পশ্চিমা সামরিক প্রতিরক্ষা জোট ন্যাটো সদস্যভুক্ত রোমানিয়ার গালাৎসি শহরের একটি আবাসিক ভবনে আঘাত হেনেছে রাশিয়ার ড্রোন। ইউক্রেন সীমান্তের এই ঘটনায় অন্তত দুজন আহত হয়েছে এবং ভবনটি আগুন লেগেছে।
ন্যাটো ভূখণ্ডের এই হামলার ঘটনায় রাশিয়া-ন্যাটো উত্তেজনা এখন তুঙ্গে। মস্কোর বিরুদ্ধে চাপ বৃদ্ধি এবং জোটভুক্ত প্রতি ইঞ্চি ভূখণ্ড রক্ষা করতে প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও ন্যাটো।
শুক্রবার (২৮ মে) ভোরে এসব তথ্য জানিয়েছে রোমানিয়া সরকার। এ ঘটনায় বুখারেস্টে নিযুক্ত রুশ রাষ্ট্রদূতকে তলব করা হয়েছে।
রোমানিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাদু মিরুৎসা হামলার ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, জেরান ২ মডেলের বলে নিশ্চিত হওয়া রুশ ড্রোনটি চার মিনিট ধরে রোমানিয়ার আকাশসীমায় ছিল এবং এলাকাটিতে সদ্য স্থাপিত একটি আকাশ প্রতিরক্ষা রাডারে তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্তও হয়।
তিনি বলেন, তবে ড্রোনটি গুলি করে ভূপাতিত করতে সেনাবাহিনীর প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও পদক্ষেপটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করা হয়েছিল। আমরা সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছি এবং পূর্বাঞ্চলে নিরাপত্তা জোরদার করার জন্য অতিরিক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে ইতোমধ্যেই কাজ করছি। এই ব্যবস্থাগুলোর কয়েকটি আগামী কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ঘোষণা করা হবে।
দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকুশোর দান পরিস্থিতি মোকাবিলার বিষয়ে আলোচনার জন্য জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক ডেকেছেন। এবং বলেছেন, তিনি ‘আনুপাতিক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেবেন’।
রোমানিয়ার প্রতিরক্ষা প্রধান জেনারেল গেওরঘিৎসা ভ্লাদ এদিন ন্যাটো কমান্ডারদের সঙ্গে গালাৎসি শহরে গত রাতের ড্রোন হামলা নিয়ে আলোচনা করেছেন।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যম আন্তেনা৩-এর প্রতিবেদনে প্রকাশিত মন্তব্যে তিনি বলেন, এটি ন্যাটোর পূর্বাঞ্চলে নজরদারি ও প্রতিক্রিয়া বাহিনী জোরদার করার প্রয়োজনীয়তাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
তবে তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, এই হামলার মূল লক্ষ্য রোমানিয়া ছিল না, বরং এটি ইউক্রেনের ওপর রাশিয়ার অব্যাহত আগ্রাসনের ফলে সৃষ্ট ঝুঁকিগুলোই তুলে ধরেছে বলে আন্তেনা জানিয়েছে।
ন্যাটোর প্রতি রোমানিয়ার আহ্বান
প্রেসিডেন্ট ড্যান বলেছেন, ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর রোমানিয়ায় এটিই ‘সবচেয়ে গুরুতর নিরাপত্তা ঘটনা’। ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটোর সঙ্গে ফোনালাপে এ কথা বলেন তিনি।
এ সময় ড্যান বলেন, ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার আগ্রাসী যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে রোমানিয়ার ভূখণ্ডে ঘটা এটিই সবচেয়ে গুরুতর নিরাপত্তা ঘটনা। এর সম্পূর্ণ দায় রুশ ফেডারেশনের, যাদের আচরণ আন্তর্জাতিক আইন ও ন্যাটো সদস্য রাষ্ট্রের নাগরিকদের নিরাপত্তার প্রতি চরম অবজ্ঞার পরিচায়ক।
ড্যান জোটের পূর্বাঞ্চলের প্রতিরক্ষা জোরদার করার জন্য ন্যাটোর সঙ্গে কাজ করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন। রোমানিয়া একটি শক্তিশালী মিত্র ও ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার যে আগ্রাসন তাদের নাগরিকদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি, তা বুখারেস্ট মেনে নেবে না বলে জানান তিনি।
পাল্টা প্রতিক্রিয়ার প্রস্তাব
চেক প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট পেত্র পাভেল রাশিয়ার বিরুদ্ধে ‘কঠোর’ প্রতিক্রিয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন, যাতে মস্কো ‘স্পষ্টভাবে বুঝতে পারে’ যে ন্যাটো ‘এই ধরনের হামলা বরদাস্ত করবে না’।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ দেওয়া পোস্টে তিনি বলেন, রোমানিয়ার গালাৎসি শহরে একটি আবাসিক ভবনে রাশিয়ার ড্রোনের নজিরবিহীন রাত্রিকালীন হামলা, যাতে দুজন আহত হয়েছেন, তা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। তবে, শুধু সম্মিলিতভাবে এর নিন্দা জানিয়েই আমাদের থেমে থাকা উচিত নয়।
তিনি আরও বলেন, তাই আমি রোমানিয়ার প্রেসিডেন্ট ড্যানের জোরালো আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার আহ্বানকে দ্ব্যর্থহীনভাবে সমর্থন করি। রাশিয়াকে অবশ্যই পরিষ্কারভাবে বুঝতে হবে যে আমরা এ ধরনের হামলা বরদাস্ত করব না।
রাশিয়ার ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা
রোমানিয়ার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আলাপচারিতার পর ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুট বলেছেন, আমি পুনর্ব্যক্ত করছি যে, ন্যাটো মিত্র দেশগুলোর ভূখণ্ডের প্রতিটি ইঞ্চি রক্ষা করতে প্রস্তুত। ড্রোনসহ যে কোনো হুমকি প্রতিরোধ ও মোকাবিলার জন্য আমরা আমাদের প্রস্তুতি আরও জোরদার করতে থাকব।
তিনি বলেন, রাশিয়ার বেপরোয়া আচরণ আমাদের সকলের জন্য বিপদজনক। তারা ইউক্রেনজুড়ে বেসামরিক নাগরিক ও বেসামরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করা অব্যাহত রেখেছে। এবং গত রাতে তারা আবারও দেখিয়ে দিয়েছে যে, তাদের এই অবৈধ আগ্রাসী যুদ্ধের প্রভাব সীমান্তেই থেমে থাকে না।
রুট আরও বলেন, রাশিয়ার যুদ্ধের অবসান হওয়া প্রয়োজন, সেই সঙ্গে বেসামরিক নিরাপত্তার প্রতি রাশিয়ার উদাসীনতারও অবসান দরকার। আমাদের পক্ষ থেকে, আমরা দেশে আমাদের প্রতিরোধ ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে থাকব এবং রাশিয়ার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ইউক্রেনের প্রতিরোধ প্রচেষ্টায় আমাদের সমর্থন অব্যাহত রাখব।
এদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েন বলেছেন যে, রাশিয়ার ‘আগ্রাসী যুদ্ধ আরও একটি সীমা অতিক্রম করেছে’। রোমানিয়ার একটি জনবহুল এলাকায় রাশিয়ার একটি ড্রোন হামলায় বেসামরিক নাগরিকরা আহত হয়েছেন। ঘটনাটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভূখণ্ডে ঘটেছে।
তিনি বলেন, ইইউ রাশিয়ার ওপর চাপ বাড়াতে থাকবে এবং ২১তম নিষেধাজ্ঞা প্যাকেজ প্রস্তুত করছে।
ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের দোষারোপ
রোমানিয়ায় ড্রোন হামলার ঘটনায় রাশিয়ার পাশাপাশি প্রতিপক্ষ ইরানকেও দোষারোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্রে।
মার্কিন রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান জো উইলসন বলেছেন, রাশিয়া আগ্রাসীভাবে এবং বিনা উসকানিতে রোমানিয়ায় হামলা চালিয়েছে।
তিনি এক্সে লিখেছেন, ঘরে ঘুমিয়ে থাকা পরিবারগুলো যুদ্ধাপরাধী পুতিনের ক্ষেপণাস্ত্র ও ইরানি ড্রোনের লক্ষ্যবস্তু।
সূত্র: গার্ডিয়ান, সিএনএন, ফ্রান্স২৪