Image description

হরমুজ প্রণালির কাছে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের একটি এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন ভূপাতিত করেছে ইরান। আর এই ড্রোন ধ্বংসে নতুন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়েছে বলে দাবি করেছে দেশটি। তেহরানের দাবি, ‘আরাশ-ই কামাঙ্গির’ নামের দেশীয় প্রযুক্তির এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রথমবারের মতো যুদ্ধে ব্যবহার করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই দাবি পুরোপুরি স্বাধীনভাবে যাচাই করা না গেলেও কয়েক মাসের মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার পরও ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা যে পুরোপুরি ধ্বংস হয়নি, এই ঘটনায় সেটিই ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

 

 

সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা বলছে, হরমুজ প্রণালির কেশম দ্বীপের কাছে মার্কিন অত্যাধুনিক ওই ড্রোনটি ভূপাতিত করা হয় বলে ইরানি গণমাধ্যম জানিয়েছে। তারা দাবি করেছে, ‘আরাশ-ই কামাঙ্গির’ নামের দেশীয়ভাবে তৈরি একটি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার যুদ্ধক্ষেত্রে প্রথম ব্যবহারের ঘটনা ছিল এটি। তবে ইরানের এই নতুন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

 

বিশ্বের সবচেয়ে স্পর্শকাতর নৌপথগুলোর একটি হচ্ছে হরমুজ প্রণালি এবং সেই প্রণালির কাছে যুক্তরাষ্ট্রের একটি ড্রোন হারানোর ঘটনা এমন সময়ে ঘটল, যখন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী বন্দর আব্বাসের কাছে একটি ইরানি সামরিক স্থাপনায় নতুন হামলা চালিয়েছে বলে খবর এসেছে। পরে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) জানায়, পাল্টা জবাব হিসেবে তারা একটি ‘মার্কিন বিমানঘাঁটিতে’ হামলা চালিয়েছে।

 

নাজুক যুদ্ধবিরতির মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা বাড়তে থাকায় মার্কিন ড্রোন ভূপাতিত করার ইরানি দাবি নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে যে মাসের পর মাস ইসরায়েলি ও মার্কিন হামলার পর ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আসলেই কতটা টিকে আছে এবং আলোচনা ভেঙে গেলে নতুন হামলা মোকাবিলার সক্ষমতা তেহরানের এখনও আছে কি না।

 

ইরান কী বলেছে?

 

ইরানের আধা-সরকারি বার্তাসংস্থা ফার্স নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালির ওপর একটি ‘শত্রু’ গোয়েন্দা ড্রোন ভূপাতিত করতে আরাশ-ই কামাঙ্গির ব্যবহার করা হয়েছে। তাদের দাবি, এই ব্যবস্থায় স্টেলথ প্রযুক্তির লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করার সক্ষমতা রয়েছে। তবে এর প্রযুক্তিগত দিক নিয়ে খুব কম তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।

 

 

ইরানি গণমাধ্যম বলেছে, এটি ইরানের আকাশসীমা ও সামুদ্রিক সীমান্তের কাছাকাছি কার্যক্রম চালানো শত্রুপক্ষের বিমানগুলোর জন্য একটি সতর্কবার্তা। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি আলোচনা চলাকালে হরমুজ প্রণালির ওপর আংশিক নিয়ন্ত্রণকে কৌশলগত সুবিধা হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে ইরান।

 

ফার্স নিউজ অজ্ঞাতনামা কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, ‘গোপন সক্ষমতাসম্পন্ন একটি ব্যবস্থা ব্যবহার করে পরিচালিত এই অভিযান ইরানের পক্ষ থেকে একটি স্পষ্ট ও দৃঢ় বার্তা।’

 

ফার্সের ঘোষিত নতুন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার নাম ‘আরাশ-ই কামাঙ্গির’, যার অর্থ ‘তীরন্দাজ আরাশ’। এটি পারস্য পুরাণের এক বীর চরিত্রের নাম থেকে নেয়া। লোককাহিনি অনুযায়ী, তিনি একটি তীর ছুড়ে ইরান ও মধ্য এশিয়ার সীমারেখা নির্ধারণ করেছিলেন। পারস্য সাহিত্য ও কবিতায় আরাশকে বিদেশি আধিপত্যের বিরুদ্ধে লড়াই করা এক বীর হিসেবে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়।

 

ইরানের দাবি কতটা বিশ্বাসযোগ্য?

 

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই দাবি সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। কারণ সামরিক অগ্রগতির এমন অনেক দাবি অতীতেও করেছে তেহরান, যেগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা কঠিন ছিল।

 

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দাবির মূল ধারণাটি অযৌক্তিক নয়। কারণ ইরান দীর্ঘদিন ধরে তুলনামূলক কম খরচের, মোবাইল এবং দেশীয় প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় বিনিয়োগ করেছে, যা ড্রোন ও বিমানকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। এছাড়া এই প্রযুক্তি বড় স্থায়ী রাডার ব্যবস্থার ওপরও নির্ভরশীল নয়।

 

 

লন্ডনের কিংস কলেজের সিকিউরিটি স্টাডিজ বিভাগের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক মার্ক হিলবোর্ন আল জাজিরাকে বলেন, আরাশ-ই কামাঙ্গির সম্পর্কে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য খুবই সীমিত হলেও ঘটনাটি ‘বৃহত্তর একটি ধারার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ’। তিনি বলেন, ‘ইরান ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তির বিভিন্ন ক্ষেত্রে বেশ স্বনির্ভর হয়ে উঠেছে। ইউক্রেনের মতো তারাও যুদ্ধের অর্থনৈতিক সমীকরণ বদলে দিতে সক্ষম হয়েছে। কম খরচের সহজ প্রযুক্তিও অনেক বেশি জটিল ব্যবস্থার জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।’

 

এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন ভূপাতিত হওয়ার ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রকে ভবিষ্যতে ড্রোনের বদলে আরও ব্যয়বহুল ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারে বাধ্য করতে পারে। অন্যদিকে তেহরান তুলনামূলক কম খরচে উৎপাদনযোগ্য শাহেদ ড্রোন ব্যবহার অব্যাহত রাখতে পারবে। দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে এটি তাদের অর্থনৈতিক সুবিধাও দিতে পারে।

 

আরাশ-ই কামাঙ্গির আসলে কী হতে পারে?

আল জাজিরার সঙ্গে কথা বলা বিশ্লেষকদের মতে, আরাশ-ই কামাঙ্গির হয়তো কোনও বিপ্লবী নতুন অস্ত্র নয়; বরং ইরানের কম খরচের মোবাইল আকাশ প্রতিরক্ষা কৌশলেরই আরেকটি ধাপ।

 

নিউইয়র্কভিত্তিক কৌশলগত গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান হরাইজন এনগেজের নিরাপত্তা বিশ্লেষক অ্যালেক্স আলমেইদা বলেন, এটি ইরানের অন্যান্য স্বল্পপাল্লার বা ঘোরাফেরা করে লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকারী ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য অস্ত্রের উন্নত সংস্করণ হতে পারে।

 

তিনি বলেন, ‘আমার ধারণা এটি বিদ্যমান কোনও ব্যবস্থারই আরও উন্নত রূপ। এটি প্রচলিত আকাশ প্রতিরক্ষা রাডারের স্থায়ী নির্দেশনার ওপর নির্ভর করে না। সম্ভবত এতে ইলেকট্রো-অপটিক্যাল বা তাপ অনুসরণকারী নির্দেশনা প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। মূলত এটি এমন এক ধরনের সারফেস-টু-এয়ার মিসাইল ব্যবস্থা, যা দ্রুত স্থাপন ও উৎক্ষেপণ করা যায়।’

 

 

তার মতে, এটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ প্রচলিত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সহজে শনাক্ত করা যায়, কিন্তু ছোট ও সস্তা ব্যবস্থাগুলো সহজে সরানো, লুকানো, দ্রুত ব্যবহার এবং পুনরায় প্রতিস্থাপন করা সম্ভব। কিছু ব্যবস্থায় প্রতিরোধকারী ক্ষেপণাস্ত্র আকাশে নির্দিষ্ট এলাকায় ঘোরাফেরা করতে পারে এবং লক্ষ্যবস্তু দেখা দিলেই আঘাত হানে। এই কারণেই এমকিউ-৯ রিপারের মতো ড্রোন তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে থাকে। কারণ এই ধরনের ড্রোনের মূল কাজ নজরদারি করা এবং ধীরগতিতে চলাচল।

 

প্যারিসের সায়েন্সেস পো বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক নিকোল গ্রায়েভস্কি বলেন, তেহরানের এখনও শক্তিশালী মধ্য ও দীর্ঘপাল্লার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রয়োজন থাকতে পারে। তবে মোবাইল ব্যবস্থার সুবিধা স্পষ্ট।

 

তিনি বলেন, ‘এসব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দ্রুত স্থানান্তর করা যায়। কিছু ক্ষেত্রে এগুলো হাতে বহনযোগ্যও। রিপার ড্রোনটি কত উচ্চতায় উড়ছিল, আমরা জানি না। প্রকাশিত ভিডিও অনুযায়ী এটি ভূপাতিত করা হয়তো তুলনামূলক সহজ ছিল। তবে ইরানের কিছু আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা এখনও টিকে আছে, এই ঘটনা সেটিই প্রমাণ করেছে।’

 

কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ?

 

ইরানের বৃহৎ আকাশ প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্ক ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এটি ছিল মূলত পুরোনো রাডারনির্ভর ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা। দেশীয় ব্যাটারি এবং রাশিয়ার সরবরাহ করা এস-৩০০ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর এই আকাশ প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছিল।

 

ধারণা করা হয়, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় এই নেটওয়ার্কের বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে নতুন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দাবি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ইরানের কাছে এখনও এমন কিছু ব্যবস্থা রয়েছে, যা ‘স্থায়ীভাবে দমন করা কঠিন এবং একইসঙ্গে তা অব্যাহত আকাশ প্রতিরক্ষা হুমকি’ তৈরি করতে পারে বলে মনে করেন অ্যালেক্স আলমেইদা।

 

 

এসব ব্যবস্থা হয়তো বড় আকারের বিমান অভিযান থামাতে পারবে না বা বিপুলসংখ্যক আধুনিক যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করতে পারবে না। তবে এগুলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে দূর থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য ব্যয়বহুল অস্ত্রের ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল করে তুলতে পারে।

নিকোল গ্রায়েভস্কি বলেন, ইরানের সামরিক কৌশল প্রযুক্তিগত সমতার চেয়ে টিকে থাকার সক্ষমতার ওপর বেশি নির্ভরশীল। তার ভাষায়, ‘তাদের ব্যবস্থাগুলো খুব বেশি উন্নত বা পুরোপুরি সমন্বিত নয়। কিন্তু সে কারণেই ইরানের সামরিক কৌশল স্থিতিস্থাপকতা, দীর্ঘস্থায়িত্ব ও গতিশীলতার ওপর জোর দেয়।’

 

এই স্থিতিস্থাপকতার কৌশলগত প্রভাবও রয়েছে। যদি যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল স্থায়ীভাবে ইরানের পাল্টা আঘাত হানার সক্ষমতা ধ্বংস করতে না পারে, তাহলে প্রতিটি নতুন হামলার সঙ্গে উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন উত্তেজনা, হরমুজ প্রণালিতে চলাচলে আরও বিঘ্ন এবং যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি হবে।

 

গ্রায়েভস্কি বলেন, ‘আমার মনে হয় না ইরান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মতো এতটা উদ্বিগ্ন’। তার মতে, ‘যুক্তরাষ্ট্র এসব অভিযানের সাফল্যকে অতিরঞ্জিত করে প্রচার করেছে। আর ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়েরই গোলাবারুদের সীমাবদ্ধতা রয়েছে।’

 

তিনি আরও বলেন, ‘ইরানের উল্লেখযোগ্য প্রতিরক্ষা শিল্প রয়েছে। ২০২৫ সালের জুনে ১২ দিনের যুদ্ধের পর তারা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী উচ্চ পর্যায়ে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন বাড়াতে সক্ষম হয়েছে। পাশাপাশি ইরান এখনও যুদ্ধের ক্ষেত্রে কৌশলগত সুবিধা ধরে রেখেছে। কিছু ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সীমাবদ্ধতা ইরানের চেয়েও বেশি।’

 

তার মতে, ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা কৌশলের মূল লক্ষ্য অত্যাধুনিক সমন্বিত নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা নয়; বরং ‘স্থিতিস্থাপকতা, দীর্ঘস্থায়িত্ব ও গতিশীলতা’কে কেন্দ্র করে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করা।

 

তিনি বলেন, ‘ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা নিয়ে পশ্চিমা বিশ্লেষণে একটি সমস্যা হলো, সেগুলোকে প্রায়ই পশ্চিমা সামরিক মতবাদ ও প্রত্যাশার মানদণ্ডে বিচার করা হয়। তখন বলা হয় এগুলো যথেষ্ট নির্ভুল নয় বা কার্যকর নয়। কিন্তু অনেক বেশি শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের বাস্তবতায় বিচার করলে বলতে হবে, ইরান তাদের নিজেদের প্রত্যাশার চেয়েও ভালো করেছে।’