Image description

আজ থেকে উত্তর আমেরিকায় শুরু হচ্ছে ২০২৬ বিশ্বকাপের জাঁকজমকপূর্ণ ও জমকালো আসর। বিশ্বজুড়ে যখন ফুটবল নিয়ে তুমুল উন্মাদনা আর উৎসবের আমেজ, ঠিক তখনই এর সম্পূর্ণ বিপরীত এক বাস্তবতার মুখোমুখি ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকা।

 

ইসরায়েলের ভয়াবহ গণহত্যার ফলে গাজায় এখন পর্যন্ত প্রায় ৭৩ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এই ধ্বংসযজ্ঞের মাঝে গাজা শহরের প্যালেস্টাইন স্টেডিয়ামের ধ্বংসাবশেষই এখন স্থানীয় ফুটবলারদের একমাত্র আশ্রয়।

যেখানে ক্রাচে ভর দিয়ে বলের পেছনে ছুটছেন ২৪ বছর বয়সী তরুণ আলি তাফেশ। গাজা আল-ইরাদা ফুটবল ক্লাবের সতীর্থদের সঙ্গে পাস বিনিময় করছেন তিনি।
 

 

ইসরায়েলি হামলায় গাজায় অবশিষ্ট থাকা শেষ কয়েকটি ব্যবহারযোগ্য ক্রীড়াঙ্গনের একটি হলো এই স্টেডিয়াম। এখানকার খেলোয়াড়দের কাছে ফুটবল এখন কেবল কোনো খেলা নয়, বরং বেঁচে থাকার ও অতীতের স্বাভাবিক জীবন কিছুটা হলেও পুনরুদ্ধার করার এক মরিয়া মাধ্যম।

 

অথচ মাত্র চার বছর আগে, ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের সময় গাজার একটি ক্যাফেতে বন্ধুদের সঙ্গে বসে উৎসবমুখর পরিবেশে খেলা দেখছিলেন আলি তাফেশ। চারপাশের সেই আনন্দঘন পরিবেশ আজও তার মনে দাগ কেটে আছে। তবে চার বছরের ব্যবধানে ২০২৬ বিশ্বকাপের প্রাক্কালে আলি আজ নিজেকে আবিষ্কার করেছেন যুদ্ধের কারণে অঙ্গ হারানো হাজারো মানুষের মিছিলে, যাদের মধ্যে শত শত ক্রীড়াবিদও রয়েছেন।

আল জাজিরাকে নিজের বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে আলী বলেন, ‘২০২২ বিশ্বকাপে সবাই সবার পছন্দের দলকে সমর্থন করত এবং পরিবেশটা ছিল চমৎকার। আজ গাজার পরিস্থিতি অত্যন্ত কঠিন। আমরা যেকোনো মুহূর্তে বোমা হামলা ও মৃত্যুর ঝুঁকিতে আছি।’

২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে পূর্ব গাজা শহরের জেইতুন মহল্লায় আলির নিজের বাড়িতে ইসরায়েলি বাহিনী হামলা চালায়। এই হামলায় তার মা ও ভাই নিহত হন এবং চিকিৎসকরা আলির একটি পা কেটে ফেলতে বাধ্য হন। পূর্বে একজন স্প্রিন্টার (দৌড়বিদ) হিসেবে স্থানীয় চ্যাম্পিয়নশিপে পদক জেতা এবং আইন বিষয়ে স্নাতক করা এই তরুণ পা হারিয়ে জীবনের দিশা হারিয়ে ফেলেছিলেন। পরবর্তীতে একই পরিস্থিতির শিকার বন্ধুদের মাধ্যমে তিনি ‘গাজা আল-ইরাদা’ ক্লাবের সন্ধান পান।

আলি বলেন, ‘আমার পা কেটে ফেলার পর আমি জীবনের দিশা হারিয়ে ফেলেছিলাম। আমি একজন চ্যাম্পিয়ন ছিলাম। আমার পদক ছিল। গাজা আল-ইরাদার হয়ে খেলা আমার বন্ধুরা আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল। আমি তাদের সঙ্গে যোগ দেওয়ার অনুমতি চাইলে তারা আমাকে সাদরে গ্রহণ করে।’

প্রায় ছয় মাস আগে আবারও মাঠে ফেরা আলির জন্য প্রতিদিনের লড়াইটাও সহজ নয়। তিনি জানান, ‘কোনো যানবাহন নেই। মাঠে পৌঁছানোর জন্য আমাকে ক্রাচের ওপর ভর দিয়ে দুই ঘণ্টারও বেশি হাঁটতে হয়। অনেক প্রয়োজনীয় সুরক্ষাসামগ্রীও পাওয়া যায় না। যা কিছু সামান্য আছে তা দিয়েই আমরা খেলি এবং আমাদের সাধারণ সামর্থ্য দিয়েই ফুটবলকে পুনর্গঠন করার চেষ্টা করি।’

গাজা আল-ইরাদা ক্লাবের আরেক সদস্য, ৪০ বছর বয়সী সাদি আল-মাসরির গল্পটা একটু ভিন্ন। বর্তমান যুদ্ধে তার অনেক সতীর্থ অঙ্গ হারিয়েছেন, তবে সাদি মাত্র দুই বছর বয়সে এক গাড়ি দুর্ঘটনায় পা হারান। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও খেলাধুলার প্রতি ভালোবাসার কারণে তিনি বছরের পর বছর ফিলিস্তিনের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। সাদি একাধারে জাতীয় সাঁতার চ্যাম্পিয়ন, জাতীয় ভলিবল দলের সদস্য এবং জাতীয় অঙ্গহীন ফুটবল দলের খেলোয়াড় হিসেবে এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপেও অংশ নিয়েছেন।

চলমান বিশ্ব আসর নিয়ে সাদি আল জাজিরাকে বলেন, ‘বিশ্বকাপ দেখাটা আমাদের জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক। একটি অঙ্গহীন ফুটবল দল হিসেবে এই বছর আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের বাছাইপর্বে আমাদের অংশ নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু যুদ্ধ আমাদের বাধা দিয়েছে। এটা খুবই বেদনাদায়ক। কারণ, আমরা অনুপস্থিত।’

আন্তর্জাতিক ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থার ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি আরও বলেন, ‘দুর্ভাগ্যবশত ফিলিস্তিনের ক্রীড়ার সমর্থনে কিছুই করেনি ফিফা। খেলাধুলা পুনরায় শুরু করার জন্য আমাদের জরুরি ভিত্তিতে সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাওয়া ক্রীড়া সুবিধা এবং স্টেডিয়ামগুলোর পুনর্নির্মাণ প্রয়োজন।’

কাতারের সেই চেনা উদ্দীপনার সাথে বর্তমানের তুলনা করতে গিয়ে সাদি বলেন, ‘২০২২ এবং আজকের মধ্যে বিশাল ব্যবধান। তখন আমরা বাড়িতে ও ক্যাফেতে বসে ম্যাচ দেখতাম এবং সেই পরিবেশটা উপভোগ করতাম। আজ বিদ্যুৎ নেই, স্ক্রিন নেই, এমনকি ফোন বা ইন্টারনেটে খেলা দেখাও অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।’

গাজা আল-ইরাদা ফুটবল ক্লাবের কোচ হাতেম আল-মুগরেবি এই বিশ্বকাপকে দেখছেন গাজার ক্রীড়াবিদদের বিচ্ছিন্নতার এক বেদনাদায়ক স্মারক হিসেবে। তিনি জানান, যুদ্ধ ও অবরোধের বাস্তবতায় খেলোয়াড়দের, বিশেষ করে যারা হাত বা পা হারিয়েছেন, তাদের মানসিক অবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে।

হাতেম আল-মুগরেবি বলেন, ‘আমরা মূলত মোবাইল ফোনেই বিশ্বকাপ দেখব। এটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে গাজা এবং তার ক্রীড়াবিদদের জন্য একটি বেদনাদায়ক বার্তা। আমাদের নীরবতা ভাঙতে হবে এবং ফিলিস্তিনি ক্রীড়াবিদদের অস্তিত্ব ও অংশগ্রহণের অধিকার দিতে হবে।’

বিশ্বজুড়ে যখন ২০২৬ বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের রঙিন আলো ছড়ানোর প্রস্তুতি চলছে, তখন গাজার এই ফুটবলাররা বিশ্ববাসীর কাছে কেবল একটি বার্তাই পৌঁছে দিতে চান; তাদের খেলার অধিকার এবং বেঁচে থাকার অধিকারটুকু যেন কেড়ে নেওয়া না হয়।