছে। ছেলে মেয়েদের লেখা পড়া হচ্ছে না। পরীক্ষার্থী ছেলেমেয়েদের নিয়ে চিন্তা পড়েছি। আমাদের দাবি পরীক্ষার এ কয়দিন লোডশেডিং বন্ধ করা জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে দাবি জানাই।
অপরদিকে ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম.শামসুল আলম ইনকিলাবকে বলেন, লোডশেডিং এখন স্বাভাবিক হয়ে গেছে, এটা একটা নিত্য বিষয়। নতুন সরকার উদ্যোগী না হলে ভোগান্তি কমবে না, বেশি ভুগবে গ্রামের মানুষ। আমদানির সামর্থ্য কমায় জ্বালানির সরবরাহ নিশ্চিত নয়।
বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্র জানায়, গত ২০ মে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ১৭ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। ওই সময় কয়লা থেকে দেশে ৬ হাজার ৮১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়েছিল। এখন কয়লা দিয়ে উৎপাদন হচ্ছে গড়ে ৪ হাজার ৮০০ মেগাওয়াট। পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিল বকেয়া ৯ হাজার কোটি টাকার বেশি। ৫ হাজার কোটি টাকা বিল বকেয়া থাকায় কয়লা কিনতে পারছে না চট্টগ্রামের বাঁশখালী বিদ্যুৎকেন্দ্র। বকেয়ার চাপ আছে অন্য কেন্দ্রেও। তাই সরবরাহ ধরে রাখা নিয়ে শঙ্কা আছে। কয়েক বছর ধরেই বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিল নিয়মিত পরিশোধ করতে পারছে না পিডিবি। বর্তমানে পিডিবির মোট বকেয়া প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা। দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা এখন ২৮ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। যদিও জ্বালানিসংকটে উৎপাদন হচ্ছে ১৩ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াট। অথচ চাহিদা সাড়ে ১৬ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ফলে দুই থেকে তিন হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে হচ্ছে। পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি বাংলাদেশ (পিজিসিবি) এবং বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্য অনুযায়ী, কয়েক সপ্তাহ ধরে দেশে লোডশেডিং বাড়ছে। ছুটির দিনেও লোডশেডিং দেওয়া হচ্ছে। তিন সপ্তাহ ধরে গড়ে দুই হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং রেকর্ড করা হয়েছে। দেশে বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৮ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হলেও জ্বালানি সংকটের কারণে বাস্তবে উৎপাদন হচ্ছে ১৩ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াট। এর বিপরীতে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুতের চাহিদা ১৭ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিন আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে বাধ্য হচ্ছে।
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ (পিজিবি) পিএলসির হিসেবে, তিন সপ্তাহ ধরে সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্র ও শনিবার গড়ে দুই হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং হয়েছে। বৃষ্টি না হলে এ সপ্তাহে চাহিদা আরও বাড়বে। তখন বাড়তে পারে লোডশেডিংও। দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহের মূল সংস্থা বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। তাদের নির্দেশনায় বিদ্যুৎ সঞ্চালন করে পিজিবি। আর ছয়টি বিতরণ সংস্থা গ্রাহকের কাছে বিদ্যুৎ দেয়, যার মধ্যে সবচেয়ে বড় পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি)। পিজিবির থেকে বলা হয়, প্রতিদিন রাত ১০টার পর থেকে বাড়তে থাকে লোডশেডিং। কিছুদিন ধরে রাত ১২টা থেকে ভোর ৪টা পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি লোডশেডিং করা হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি হচ্ছে আরইবির এলাকায়, অর্থাৎ গ্রামাঞ্চলে। কোনো কোনো গ্রাম এলাকায় দিনে ৫ থেকে ৬ ঘণ্টার বেশি লোডশেডিং হচ্ছে। বিদ্যুৎ খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কর্মকর্তারা জানান,গত কয়েক বছর ধরেই মধ্যরাতে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়তি থাকছে। যদিও এ সময় কমার কথা। সারা দেশে রিকশার ব্যাটারির চার্জের কারণে এটি হতে পারে। এর সঙ্গে এবার যুক্ত হয়েছে ফুটবল বিশ্বকাপ। অধিকাংশ ম্যাচ হচ্ছে রাত ১১টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত। এ সময় রাত জেগে খেলা দেখার কারণে বিদ্যুতের ব্যবহার বেশি হচ্ছে। কিন্তু ওই সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমানো হয়। এতে ঘাটতি বেড়ে যাওয়ায় বাড়তি লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
পিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম এই প্রতিবেদককে বলেন, গত কয়েক দিন থেকে গ্যাস কম পাওয়ার কারণে ৫০০-৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম আসছে। গত দিনগুলোতে ৮০-৮৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যাচ্ছিল। তবে মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে সরবরাহ ৯৫ কোটি ঘনফুট পর্যন্ত বাড়ানো হয়। এতে গ্যাসে সাড়ে পাঁচ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা গেছে। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারিগরি ত্রুটির কারণে একটি ইউনিট বন্ধ রয়েছে। এরপরও কিছুটা ঘাটতি থাকায় লোডশেডিং করতে হচ্ছে। অত্যন্ত ব্যয়বহুল বলে তেলচালিত কেন্দ্র থেকে বাড়তি উৎপাদন করা যাচ্ছে না। অধিকাংশ ম্যাচ হচ্ছে রাত ১১টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত। এ সময় রাত জেগে খেলা দেখার কারণে বিদ্যুতের ব্যবহার বেশি হচ্ছে। কিন্তু ওই সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমানো হয়। এতে ঘাটতি বেড়ে যাওয়ায় বাড়তি লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
আরইবি সূত্র জানায়, গত শুক্রবার ভোররাত চারটায় শেরপুরে ৫৬ শতাংশ লোডশেডিং করতে হয়েছে। ৬২ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে তারা সরবরাহ পেয়েছে মাত্র ২৭ মেগাওয়াট। বাগেরহাটে পল্লী বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ৭০ মেগাওয়াট, সরবরাহ পেয়েছে ৪১ মেগাওয়াট। বেলা ১টায় সিলেট পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির (পবিস-১) চাহিদা ছিল ৭২ মেগাওয়াট। যদিও সমিতিটি পেয়েছে ৩৮ মেগাওয়াট। নোয়াখালী, জামালপুর, শেরপুর ও টাঙ্গাইল, নাটোর. জয়পুরহাট, রংপুর-লালমনির হাট, কুড়িগ্রাম-ঢাকা জেলার সাভার এলাকা উচ্চ হারে লোডশেডিংয়ের তথ্য পাওয়া গেছে। পিডিবির দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানান, প্রচ- গরমের বাড়তি চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। তেলচালিত কেন্দ্র চালানো হচ্ছে না। এগুলো বেশি হারে চালালে খরচ বেড়ে যাবে। কয়লা থেকে উৎপাদন বাড়ানো হচ্ছে। চাইলেও গ্যাস থেকে বাড়ানো যাবে না। কারণ, গ্যাসের সরবরাহ কমছে নিয়মিত। তাই পরিকল্পনা করেই নিয়ন্ত্রিত লোডশেডিং করা হচ্ছে। গরমের সময়টা এভাবেই পার করতে হবে। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কর্মকর্তারা বলছেন, গ্রামগুলোতে লোডশেডিং পরিস্থিতি ভয়াবহ। গ্রাহকদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। নিয়মিত ফোন করে অসন্তুষ্টির কথা জানাচ্ছে। গ্রাহকদের বুঝিয়ে পরিস্থিতি মানানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে। চাপ বাড়ছে। আগে মধ্যরাতের পর চাহিদা কমে যেত তিন হাজার মেগাওয়াটের মতো। এখন কমছে এক হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি।
এদিকে চলছে বিশ্বকাপ ফুটবল। লোডশেডিংয়ের কারণে ঠিক মতো মানুষ খেলা দেখতে পারছেন না। ফুটবলপ্রেমিক মানুষ লোডশেডিংয়ের কারণে বিক্ষুব্ধ হচ্ছে। জেলায় জেলায় বিক্ষোভ মিছিল হচ্ছে। অসহনীয় লোডশেডিং ও বিদ্যুৎ বিভাগের অনিয়মের অভিযোগে টাঙ্গাইল, ঝালকাঠি ও ঢাকার দোহারে মানববন্ধন, মহাসড়ক অবরোধ ও বিদ্যুৎ কার্যালয় ঘেরাও করে বিক্ষোভ করেছেন স্থানীয়রা। লোডশেডিংয়ে বিশ্বকাপ খেলা দেখতে না পেরে নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় বিদ্যুৎ কার্যালয়ে হামলা হয়েছে। শেরপুরে বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা চলাকালে লোডশেডিং হওয়ায় বিভিন্ন এলাকা থেকে বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তাদের হুমকি দেয়ার অভিযোগ রয়েছে। এ জন্য নিরাপত্তা চেয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে চিঠি দিয়েছেন পল্লী বিদ্যুৎ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। সিলেটের কোম্পানীগঞ্জে একটি বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রে প্রবেশ করে সংযোগ বন্ধ করে দিয়েছেন বিক্ষুব্ধরা।
সঙ্কটেও বিদ্যুৎ খাচ্ছে ব্যাটারি রিকশা : সাধারণ গ্রাহকরা নিয়মিত বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করেও বিদ্যুৎ পাচ্ছে না। অথচ অবৈধ সংযোগ থেকে ঠিকই রিচার্জ হচ্ছে ব্যাটারি রিকশা। বিদ্যুৎ মন্ত্রী সংসদে স্বীকার করেছেন, অন্তত ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন থেকে বেরিয়ে গেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, বিদ্যুৎ বেরিয়ে গেলো কোথায় ?
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা ‘ সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ’ (সিপিডি)র গবেষণা মতে, দেশে অবৈধভাবে চলাচলকারি ব্যাটারিচালিত রিকশা ও অটো রিকশা চার্জ করতে প্রতিদিন জাতীয় গ্রিড থেকে প্রায় ১ হাজার মেগাওয়াট টেনে নিচ্ছে। যা উৎপাদিত বিদ্যুতের ৬ শতাংশ বেশি। ব্যাটারি রিকশা ছেয়ে যাচ্ছে সারাদেশ। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভাগীয় শহরগুলোতে নতুন এক আপদ হয়ে দাঁড়িয়েছে ব্যাটারি রিকশা। একটি ব্যাটারি রিকশা শুধু ৬টি প্যাডেল রিকশাচালকের জীবীকাই নষ্ট করছে না। রাস্তাঘাট অচল করে দিচ্ছে। পথে মানুষের চলার গতি কমিয়ে দিচ্ছে। রাস্তার মুখে, টার্নিং পয়েন্টে জ্যাম সৃষ্টি থেকে শুরু করে ঘাটচ্ছে ভয়াবহ দুর্ঘটনা। উপরন্তু একটি ব্যাটারি রিকশা দিনে গড়ে ৬ থেকে ৯ ইউনিট বিদ্যুৎ টানছে। দেশে যদি এখন ৬০ লাখ ব্যাটারি রিকশা থাকে, তাহলে প্রতিদিন ২৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ টেনে নিচ্ছে। সিপিডি জানাচ্ছে, দেশে ৪৮ হাজার ১৩৬টি অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট ও হাজার হাজার গ্যারেজ গড়ে উঠেছে। এসব গ্যারেজে সরাসরি বিদ্যুতের খুুটি থেকে ‘হুকিং’ করে, কখনো বা আবাসিক মিটার ব্যবহার করে ব্যাটারি চার্জ করা হচ্ছে। সাধারণত: রাতে (অফ-পিকা আওয়ার) লাখ লাখ ব্যাটারি রিকশা একযোগে চার্জে বসানো হয়। এই ‘ গোপন লোড’ বা চুরি হওয়া বিদ্যুতের চাপ সামলাতে ট্রান্সফর্মারগুলো দুর্বল হয়ে পড়েছে। এ কারণে লোডশেডিং ও ভোল্টেজ আপ-ডাউন হচ্ছে। নিয়মিত বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না পেলেও ব্যাটারি রিকশাগুলো বিদ্যুৎ চুরি করছে ঠিকই। ব্যাটারি রিকশার বিদ্যুৎ চরির ফলে বছরে ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার।
গ্রীষ্ম শুরুর পর কেন পাল্লা দিয়ে লোডশেডিং বাড়ছে ? এ প্রশ্নের কিছু গৎবাঁধা জবাব রয়েছে বিদ্যুৎ মন্ত্রীর কাছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে অস্থিরতা, ডলার সঙ্কট, কয়রা ও এলএনজি আমদানি বিঘœ,আকস্মিক কারিগরি ত্রুটি, হঠাৎ বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যাওয়া-ইত্যাদি। কিন্তু বিশ্ব পরিস্থিতি অভিন্ন হওয়া সত্ত্বেও পাকিস্তান-ভারতসহ এশিয়ার অন্যদেশগুলোতে কেন লোডশেডিং নেই-এ প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই। যুদ্ধ পরিস্থিতি ক্রমে স্বাভাবিক হয়ে আসছে। বিশ্ববাজারে তেলের দামও পড়ছে। উন্মুক্ত ও বিকল্প উৎস থেকে আনা হচ্ছে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জ্বালানি। তবুও কেন উৎপাদন কমলো-উত্তর নেই এ প্রশ্নেরও।
সারাদেশের লোডশেডিং ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে পৃথক প্রতিবেদন পাঠিয়েছেন ইনকিলাব প্রতিনিধিগণ।
চট্টগ্রামে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং, তীব্র পানি সঙ্কট
চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, অব্যাহত লোডশেডিংয়ে চট্টগ্রামের জনজীবন মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। মধ্য আষাঢ়ের ভ্যাপসা গরমে হাটসফাঁস অবস্থার মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিংয়ে দুর্বিষহ যন্ত্রণা পোহাতে হচ্ছে নগরবাসীকে। জুলাইয়ের শুরুতে স্কুলে সাময়িক পরীক্ষা ও এইচএসসি পরীক্ষা থাকলেও বিদ্যুতের অভাবে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি বিঘিœত হচ্ছে। কলকারখানায় উৎপাদনের চাকা স্থবির এবং বিদ্যুৎ সংকটে চট্টগ্রাম ওয়াসার পানি পরিশোধন ও বিতরণ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় নগরীতে পানি সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। বিকল্প জেনারেটর চালাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন কারখানা মালিকেরা, ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য লাটে ওঠার উপক্রম হয়েছে। ফ্ল্যাঁবাড়িতে পানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে।
চট্টগ্রামে চাহিদার চেয়ে বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন হলেও জাতীয় গ্রিডের চাহিদা মোটতে এখানে লোডশেডিং চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। পিডিবির রেকর্ড অনুযায়ী, ২৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ৯টি বন্ধ থাকায় চট্টগ্রামের ১ হাজার৪০১ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ১ হাজার ৩৩০ মেগাওয়াট সরবরাহ মিলেছে, যা সরকারি হিসাবে ৭০ মেগাওয়াট ঘাটতি হলেও বাস্তবে লোডশেডিং আরও বেশি।
পিডিবির কর্মকর্তারা জানান, গ্যাস ও ডিজেলের অভাবে এবং কাপ্তাই হ্রদের পানির স্তর নিচে নামায় উৎপাদন কমেছে। পিডিবির কর্মকর্তারা বলেন, জ্বালানি সঙ্কটের কারণে কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র সীমিত আকারে চালানো হচ্ছে। উৎপাদন ও সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এই সঙ্কট পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব নয়।
তীব্র তাপপ্রবাহ ও লোডশেডিংয়ে পুড়ছে রাজশাহী
রাজশাহী ব্যুরো জানায়, আষাঢ়ের মাঝামাঝিও বৃষ্টির দেখা নেই রাজশাহী অঞ্চলে, বরং ৩৫ থেকে ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মাঝারি তাপপ্রবাহে পুড়ছে মানুষ ও প্রকৃতি। এর সঙ্গে ‘গোদের ওপর বিষফোড়া’ হয়ে দাঁড়িয়েছে তীব্র লোডশেডিং। শহরে একবার বিদ্যুৎ গেলে দুই ঘণ্টার আগে আসে না, আর গ্রামের অবস্থা আরও শোচনীয়। তীব্র গরমে ঘরে ঘরে জ্বর, সর্দি, কাশির মতো রোগবালাই ছড়িয়ে পড়ছে। মানুষ রাতে ঘুমাতে পারছে না। অতিরিক্ত লোডশেডিংয়ে আইপিএস বা জেনারেটরও অকেজো হয়ে পড়েছে। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, তাদের ব্যবসা লাটে ওঠার উপক্রম হয়েছে। চার্জের অভাবে ইজিবাইক ও ব্যাটারিচালিত রিকশা ঠিকমতো চলতে পারছে না, ফলে গণপরিবহন সংকট দেখা দিয়েছে। বিদ্যালয়গুলোর অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা এবং আগামী সপ্তাহের এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা পড়াশোনা করতে পারছে না। ব্যাহত হচ্ছে বোরো ও আমন চাষের সেচ কার্যক্রম। তানোরের বাসিন্দা তপন রহমান বলেন, ২৪ ঘণ্টায় কতবার বিদ্যুৎ যায় হিসাব নেই। গরমে রাতে ঘুমাতে পারি না, দিনের কাজেও এর প্রভাব পড়ছে। অটোরিকশাচালক সবুর জানান, রাতে ৬-৭ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় ব্যাটারি চার্জ হয় না, ফলে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
নেসকোর নির্বাহী পরিচালক মো. মোখলেসুর রহমান ইনকিলাবকে জানান, রাজশাহী জোনে দৈনিক ১ হাজার ৮৮২ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে বরাদ্দ অনেক কম। রাজশাহী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার রমেন্দ্র চন্দ্র রায় বলেন, জেলায় চাহিদার তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ কম বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে। বাধ্য হয়েই এলাকাভিত্তিক লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
বগুড়ায় লোডশেডিংয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত, ২৪ ঘণ্টায় ২০ মেগাওয়াট ঘাটতি
বগুড়া ব্যুরো জানায়, চলতি বর্ষা মৌসুমে বগুড়ায় লোডশেডিং পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও সার্বিকভাবে নাগরিক জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বিদ্যুতের ঘনঘন আসা-যাওয়ার খেলায় মানুষের ভোগান্তির শেষ নেই। অফিস-আদালত, কলকারখানা, স্কুল-কলেজ, মাদরাসা ও হাসপাতালে স্বাভাবিক কাজকর্ম পরিচালনা করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। সংকট মোকাবিলায় মানুষ আইপিএস, ইউপিএস ও জেনারেটর ব্যবহার করেও কোনো কুলকিনারা পাচ্ছে না। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় আইপিএস ঠিকমতো চার্জ হতে পারছে না। ব্যবসায়ীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিদ্যুৎ খাতে উন্নতির আশা থাকলেও বাস্তবে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে, যা কলকারখানার উৎপাদন ব্যাহত করছে। এদিকে আসন্ন এসএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া ছাত্র-ছাত্রীরা চরম বেকায়দায় পড়েছেন। শহরের মধ্য ও উচ্চবিত্ত পরিবারের পরীক্ষার্থীরা চার্জার ফ্যান বা লাইট ব্যবহার করে পরিস্থিতি সামাল দিলেও গ্রামের গরিব ও নি¤œবিত্ত শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে। বিদ্যুতের কারণে এবার বহু শিক্ষার্থীর ফলাফল খারাপ হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিদ্যুৎ বিভাগ অবশ্য সংকট চরম আকার ধারণ করার কথা মানতে নারাজ। তাদের দাবি, লোডশেডিং আগের মতোই আছে, নতুন করে অবনতি হয়নি।
বগুড়া নেসকোর সুপারিন্টেন্ডেন্ট এমদাদুল হক ইনকিলাবকে জানান, বগুড়ায় বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি আগের চেয়ে কিছুটা উন্নত হয়েছে। বর্তমানে জেলায় ৯০ থেকে ১২০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে। তবে গড়ে প্রতিদিন প্রায় ২০ মেগাওয়াটের মতো ঘাটতি থাকছে। তিনি বলেন, সরকার বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতি নিয়ে কাজ করছে। আশা করা যায়, আগামীতে এই পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি হবে।
দিনাজপুরে লোডশেডিংয়ের প্রভাব চালের বাজারে, অটোরাইস মিল বন্ধের উপক্রম
দিনাজপুর ব্যুরো জানায়, সারাদেশের মতো দিনাজপুরেও অব্যাহত লোডশেডিংয়ে নাকাল অবস্থা সাধারণ মানুষের। গ্রামাঞ্চলে পল্লী বিদ্যুতের আওতাভুক্ত এলাকায় ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ লোডশেডিং দেওয়া হচ্ছে। প্রচ- গরমের নাভিশ্বাসের মধ্যে যোগ হয়েছে ভরা ইরি-বোরো মৌসুমে অটো ও রাইস মিলগুলো সচল রাখার সঙ্কট। বিদ্যুতের অভাবে মিলগুলো দিনে ৫ ঘণ্টাও চালু রাখা যাচ্ছে না। ড্রায়ারে ধান দেওয়ার পর বিদ্যুৎ চলে গেলে চাল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় মিল মালিকেরা ধান প্রক্রিয়াজাত করতে ভয় পাচ্ছেন। ফলে ভরা মৌসুমে বাজারে ধানের দাম কম থাকলেও চালের দাম বেড়েই চলেছে। মাঠে সেচ নির্ভর ফসল না থাকায় কৃষকদের হাহাকার না থাকলেও ক্ষুদ্র শিল্পমালিকদের আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে গেছে এবং কারখানাগুলো বন্ধের উপক্রম হয়েছে। দেশের একমাত্র নিজস্ব জ্বালানি চালিত বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রটির বেহাল দশার কারণে ৫২৫ মেগাওয়াটের জায়গায় মাত্র ৪০ থেকে ৪৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে। ওভারহোলিংয়ের পরও ৩য় ইউনিটটি পুরোপুরি চালু রাখা সম্ভব হচ্ছে না।
দিনাজপুর নেসকো ও পল্লী বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, গরমের কারণে বিদ্যুতের চাহিদা ব্যাপক বেড়েছে, কিন্তু জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ কম পাওয়ায় লোডশেডিং করতে হচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে নির্ধারিত জোন অনুযায়ী বিদ্যুৎ বণ্টন করা হচ্ছে।
খুলনায় স্থবির জনজীবন, ফ্রিজের খাবার নষ্টের শঙ্কা
খুলনা ব্যুরো জানায়, তীব্র দাবদাহের মধ্যেই খুলনা মহানগরী ও আশপাশের এলাকায় আকস্মিক এবং দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ বিভ্রাটে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। দিন-রাত ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের কারণে জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। প্রচ- গরমে শিশু ও বয়স্করা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন। ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, কৃষি সেচ এবং স্বাভাবিক কর্মজীবন। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় আইপিএস ও চার্জার ফ্যানও কাজ করছে না। বাসাবাড়ির ফ্রিজে সংরক্ষিত খাদ্যসামগ্রী নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অনলাইনভিত্তিক কর্মজীবী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
ওজোপাডিকো সূত্রে জানা গেছে, খুলনা ও বরিশালের ২১ জেলায় রাতে ৭৭৩ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল ৬৭৩ মেগাওয়াট। ফলে ১০০ মেগাওয়াটের ঘাটতি তৈরি হয়, যার মধ্যে শুধু খুলনা অঞ্চলেই ঘাটতি ছিল ৭১ মেগাওয়াট। খুলনা মহানগরী ও জেলাতেই সর্বোচ্চ ৩৬ মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে হয়েছে। দুপুরে ৮১২ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ঘাটতি ছিল ৬৮ মেগাওয়াট, যার পুরোাঁ খুলনায় সমন্বয় করা হয়।
খুলনা অফিস গ্রিড সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. আরিফুর রহমান বলেন, চাহিদার তুলনায় জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ কম পাওয়া যাচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে নির্ধারিতভাবে কিছু এলাকায় লোডশেডিং করতে হচ্ছে। সরবরাহ স্বাভাবিক হলে লোডশেডিং কমে আসবে।
ময়মনসিংহে জিম্মি লাখো মানুষ
ময়মনসিংহ ব্যুরো জানায়, দাবদাহের মধ্যে দিন-রাতজুড়ে ঘন ঘন লোডশেডিং ময়মনসিংহবাসীর দুর্ভোগকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। কোথাও আধা ঘণ্টা, কোথাও পাঁচ-দশ মিনিট পরপর বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হচ্ছে। নির্ধারিত সময়সূচি না থাকায় অনিশ্চয়তায় কাঁছে লাখো মানুষের জীবন। শিশুদের ঘুম, প্রবীণদের স্বস্তি ও শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা লোডশেডিংয়ের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। প্রিন্টিং প্রেস, ফটোকপি সেন্টার ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠান পড়েছে বিপাকে। শিল্পসমৃদ্ধ ভালুকায় দিনের পাশাপাশি রাতেও দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং পরিচালন ব্যয় বাড়ছে। নওমহলের আসিফ হোসেন বলেন, “রাতে কয়েক মিনিট পরপর বিদ্যুৎ চলে যায়, শিশুদের নিয়ে খুব কষ্টে আছি। বিদ্যুৎ বিভাগ জানায়, জ্বালানির অভাবে বিআর পাওয়ার জেন ও আরপিসিএল বন্ধ থাকায় ৪৯ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ মাত্র ৩৬ মেগাওয়াট। গ্যাসের সঙ্কট ও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানি সরবরাহে চাপ তৈরি হওয়ায় ময়মনসিংহ পাওয়ার স্টেশন থেকে মাত্র ১৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর আওতায় ২৯০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ২১০ মেগাওয়াট।
ভালুকা কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল মজিদ ইনকিলাবকে জানান, ২০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে পাচ্ছি ১২ মেগাওয়াট, তাই লোডশেডিং ছাড়া বিকল্প নেই। আরপিসিএল-এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আব্দুল হান্নানকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি অসৌজন্যমূলক আচরণ করে ফোন কেটে দেন।
সিলেটে অন্ধকারে হাহাকার, বিপর্যস্ত অনলাইন ব্যবসা ও শিক্ষা
সিলেট ব্যুরো জানায়, সিলেট নগরী ও গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎহীন অন্ধকার আর ভ্যাপসা গরমে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। দিনের বেলা বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ার মধ্যে থাকলেও রাতে তৈরি হচ্ছে সীমাহীন দুর্ভোগ। ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে বাসাবাড়ি, দোকানপাঁ, ছোঁ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও অফিসের কাজে চরম বিঘœ ঘটছে। বিশেষ করে অনলাইনে কাজ করা ফ্রিল্যান্সার এবং শিক্ষার্থীরা চরম সংকটে পড়েছেন। গ্রামীণ মানুষের অভিযোগ, বিদ্যুৎ কখন আসবে আর যাবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই, যেন কোনো অবুঝ শিশু বিদ্যুতের সুইচ নিয়ে কানামাছি খেলছে। নাগরিক সমাজ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছেন, রাজনৈতিক নেতারা জনগণের এই মানসিক কষ্ট ও বাস্তব ভোগান্তির পাশে এসে দাঁড়াচ্ছেন না।
সিলেট বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) জানিয়েছে, বৈশ্বিক জ্বালানি সঙ্কটের কারণে চাহিদার তুলনায় জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ কম থাকায় গত ৩-৪ দিন ধরে এই চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। সিলেট বিভাগে মোট বিদ্যুতের প্রয়োজন ২৪৪ মেগাওয়াট, কিন্তু সরবরাহ পাওয়া গেছে মাত্র ১৯৩ মেগাওয়াট। ফলে ৫১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
সিলেটের বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের প্রধান প্রকৌশলী ইমাম হোসেন জানান, পরিস্থিতির উন্নতি পুরোপুরি বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর নির্ভর করছে। উৎপাদন বাড়লে সরবরাহও স্বাভাবিক হবে। তবে ঠিক কবে পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
কুষ্টিয়ায় লোডশেডিংয়ে চালের মোকাম খাজানগরে ধস
বিশেষ সংবাদদাতা, কুষ্টিয়া থেকে জানান, কুষ্টিয়া জেলাজুড়ে তীব্র তাপপ্রবাহের মাঝে চরম আকার ধারণ করেছে বিদ্যুৎ সংকট। কাগজে-কলমে লোডশেডিংয়ের সময়সূচি থাকলেও বাস্তবে তা মোটেও কার্যকর হচ্ছে না। কুষ্টিয়ার ৬টি উপজেলাতেই একই চিত্র। এই নজিরবিহীন সংকটে দেশের বৃহত্তম চালকল জোন খাজানগরের অটো রাইস মিলসহ স্থানীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা-বাণিজ্যে ধস নামার উপক্রম হয়েছে। শহরের ভেড়ামারার বাসিন্দা আরিফুল, সদরের বাবলু ও চাপড়া ইউনিয়নের রেজাউল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, এলাকাভিত্তিক ঘোষিত সময়সূচির বাইরেও দিন-রাত দফায় দফায় লোডশেডিং হচ্ছে। বিদ্যুৎ এলে মাত্র ১০-১৫ মিনিট স্থায়ী হয়ে আবার চলে যায়। সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক ধাক্কা লেগেছে খাজানগরের চালের মোকামে। মিল মালিকেরা জানান, চাল তৈরির প্রক্রিয়ায় একবারে ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ মণ ধান সেদ্ধ করার সময় হুট করে বিদ্যুৎ চলে গেলে ধানের মান নষ্ট হয়ে চাল ভেঙে খুদ হয়ে যায়। ব্যাকআপ জেনারেটর চালাতে গিয়ে জ্বালানি তেলের চড়া দামের কারণে উৎপাদন ব্যয় আকাশচুম্বী হচ্ছে। কাাঁইখানা মোড়ের কম্পিউটার ও ফটোস্ট্যাট ব্যবসায়ীরাও কাস্টমার ফেরত দিতে বাধ্য হচ্ছেন। কুষ্টিয়া পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার প্রকৌশলী মো. ইসমাত কামাল জানান, ১৮৫ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে জাতীয় গ্রিড থেকে মাত্র ১১৩ থেকে ১৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাচ্ছেন। ওজোপাডিকোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আমজাদ হোসেন জানান, শহর এলাকায় ৭৩ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ৪৫-৫০ মেগাওয়াট মেলায় দৈনিক ৩-৪ বার লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
বরিশালে মুখ থুবড়ে পড়েছে শিল্প ও নাগরিক সেবা
বরিশাল ব্যুরো জানায়, গত প্রায় মাসখানেক ধরে লাগাতার বিদ্যুৎ ঘাটতিতে বরিশাল মহানগরীসহ সমগ্র দক্ষিণাঞ্চলের আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থায় চরম বিপর্যয় নেমে এসেছে। এ অঞ্চলের প্রায় ৮ লাখ গ্রাহকের সাড়ে ৮শ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ৩৫-৪০ শতাংশ পর্যন্ত বিদ্যুৎ ঘাটতি থাকায় চিকিৎসা সেবা, জরুরি পানি সরবরাহসহ ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প উৎপাদন মুখ থুবড়ে পড়েছে। বরিশাল মহানগরীতে চাহিদার ৫০ ভাগের বেশি পানি সরবরাহ সম্ভব হচ্ছে না কেবল বিদ্যুৎ ঘাটতির কারণেই। অথচ বরিশাল অঞ্চলে উৎপাদিত ৩ হাজার মেগাওয়াটেরও বেশি বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হলেও এ অঞ্চল ৫শ মেগাওয়াট বিদ্যুৎও পাচ্ছে না। এর ফলে সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত লাগাতার লোডশেডিংয়ে নাকাল হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। আসন্ন এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের পড়াশোনা ব্যাহত হওয়ায় অভিভাবক মহলে উদ্বেগ বাড়ছে। বিদ্যুৎ সংকটে হাসপাতালের বেডে সংকটাপন্ন রোগীর জীবন ওষ্ঠাগত, স্ট্যান্ডবাই জেনারেটর না থাকায় জরুরি অস্ত্রোপচারের সিডিউল রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না। খোদ বরিশাল মহানগরী ও ঝালকাঠি জেলা সদরে ২শ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ১২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎও মিলছে না। বিদ্যুৎ সংকটে বরিশালের ৫টি ওষুধ শিল্প প্রতিষ্ঠান, একাধিক টেক্সটাইল ও জুট মিল বন্ধের পথে। ‘৫-আর’ ও ‘সোনারগাঁও’ টেক্সটাইল বন্ধের পর দিন দশেক আগে এ অঞ্চলের একমাত্র সিমেন্ট ফ্যাক্টরিটিও বন্ধ হয়ে গেছে। ওজোপাডিকো ও পল্লী বিদ্যুতের দায়িত্বশীল মহল জানিয়েছে, পরিস্থিতি উত্তরণের তাৎক্ষণিক কোনো ‘যাদুরকাঠি’ তাদের কাছে নেই।
কক্সবাজারে তীব্র লোডশেডিংয়ে পর্যটন খাতে ব্যাপক আর্থিক লোকসান
কক্সবাজার ব্যুরো জানায়, দেশের প্রধান পর্যটন নগরী কক্সবাজারে অসহনীয় বিদ্যুৎ সংকট ও ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে জনজীবন ও পর্যটন শিল্প চরম ক্ষতির মুখে পড়েছে। জ্বালানি ঘাটতি এবং সাবস্টেশনের কারিগরি ত্রুটির কারণে উচ্চক্ষমতার ট্রান্সফরমারে সমস্যা দেখা দেওয়ায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ঈদুল আজহার ছুটিতে পর্যটকে মুখর কলাতলী, সুগন্ধা ও সৈকতসংলগ্ন এলাকায় দিনে-রাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় অতিথিরা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে বিভিন্ন হোটেলের লিফটে পর্যটক আঁকে পড়ার ঘটনাও ঘটছে।
নারায়ণগঞ্জ থেকে আসা পর্যটক মো. ইব্রাহিম জানান, হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় তার পরিবার হোটেলের লিফটে ২০ মিনিট আঁকে থেকে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। ঢাকার পর্যটক ফায়াজ জানান, ২৪ ঘণ্টায় ১০-১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় অনেকে অসুস্থ হয়ে নির্ধারিত সময়ের আগেই ফিরে যাচ্ছেন। হোটেল সি ক্রাউনের ব্যবস্থাপক সাজ্জাদ হোসেন বলেন, পর্যটকদের নিরবচ্ছিন্ন সেবা দিতে না পেরে আমরা বিব্রত। জেনারেটর চালানোয় জ্বালানি ব্যয় কয়েক গুণ বেড়েছে। হোটেল প্রাসাদ প্যারাডাইসের মহাব্যবস্থাপক মো. ইয়াকুব আলী বলেন, প্রতিদিন শুধু ডিজেলের পেছনেই ২৫-৩০ হাজার টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে। কলাতলী-মেরিন ড্রাইভ হোটেল রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান ও হোটেল-মোটেল মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার জানান, টানা ৮-৯ ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের কারণে অর্জিত আয়ের বড় অংশই জ্বালানি ব্যয়ে চলে যাচ্ছে, যা পর্যটন শিল্পের জন্য মারাত্মক উদ্বেগজনক।
লক্ষ্মীপুরে ৬ লাখ গ্রাহকের দুর্ভোগ
স্টাফ রিপোর্টার, লক্ষ্মীপুর থেকে জানান, লক্ষ্মীপুরে ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের শিকার হয়ে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির প্রায় ছয় লাখ গ্রাহক। দিনে-রাতে মিলিয়ে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টার মতো বিদ্যুৎহীন থাকতে হচ্ছে গ্রামীণ জনপদের গ্রাহকদের। তবে জেলা শহরে বিপিডিবির গ্রাহকদের দিনে-রাতে ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
চন্দ্রগঞ্জ উপজেলার কুশাখালী এলাকার বাসিন্দা ফয়সাল মাহমুদ জানান, গতকাল সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত অন্তত ১০ বার লোডশেডিংয়ের কবলে পড়েছেন তিনি, গভীর রাতেও বিদ্যুৎ থাকে না। মান্দারী ইউনিয়নের যাদৈয়া গ্রামের শারমিন আক্তার বলেন, রাতের বেশিরভাগ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় চরম গরমে বৃদ্ধ ও শিশুদের নিয়ে সীমাহীন কষ্ট পেতে হচ্ছে। রায়পুর পৌর শহরের বাসিন্দা ওয়াহিদুর রহমান মুরাদ জানান, রায়পুর উপজেলা এবং পৌরসভাতে দিনে-রাতে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা লোডশেডিং দেওয়া হচ্ছে। পৌরসভার বিপিডিবি গ্রাহক জান্নাতুল নাঈম জানান, গভীর রাতে দেড় থেকে দু’ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় ঘুমানো অসম্ভব হয়ে পড়ে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড লক্ষ্মীপুর কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী নুরুল ইসলাম জানান, পৌরসভাতে ৪৫ হাজার গ্রাহকের বিপরীতে বিদ্যুতের চাহিদা ১৮ মেগাওয়াট হলেও তারা পাচ্ছেন ১৫ থেকে ১৬ মেগাওয়াট। এই সামান্য ঘাটতির কারণে শহরেও লোডশেডিং করতে হচ্ছে। এদিকে ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের কবলে থাকা লক্ষ্মীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জরুরি মিটিংয়ে ব্যস্ত থাকায় তাদের কোনো বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
সাভার-আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে পোশাক কারখানার উৎপাদন ব্যাহত
স্টাফ রিপোর্টার, সাভার থেকে জানান, সাভার ও আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলজুড়ে এখন বিদ্যুতের ভয়াবহ লোডশেডিং চলছে। দিন-রাত মিলিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় এ অঞ্চলের জনজীবন পুরোপুরি অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রায় ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না, কোনো কোনো এলাকায় টানা ৩ ঘণ্টাও বিদ্যুৎ গায়েব থাকে। তীব্র তাপদাহের মধ্যে এই লোডশেডিংয়ের কারণে বৃদ্ধ ও শিশুরা অসুস্থ হয়ে পড়ছে। সাভার-আশুলিয়া দেশের অন্যতম প্রধান পোশাক শিল্পাঞ্চল হওয়ায় তৈরি পোশাক কারখানাগুলো বিদ্যুৎ সংকটে সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত। বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর জেনারেটর দিয়ে কারখানা সচল রাখতে গিয়ে জ্বালানি খরচ কয়েক গুণ বেশি গুনতে হচ্ছে শিল্প মালিকদের। জেনারেটর দিয়ে পূর্ণ ক্ষমতায় মেশিন চালানো সম্ভব না হওয়ায় সময়মতো পণ্য রফতানি করা নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন মালিকপক্ষ। কারখানার ভেতরে প্রচ- গরমে কাজ করতে গিয়ে শ্রমিকেরা দ্রুত ক্লান্ত ও অসুস্থ হয়ে পড়ছেন, যা উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দিচ্ছে। সামনে এইচএসসি পরীক্ষা থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছে শিক্ষার্থীরা। সাভার এলাকার এক পরীক্ষার্থী জানায়, পড়ার টেবিলে বসলেই বিদ্যুৎ চলে যায়, গরমে আর মোমের আলোয় পড়াশোনা করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। আইপিএস-ও এত সময় ব্যাকআপ দিতে পারছে না। স্থানীয় পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির (পবিস) কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কেউ ফোন রিসিভ করেননি। সচেতন নাগরিক ও ব্যবসায়ীরা পরীক্ষা ও অর্থনৈতিক চাকা সচল রাখতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ দাবি করেছেন।
কুমিল্লায় ভয়াবহ বিদ্যুৎ বিপর্যয়, স্থবির জনজীবন ও কৃষিখাত
স্টাফ রিপোর্টার, কুমিল্লা থেকে জানান, তীব্র গরমের সাথে পাল্লা দিয়ে কুমিল্লা জেলা জুড়ে শুরু হয়েছে ভয়াবহ বিদ্যুৎ বিপর্যয়। দিনে ও রাতে অতিরিক্ত লোডশেডিংয়ের কারণে জেলার সর্বস্তরের মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা অনেকটাই স্থবির হয়ে পড়েছে। কুমিল্লার শহর ও গ্রাম সবখানেই চলছে বিদ্যুতের লুকোচুরি। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় প্রচ- গরমে মানুষ অতিষ্ঠ, ব্যাহত হচ্ছে কৃষিজমিতে সেচ কাজ এবং বিসিক শিল্পনগরীর কলকারখানা ও ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের চাকা। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা চলমান পরীক্ষার এই সময়ে পড়াশোনায় চরম বিঘœ পোহাচ্ছে। চার্জের অভাবে তারা অনলাইন অ্যাসাইনমেন্ট করতে পারছে না। গৃহিণীদের রান্নাবান্নাসহ দৈনন্দিন কাজ অসম্ভব হয়ে পড়েছে, ফ্রিজের মাছে গন্ধ ছড়াচ্ছে। এমনকি লোডশেডিংয়ের কারণে টিভি নষ্ট হওয়ার ভয়ে অনেকে বিশ্বকাপ ফুটবল খেলাও দেখতে পারছেন না। কম্পিউটার কম্পোজ ও ফটোকপি ব্যবসায়ীরা সময়মতো গ্রাহকদের কাজ দিতে পারছেন না। বিসিকের এক কারখানা মালিক জানান, তেলের সঙ্কটে জেনারেটরও চালানো যাচ্ছে না, ফলে যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে লোকসান বাড়ছে। কুমিল্লা পল্লী বিদ্যুতের জোনাল অফিসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, স্থানীয় চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় এই ঘাটতি সমন্বয় করতে হচ্ছে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) কুমিল্লা অঞ্চলের এক কর্মকর্তা বলেন, তীব্র গরমে বিদ্যুতের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে গেছে। সংসদে বিদ্যুৎমন্ত্রী লোডশেডিংয়ের কারণ ব্যাখ্যা দিয়েছেন। জাতীয় গ্রিডে উৎপাদন বৃদ্ধির চেষ্টা চলছে, আশা করা যাচ্ছে দ্রুতই পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
ফেনীতে ২৪ ঘণ্টায় ১০ ঘণ্টা লোডশেডিং
ফেনী জেলা সংবাদদাতা জানান, লোডশেডিংয়ে নাকাল ফেনীর গ্রামীণ জনজীবন। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত গ্রামগুলোতে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। তীব্র গরমে নারী, শিশু ও বৃদ্ধরা সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। এর ওপর যোগ হয়েছে অস্বাভাবিক ও ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিল। গ্রাহকদের অভিযোগ, বিদ্যুৎ না পেলেও বিল আসছে দ্বিগুণ-তিনগুণ। ফতেহপুরের সোনিয়া, বালিগাঁওয়ের পেয়ারা বেগম ও উত্তর গোবিন্দপুরের ছবুরা বেগম জানান, আগে যেখানে বিল আসত ৫০০ টাকা, এখন তা ২ হাজার টাকা ছাড়িয়েছে। ভুতুড়ে বিলের ভয়ে ফ্যান-লাইট হিসেব করে চালিয়েও বিলের পাহাড় দেখতে হচ্ছে। ফেনী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার মুহাম্মদ নুরুল হোসাইন ইনকিলাবকে জানান, জেলায় সাড়ে চার লাখ গ্রাহকের বিপরীতে পিক আওয়ারে বিদ্যুতের চাহিদা ১০৫ মেগাওয়াট। কিন্তু জাতীয় গ্রিড থেকে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৮০ মেগাওয়াট। গ্রাহকদের অভিযোগের জবাবে জিএম বলেন, ফেনীতে কিছু লোক আছে, যারা ১ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকলে ৩ ঘণ্টা বানিয়ে বলে। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কিছুটা কম। বৃষ্টি হলে এ সমস্যার সমাধান হবে। ভুতুড়ে বিলের বিষয়ে তিনি দাবি করেন, মিটারের রিডিং মিলিয়ে দেখলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বিল সঠিক ও নির্ভুল পাওয়া যায়।
চাঁপাইনবাবগঞ্জে বিদ্যুতের দাবিতে মহাসড়ক অবরোধের হুঁশিয়ারি
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা সংবাদদাতা জানান, তীব্র গরমের মধ্যে গত দুই দিন ধরে ব্যাপক লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের জনজীবন। প্রয়োজনের তুলনায় অর্ধেক বিদ্যুৎ বরাদ্দ পাওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বিদ্যুৎ সঙ্কটের কারণে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা স্থবির হয়ে পড়েছে। তীব্র গরমে ঘরে টেকাই দায় হয়ে পড়েছে, পাশাপাশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানেও স্থবিরতা নেমে এসেছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় ফ্রিজের খাবার নষ্ট হচ্ছে এবং খুচরা ব্যবসায়ীরা মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
নেসকো সূত্রে জানা গেছে, চাঁপাইনবাবগঞ্জে নেসকো-১ ও নেসকো-২ এলাকায় বিদ্যুতের মোট চাহিদা প্রায় ৫০ মেগাওয়াট। তবে চাহিদার প্রায় অর্ধেক বরাদ্দ মেলায় গত দুই দিন ধরে ঘন ঘন লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে ক্ষুব্ধ স্থানীয় বাসিন্দারা আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতি না হলে বিদ্যুৎ অফিস ঘেরাও এবং সোনামসজিদ মহাসড়ক অবরোধ করার তীব্র হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ নেসকো-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাইমিনুর রহমান ইনকিলাবকে জানান, এটি শুধু চাঁপাইনবাবগঞ্জ নয়, সারা দেশের সমস্যা। তবে আজ থেকে বিদ্যুতের বরাদ্দ কিছুটা বাড়তে শুরু করেছে। বরাদ্দ বাড়লে পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করলেও ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ অবিলম্বে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান দাবি করেছেন।
ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গায় ২২ ঘণ্টা লোডশেডিংয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা ব্যাহত
ফেনী জেলা সংবাদদাতা জানান, ফরিদপুরের ৯টি উপজেলাতেই বিদ্যুতের ভয়াবহ লোডশেডিংয়ে জনজীবন কার্যত বিপর্যস্ত। স্থানীয়দের অভিযোগ, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রায় ২২ ঘণ্টাই বিদ্যুৎ থাকে না। দিন-রাত মিলিয়ে ২০ থেকে ৩০ বার বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করায় এবং তা মাত্র ৫-১০ মিনিট স্থায়ী হওয়ায় কয়েক লাখ মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। ৮ উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা আলফাডাঙ্গায়। আলফাডাঙ্গা জোনাল অফিস সূত্রে জানা গেছে, এখানে বিদ্যুতের চাহিদা ৫ দশমিক ৬৫ মেগাওয়াট, অথচ জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ করা হচ্ছে মাত্র ৩ দশমিক ৩২ মেগাওয়াট। ফলে ৪১ শতাংশ ঘাটতি নিয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে হচ্ছে। আসন্ন এইচএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি ও সেচযন্ত্র চালানো ব্যাহত হচ্ছে। পরীক্ষার্থী নাঈম মোল্যা ও ভ্যানচালক নান্নু শেখ দ্রুত নতুন সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। ব্যবসায়ী আসিফ ইকবাল প্রশ্ন তোলেন, ঢাকায় বিদ্যুৎ না গেলে আলফাডাঙ্গার মানুষ কেন এমন ভোগান্তিতে?
লোডশেডিংয়ের কারণে আলফাডাঙ্গা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে শ্বাসকষ্টের রোগীদের নেবুলাইজার ও অক্সিজেন সেবা ব্যাহত হচ্ছে। ফ্রিজে রাখা ওষুধের কার্যকারিতা ও হিমায়িত খাদ্যপণ্য নষ্ট হওয়ায় ব্যবসায়ীরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। বিশ্বকাপ ফুটবলের ম্যাচ চলাকালেও বিদ্যুৎ না থাকায় ক্ষোভ বাড়ছে। ফরিদপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির এজিএম আশিষ কুমার রায় বলেন, নড়াইল থেকে শুকুরহাটা সাব-স্টেশনে ৩৩ কেভি লাইনের টেন্ডার সম্পন্ন হয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে সংকট কমবে। সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার এস এম নাসির উদ্দিন জানান, ঘাটতির বিষয়টি জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
নোয়াখালীতে ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী নষ্টের শঙ্কা
নোয়াখালী জেলা সংবাদদাতা জানান, নোয়াখালীতে বিদ্যুতের তীব্র লোডশেডিংয়ে জনজীবন চরম বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। অতিমাত্রায় লোডশেডিংয়ের কারণে জনজীবনে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে; ঘন ঘন বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ার লুকোচুরি খেলায় নষ্ট হচ্ছে বিদ্যুৎচালিত কলকারখানার বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিক্স যন্ত্রপাতি। বিদ্যুতের এমন অনাকাঙ্খিত আচরণে আসন্ন এইচএসসি পরীক্ষার্থী এবং তাদের অভিভাবকেরা চরম ক্ষুব্ধ ও উদ্বিগ্ন। জেলা শহর ও বিভিন্ন উপজেলার কম্পিউটার ও ফটোস্ট্যাট দোকান মালিকেরা অভিযোগ করেন, অব্যাহত লোডশেডিং ও বিদ্যুৎ সরবরাহের ভোল্টেজ ওঠানামার কারণে কম্পিউটার, ল্যাপটপ, প্রিন্টার ও ফটোস্ট্যাট মেশিন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এতে অনেকে ব্যবসা গুটিয়ে ফেলার উপক্রম হয়েছেন। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও পল্লী বিদ্যুৎ বোর্ড (আরইবি) বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, জেলায় মোট চাহিদার মাত্র ৬০ শতাংশ সরবরাহ থাকায় বাকি ৪০ শতাংশ লোডশেডিং করতে হচ্ছে। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির তথ্যমতে, পুরো জেলা জুড়ে তাদের প্রায় ৮ লাখ ৩০ হাজার গ্রাহকের জন্য ১৯৮ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ মিলছে ১১০ থেকে ১২০ মেগাওয়াট। পিডিবির ১ লাখ গ্রাহকের জন্য ৩৫ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে মিলছে মাত্র ১৮ থেকে ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ।
নোয়াখালী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির (আরইবি) জেনারেল ম্যানেজার মকবুল আলম জানান, বিদ্যুতের নানা বিষয় নিয়ে মন্ত্রণালয়ের সাথে বৈঠক চলছে। তবে তিনি দাবি করেন, বর্তমানে কোনো বড় সংকট নেই এবং লোডশেডিং সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে।
মুন্সীগঞ্জে হিমাগার ও বিসিকের কারখানায় লোকসান
মুন্সীগঞ্জ জেলা সংবাদদাতা জানান, মুন্সীগঞ্জে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে বিভিন্ন শিল্প কলকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হয়ে মালিকপক্ষ লাখ লাখ টাকার ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। গ্রামাঞ্চলেও লোডশেডিংয়ে জনগণ অতিষ্ঠ। প্রচ- গরমে শিশু ও প্রবীণদের অবস্থা নাজুক এবং শিক্ষার্থীরা রাতের বেলায় পড়াশোনা করতে পারছে না। মুন্সীগঞ্জ অটো রাইস মিল অ্যান্ড ফ্লাওয়ার মিল এবং এগ্রি ইন্ডাস্ট্রির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মহিউদ্দিন মাসুদ জানান, প্রতিদিন ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। ডিজেলের চড়া মূল্যের কারণে জেনারেটর চালাতে গিয়ে উৎপাদন খরচ ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফ্লাওয়ার মিল, ফাইভার মিল ও এগ্রি ইন্ডাস্ট্রিতে উৎপাদন ঘাটতির কারণে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৮ থেকে ১০ লক্ষ টাকার লোকসান গুনতে হচ্ছে। আরাকান হিমাগারের ম্যানেজার মো. আশরাফ জানান, আলুর মান ঠিক রাখতে সারাদিন জেনারেটর চালাতে হচ্ছে, এতেও খরচ প্রায় ২০ ভাগ বেড়েছে।
মিনি গার্মেন্টস এলাকা বলে খ্যাত সিপাহীপাড়ার গার্মেন্টস মালিক মো. আকবর হোসেন বলেন, ঘন ঘন লোডশেডিং হওয়ায় কারিগরেরা কাজ করতে পারছেন না। ফলে সময়মতো মাল ডেলিভারি দেওয়া যাচ্ছে না। মুক্তারপুর বিসিক শিল্প নগরীর বিভিন্ন কারখানায় উৎপাদন ঘাটতিতে মালিকপক্ষ বিপুল লোকসান গুনছেন। ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা দ্রুত বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন।