Image description

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে এখন ভালো ডিমের চেয়ে পচা ডিমের দাম বেশি। এক পিস ভালো ডিমের দাম ৬ রুপি, অন্যদিকে এক পিস পচা বা নষ্ট ডিম বিক্রি হচ্ছে ২০ রুপিতে। অবাক করা বিষয় হলো, চাহিদা বেশি থাকায় রীতিমতো বাজার থেকে উধাও পচা ডিম। কিন্তু ভালো ডিমের চেয়ে পচা ডিমের দাম বেশি কেন, এই প্রশ্নই এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনায়।

 

পচা ডিমের এত বেশি চাহিদার মূলে রয়েছে ডিম থেরাপি। যে থেরাপির আতঙ্কে বেশ কয়েকদিন থরথর করে কাঁপছে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে তার দলের ছোট বড় নেতা-কর্মীরা।

 

পশ্চিমবঙ্গে গত এক মাস আগে বড় রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হয়েছে। বিধানসভা নির্বাচনে বিপুল জয়ের মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় এসেছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। বিজেপির ঐতিহাসিক জয়ের মধ্য দিয়ে সমানতালে চলছে মমতার দলে ভাঙ্গন। মাত্র এক মাসের মধ্যে মমতার হাত থেকে তার প্রতিষ্ঠিত দলের নিয়ন্ত্রণ প্রায় নাই হয়ে গেছে। লোকসভা, বিধানসভা থেকে একেবারে তৃণমূলে, মমতার হাত ছেড়েছেন একের পর এক ছোট বড় তৃণমূল কংগ্রেস নেতারা।

 

একদিকে তৃণমূল কংগ্রেসের দুর্বল রাজনৈতিক অবস্থান। অন্যদিকে ক্ষমতায় এসে রাজনৈতিক অবস্থান পাকাপোক্ত করার জন্য দুর্নীতি, ভীতি প্রদর্শন, চাঁদাবাজি, হুমকির বিরুদ্ধে বিজেপির জিরো টলারেন্স নীতি। পশ্চিমবঙ্গে এসব অভিযোগে প্রায় প্রতিদিন গ্রেপ্তার হচ্ছেন তৃণমূল কংগ্রেস নেতারা।

 

সরকার গ্রেপ্তারকৃত নেতা, নেত্রী, কর্মীদের হিসাব না দিলেও সংখ্যাটা প্রায় অর্ধশতাধিক। কিছুদিন আগেও যে নেতা-নেত্রীদের ডাকে ‘বাঘ-গরু এক ঘাটে পানি খেত’, এখন তারাই জনরোষের মুখে পড়েছেন। আর প্রতিটি ক্ষেত্রে তাদের দেখামাত্রই ডিম ছুড়ে মারছেন বিক্ষোভকারীরা। কখনও তা পচা, কখনও তা ভালো। এই বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে বিজেপির কিছু কর্মী, সমর্থকরাও। তৃণমূলের নেতা-নেত্রীরা আটক বা গ্রেপ্তারের খবর পেলে সেখানে ছুটে যাচ্ছেন বিক্ষুব্ধ জনতা, সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছেন ডিম। আর অভিযুক্ত ব্যক্তিকে কাছে পেয়ে তাক করে ডিম ছুড়ছেন তারা। আর ঝাঁকে ঝাঁকে সেই ডিম সোজা গিয়ে লাগছে হয় মাথায়, না হয় বুকে, পেটে কিংবা পিঠে। এই ডিমের হাত থেকে বাঁচতে হেলমেটও পড়তে হয়েছে অনেককে।

 

গেল নির্বাচনে প্রচারণায় এসে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সাফ বার্তা দিয়েছিলেন, ‘অপরাধীদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। তাদের স্থান হবে কারাগারে।’ এরপর রাজ্যে এলো ক্ষমতার পালাবদল। সরকারে বিজেপি। আর প্রথম ক্যাবিনেট বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ঘোষণা দেন একজন দুর্নীতিবাজ, অপরাধীদেরও ছাড় দেওয়া হবে না। এ ঘোষণার পর থেকে মূলত অপরাধীদের গ্রেপ্তারের সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে পচা ডিমের কদর। কিছু ক্ষেত্রে পচা ডিমের সঙ্গে উড়ে আসছে পচা টমেটো ও গোবরও।

পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে ঠেকেছে যে, সপ্তখানেক আগে তৃণমূল ভবনে ডিম হামলার আশঙ্কায় কাউন্সিলরদের নিয়ে ডাকা বৈঠক বাতিল করতে হয়েছে তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। যদিও এই বিষয়ে কেউ আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেননি। সূত্রের বরাতে জানা গেছে, পচা ডিম হামলার খবরে বাড়ির বাইরে পা রাখতে চাইছেন না কাউন্সিলরদের অনেকে।

 

সব মিলিয়ে ডিম ফোবিয়া শুরু হয়েছে তৃণমূল নেতাদের। এই ডিমের হাত থেকে বাঁচতে কখনও কখনও নিরাপত্তা রক্ষীদেরকে সামনে এগিয়ে দিচ্ছেন তৃণমূলের কথিত অভিযুক্তরা।

 

সপ্তাহ খানেক আগে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে সোনারপুরে ডিম ছোড়া হয়। সেই সঙ্গে তাকে লক্ষ্য করে চড়-ঘুষি মারা হয়। নিক্ষেপ করা হয় জুতা ও পাথর।

 

তৃণমূল কংগ্রেস নেতারা গ্রেপ্তার হলে কিছু ডিম বিক্রেতা পৌঁছে যাচ্ছেন থানা থেকে আদালত চত্বরে। হকারি করে রীতিমতো বিক্রি করছেন পচা ডিম।

 

নিমতায় তৃণমূলের জ্যেষ্ঠ সাংসদ সৌগত রায়কে লক্ষ্য করে ডিম ছোড়ে বিক্ষুব্ধ জনতা। থানায় প্রেষণ জমা দিতে গেলে জনতার ক্ষোভের মুখে পড়েন তিনি। বিক্ষোভকারীদের ছোড়া সেই ডিমের কিছু গিয়ে পড়ে রাস্তায়, আর কিছু গিয়ে পড়ে তার গাড়িতে।

 

শ্লীলতাহানি, বাড়ি দখলের অভিযোগে গ্রেপ্তারকৃত তৃণমূল মুখপাত্র জয়প্রকাশ মজুমদারকেও আদালতে তোলার সময় একই দৃশ্য দেখা যায়। তাকে স্বাগত জানাতে কাঁচা ডিম নিয়ে উপস্থিত ছিলেন উত্তেজিত জনতা। ফলে ডিম হামলার ভয়ে প্রথমে গাড়ি থেকে নামতে চাইছিলেন না জয়প্রকাশ। পরে পুলিশ তাকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে গাড়ি থেকে বের করেন। কিন্তু শেষমেশ জয়প্রকাশের সঙ্গে কাঁচা ডিম খেতে হয় পুলিশকেও।

 

রাজ্যের সাবেক মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের ভাই টলিউডের ত্রাস স্বরূপ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে ডিম দিয়ে। স্বরূপের গ্ৰেপ্তারির খবর পেয়েই নিউ আলিপুর থানার বাইরে ডিম হাতে জমায়েত হয় বিক্ষুব্ধরা। সঙ্গে চোর চোর স্লোগান।

 

এনআইএ-এর হাতে গ্ৰেপ্তার তৃণমূলের প্রাক্তন বিধায়ক শওকত মোল্লা। তাকে আদালতে তোলার আগে এনআইএ দপ্তরের বাইরে ডিম হাতে অপেক্ষা করতে দেখা যায় জনতাকে। এমনকি বিক্ষুব্ধ জনতার হাতে ডিম পৌঁছে দিতে স্থানীয় এক ব্যক্তিকে পচা ও ভালো উভয় ধরনের ডিম বিক্রি করতে দেখা যায়।

 

তৃণমূলের কামারহাটির বিধায়ক মদন মিত্রের গাড়িতেও শনিবার (৬ জুন) ডিম ছুড়ে একদল উত্তেজিত জনতা। সে সময় তৃণমূল বিধায়ক বলেছিলেন, ‘মৃত্যুকে অনেক কাছ থেকে দেখলাম।’

 

মঙ্গলবার (৯ জুন) ডিম বিক্ষোভের মধ্যে পড়তে হয়েছে তৃণমূলের সাবেক বিধায়ক বিধাননগরের পৌরসভার সাবেক মেয়র ও বর্তমান কাউন্সিলার সব্যসাচী দত্তকেও। চাঁদাবাজির অভিযোগে গ্রেপ্তারকৃত সব্যসাচী দত্তকে এদিন যখন থানা থেকে বের করে বিধান নগর মহকুমা আদালতে নিয়ে আসা হয় এবং শুনানি শেষে ফের যখন আদালতে বের করা হচ্ছিল তখন বিক্ষোভের মুখে পড়ে সব্যসাচী। তাকে ঘিরে ধরে নারীরা মুহুর্মুহু ডিম ছুড়তে থাকে। পাশাপাশি তাকে উদ্দেশ্য করে দেওয়া হয় ‘চোর চোর’ স্লোগান। এ সময় ডিমের হাত থেকে বাঁচতে আদালতের বাইরে এসে পুলিশের গাড়িতে উঠার পরিবর্তে ফের আদালতের ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করেন তিনি। পরে পুলিশের পেছনে মুখ লোকাতে হয় তাকে। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। মুহূর্তের মধ্যে সাদা জামায় লাগে হলুদ রঙের ছোঁয়া।

 

এক কথায় ডিম হামলা সামলাতে নাস্তানাবুদ পশ্চিমবঙ্গের পুলিশও। অভিযুক্তকে উদ্দেশ্য করে ছোড়া ডিম কখনও কখনও তাদের গায়ে এসেও পড়ছে। এতে একদিকে যেমন শারীরিকভাবে আঘাত পাচ্ছেন তারা, তেমনি নষ্ট হচ্ছে পরনের ইউনিফর্মও। স্বভাবত যে পুলিশ লাঠি দিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতেন, তাদের এখন নিজেদের রক্ষায় প্রস্তুত রাখতে হচ্ছে ফেস গার্ড।

 

এ বিষয়ে গত ১৫ বছরে তৃণমূলের শাসনে বিরক্ত সাধারণ জনতা বলছেন, ডিম নয়, এদের পচা টমেটো ছুড়ে মারা উচিত। তার অভিমত ডিমের দাম বেশি হওয়ায় অনেকের পক্ষে কেনা সম্ভব হয় না। একই সঙ্গে গোবরও রাখা উচিত।

 

বিজেপি বলছে, এটা মানুষের জনরোষ; তাদের কিছু করার নেই।