যখন পুরো শহরজুড়ে সাইরেনের আর্তনাদ প্রতিধ্বনিত হয় এবং সংবাদমাধ্যমের বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে বারুদের গন্ধ, তখন প্রতিটি বিবেকবান মানুষ নিজের মতো করে অস্ত্র তুলে নেয়। কেউ কাঁধে তুলে নেন রাইফেল, কেউ আবার তাক করেন ক্যামেরার লেন্স।
ইরানের প্রখ্যাত কার্টুনিস্ট সাইয়্যেদ মাসুদ শোজায়ি তাবাতাবায়ি ‘৪০ দিনের যুদ্ধ’ শুরুর প্রথম ভোরেই একটি নীরব প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, যে প্রতিজ্ঞার ভিত্তি ছিল শিল্প ও রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ছোট ছোট ফ্রেমে বন্দি থাকা সেই উত্তাল দিনগুলোর গল্পই উঠে এসেছে এই প্রতিবেদনে। বিশ্বসাম্রাজ্যবাদের মূল হোতাদের মুখোশ উন্মোচন করা থেকে শুরু করে তরুণ প্রজন্মকে দিনরাত কার্টুন আঁকার প্রশিক্ষণ দেওয়া—সবই জড়িয়ে আছে এই শিল্পীর লড়াকু জীবনের সাথে।
ক্যানভাসের নীরব বৈপ্লবিক ঝড়
ডিজিটাল স্ক্রিনের ওপর দিয়ে স্টাইলাস (ডিজিটাল কলম) আলতো করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সবকিছু শুরু হয় একটিমাত্র কালো বিন্দু দিয়ে। সেই বিন্দুটি ধীরে ধীরে প্রাণ পেয়ে রেখায় রূপ নেয় এবং ফুটিয়ে তোলে একটি চেনা মুখের অবয়ব। ভেতরের চরিত্র আর উপাদানগুলো সব যার যার জায়গায় ঠিকঠাক বসে যায়; মনে হয় যেন ক্যানভাসে এখনই রঙ আর ব্যঙ্গের একটা বিস্ফোরণ ঘটতে যাচ্ছে। এই দৃশ্যের পরিচালক পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমের কোনো জোরালো আওয়াজ বা প্রোপাগান্ডা নয়, বরং একজন শিল্পীর মন, যিনি তার কর্মশালার নীরবতার মাঝেই একটা বৈপ্লবিক ঝড় তুলে দিচ্ছেন।
হঠাৎ করেই রেখাগুলো একে অপরের সাথে জড়িয়ে যায় এবং স্ক্রিনে ভেসে ওঠে ভাঙা শিংওয়ালা একটি ষাঁড়। এটি কোনো ফ্যান্টাসি দৃশ্য নয়, এটি বর্তমান ভূরাজনীতির একটি দীর্ঘস্থায়ী ও চাক্ষুষ রূপ। এই ৪০ দিনের মিডিয়া যুদ্ধের আসল চেহারা কী ছিল, তা যদি কেউ জানতে চায়, তবে তাকে এই শিল্পীর প্রতিদিনের কার্টুনগুলো দেখানোই যথেষ্ট। ইতিহাস যেন তাকে এই চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সাক্ষী হতে এবং তা স্মৃতির পাতায় ধরে রাখার জন্যই নির্বাচন করেছে। বাস্তবতা হলো, এই যুদ্ধের পরিধি সাধারণ খবরের চেনা ফ্রেমে তুলে ধরা যায় না; এই লড়াইকে দেখতে হবে তার কার্টুনের অতিরঞ্জিত রেখা, তেতো ব্যঙ্গ আর সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সাহসী রঙের মধ্য দিয়ে।
সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের আগুন জ্বলে ওঠার প্রথম দিন থেকেই এই পরিশ্রমী ও সচেতন কার্টুনিস্ট হাত গুটিয়ে বসে না থাকার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি কেবল একজন দর্শক বা সংবাদের নিস্পৃহ ভোক্তা হয়ে থাকতে চাননি। এক সাক্ষাৎকারে তিনি সেই ব্যক্তিগত প্রতিজ্ঞার মুহূর্তটি তুলে ধরে বলেন: ‘যুদ্ধের শুরুর দিনগুলোতেই আমি একটি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম: যদি আল্লাহ চান এবং কোনো বাধা না আসে, তবে আমি এই পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিদিন অন্তত একটি করে ব্যঙ্গচিত্র তৈরি ও প্রকাশ করব। আল্লাহর রহমতে, আজ পর্যন্ত আমি প্রায় প্রতিদিনই এটি করতে পেরেছি, এমনকি কোনো কোনো দিন একাধিক ছবিও এঁকেছি। এখন পর্যন্ত এই কাজের সংখ্যা ৮০টি ছাড়িয়ে গেছে।’
তবে এই তথ্যপ্রযুক্তির যুগে, যেখানে খবরের গতি আলোর চেয়েও দ্রুত, সেখানে প্রতিটি ঘটনার সাথে তাল মিলিয়ে চলা মোটেও সহজ কাজ নয়। তিনি বলেন, ‘এত এত ঘটনা আর একের পর এক সংবাদের জোয়ারে কখনো কখনো সত্যিই কিছুটা পিছিয়ে পড়তে হয়। খবরের গতি অত্যন্ত তীব্র, তবে আমি চেষ্টা করি প্রতিদিনের এই পরিবর্তনের অন্তত একটি ভিজ্যুয়াল বর্ণনা তুলে ধরতে।’
ছবি দিয়ে সত্য উন্মোচন
কার্টুনের দুনিয়ায় রেখাগুলো কেবল মানুষকে হাসানোর জন্য আঁকা হয় না। কখনো কখনো একটি সাধারণ খসড়া ছবিও একটি বিশ্বসাম্রাজ্যের মিডিয়া একাধিপত্যকে বড় চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে পারে। শোজায়ি তাবাতাবায়ি তার এই কার্টুনগুলোকে ‘মুখোশ উন্মোচনের ভাষা’ হিসেবে দেখেন। পর্দার আড়ালে কী ঘটছে তা প্রকাশ করার প্রয়োজনীয়তায় তিনি বিশ্বাস করেন: ‘আমাদের কাজ হলো এটা দেখানো যে বাস্তবে কী ধরনের অপরাধ ঘটছে, এর পেছনে কারা রয়েছে এবং সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক খবরের আড়ালে কোন সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থ লুকিয়ে রাখা হচ্ছে।’
যখন তার কার্টুনের নিয়মিত চরিত্রগুলো সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়, তখন দুটি নাম সবচেয়ে বেশি সামনে আসে: ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তিনি এই দুজনকে ‘আগ্রাসী ও যুদ্ধবাজ নীতির প্রতীক’ মনে করেন। তাবাতাবায়ি বলেন, ‘আজ নেতানিয়াহুকে কার্যত একজন যুদ্ধাপরাধী হিসেবে চেনে সবাই। অন্যদিকে ট্রাম্পও একজন জটিল ব্যক্তিত্ব—যার বিরুদ্ধে অসংখ্য আইনি মামলা রয়েছে। এই চরিত্রগুলো ব্যঙ্গচিত্রের জন্য খুবই উপযোগী, কারণ তারা একদিকে যেমন বিশ্বজুড়ে পরিচিত, অন্যদিকে তেমনি একবিংশ শতাব্দীর কুৎসিত রাজনৈতিক আচরণের প্রতীক।’
ভাঙা শিংয়ের ষাঁড় এবং ‘মেড ইন চায়না’ পতাকা
একজন সাধারণ মানুষ যেভাবে পৃথিবীকে দেখে, এই শিল্পী দেখেন তার চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন চোখে। নিজের সাম্প্রতিক একটি বহুল প্রচারিত (ভাইরাল) কাজের কথা উল্লেখ করে শোজায়ি তাবাতাবায়ি বলেন: ‘আমি একটি ছবি এঁকেছিলাম যেখানে ট্রাম্পকে একটি আহত ষাঁড় হিসেবে দেখানো হয়েছে—যার একটি শিং ভাঙা এবং ব্যান্ডেজ করা। ষাঁড়ের শরীরের দাগগুলোকে আমি পৃথিবীর মানচিত্র হিসেবে ব্যবহার করেছি। সাধারণত বলা হয় গরুর প্রতিটি অংশই উপকারী, কিন্তু এখানে এটিকে একটি ক্ষতিগ্রস্ত ও পরাজিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এই কাজটি ফেসবুকে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার শিল্পীদের কাছ থেকে প্রচুর সাড়া পায়।’
ক্ষমতার লড়াইয়ের ক্ষেত্রে তার ব্যঙ্গাত্মক রূপটি মাঝেমধ্যে বেশ নিষ্ঠুর ও রূপক হয়ে ওঠে। আরেকটি কাজে তিনি উদীয়মান পরাশক্তি চীনের সামনে মার্কিন নেতৃত্বকে ক্ষুদ্র ও অসহায় হিসেবে ফুটিয়ে তুলেছেন: “এক সময় তারা চীনের সাথে হুমকির ভাষায় কথা বলত, কিন্তু আজ তারা এমন এক অবস্থানে আছে যেখানে তাকে অন্যের কাছে এক ধরনের মরিয়া ভাব নিয়ে যেতে হয়। ছবিতে দেখা যায়, ট্রাম্পের হাতে একটি বিশাল চীনা পতাকার সামনে আমেরিকার একটি ছোট্ট পতাকা রয়েছে। আর সবচেয়ে মজার ব্যঙ্গাত্মক বিষয় হলো, ট্রাম্পের হাতের ওই ছোট্ট পতাকাটিতেও লেখা ‘মেড ইন চায়না’!”
ব্রাজিল থেকে তেহরান: বিশ্বজুড়ে বিস্তৃত সাম্রাজ্যবাদবিরোধী নেটওয়ার্ক
শোজায়ি তাবাতাবায়ির এই ব্যঙ্গচিত্রগুলোর বার্তা কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানায় আটকে থাকেনি। তিনি আন্তর্জাতিক শিল্পীদের একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত, যারা কার্টুনকে কেবল বিনোদন হিসেবে নয়, বরং সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে একটি নৈতিক অবস্থান হিসেবে দেখেন।
বিদেশি কার্টুনিস্টদের সাথে তার সুগভীর সম্পর্কের কথা তুলে ধরে তিনি ব্রাজিলের একজন শিল্পীকে নিয়ে একটি চমৎকার স্মৃতি চারণ করেন: “ব্রাজিলের একজন বিখ্যাত কার্টুনিস্ট ছিলেন যিনি আমাদের একটি প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হয়েছিলেন এবং পরবর্তীতে বিচারক হিসেবে ইরানে এসেছিলেন। তিনি তেহরানের ১০ লাখ মানুষের সেই বিশাল সমাবেশে অংশ নেন এবং সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সেই গণজাগরণ খুব কাছ থেকে দেখেন। পরে তিনি ব্রাজিলে ইরানি সংস্কৃতির একজন প্রকৃত দূত হয়ে ওঠেন! তিনি বলতেন, ‘যারা নিপীড়কদের হয়ে কাজ করে, তাদের আমরা কার্টুনিস্ট বলেই গণ্য করি না; যার বাস্তবতার সঠিক বোধ ও পর্যাপ্ত সচেতনতা নেই, সে পেশাদার কার্টুনিস্টদের দলের মধ্যেই পড়ে না’।”
শোজায়ি এবং তার সমমনা বন্ধুদের কাছে ভার্চুয়াল জগৎ—বিশেষ করে ফেসবুক—একটি ‘নরম যুদ্ধ’ বা ‘সফট ওয়ার’ রুমে পরিণত হয়েছে। যখন বিশ্বখ্যাত কোনো ব্যক্তিত্ব এই ছবিগুলো শেয়ার করেন, তখন সেটি হাজার হাজার বার ছড়িয়ে পড়ে এবং আন্তর্জাতিক স্তরে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে একটি মনস্তাত্ত্বিক দলিল হয়ে ওঠে।
ক্যানভাসে অশ্রু: মিনাবের শহীদদের গল্প
সব ব্যঙ্গচিত্র মানুষকে হাসানোর জন্য নয়; কখনো কখনো এটি এমন এক আয়না হিসেবে কাজ করে যা সত্যকে প্রতিফলিত করে বুকের ভেতর এক গভীর বেদনা তৈরি করে। বেসামরিক ভুক্তভোগী ও শিশুদের নিয়ে তৈরি করা ছবির প্রসঙ্গে আসতেই শোজায়ি তাবাতাবায়ির কণ্ঠস্বর ভারী হয়ে ওঠে। সাম্রাজ্যবাদের এই নিষ্ঠুর আগ্রাসনের চিত্রকর নিজেও এর মানসিক আঘাত থেকে রেহাই পাননি। অত্যন্ত দুঃখভারাক্রান্ত কণ্ঠে তিনি বলেন:
“মিনাবের শহীদদের জন্য আমি যে ছবিটি এঁকেছিলাম, তা গভীর ভালোবাসা আর তীব্র বেদনা থেকে তৈরি হয়েছিল। কাজটা করার সময় আমি সত্যিই কাঁদছিলাম। আপনি যখন এমন শিশুদের ছবি আঁকেন যারা যুদ্ধের শিকার হয়েছে, অথচ একই সাথে ছবিতে তাদের মর্যাদা ও নির্দোষ ভাবটা ফুটিয়ে তোলেন, তখন সেই কাজটা আর কেবল কার্টুন থাকে না; তা একটি আবেগঘন দলিলে পরিণত হয়। আমি বিশ্বাস করি, কোনো কাজ যখন হৃদয় থেকে আসে, তখন তা অন্যের হৃদয়েও জায়গা করে নেয়।”
কোমে মধ্যরাতের ক্লাস: পেন্সিল ও কাগজের এক নতুন বাহিনী
তবে এই লড়াই কেবল একজন মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ইরানের পবিত্র কোম শহরে শোজায়ি তাবাতাবায়ি রাত প্রায় দেড়টা পর্যন্ত জেগে তরুণ প্রজন্মকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন, যারা আগামী দিনে এই দেশের ও সময়ের সত্যগুলো বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরবে। সেখানে এক দারুণ সৃজনশীল পরিবেশ তৈরি হয়েছে; শিশু, কিশোর ও তরুণরা এসে তাদের চারপাশের বেদনা ভাগ করে নেয় এবং এই গভীর কথোপকথন থেকেই নতুন নতুন কার্টুনের আইডিয়া জন্ম হয়।
গর্বের সঙ্গে তিনি বলেন, “আমার কিছু শিক্ষার্থী এখন এত ভালো কাজ করছে যে আমি তাদের বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিই। আজকের যুগে যখন রাজনীতিবিদরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ঝকঝকে প্রচারণার ওপর নির্ভর করছেন, তখন ব্যঙ্গচিত্র কোনো সীমান্ত না মেনেই মানুষের মনে পৌঁছে যাচ্ছে খুব সহজেই।”
এ প্রসঙ্গে শোজায়ি তাবাতাবায়ি বলেন, “আমি এই দিনগুলোতে আমার সব শক্তি ব্যয় করছি, যেন প্রতিদিন অন্তত একটি কাজ তৈরি হয়, যা একই সঙ্গে গল্প, সচেতনতা এবং শিক্ষা হিসেবে কাজ করতে পারে। আশা করি, এই কার্টুনগুলো সত্য তুলে ধরতে এবং শোকাহত মানুষের হৃদয়ে সামান্য হলেও সান্ত্বনা দিতে পারবে।”
যতদিন অন্যায় ও সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্য থাকবে, ততদিন এই শিল্পীদের ক্যানভাসে আঁকা রেখাগুলো কখনো বিশ্রাম পাবে না। তারা তাদের তুলি ও কলমকে তীক্ষ্ণ করেছেন যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ইতিহাস কেবল অস্ত্রধারী বিজয়ীদের মুখ থেকেই না শোনে, বরং সত্যের আসল রূপটি দেখতে পায়।