প্রায় ৯ কোটি ২০ লাখ মুসলিম জনগোষ্ঠীর দেশ ইরান। দেশটির প্রায় ৯৯ শতাংশেরও বেশি মানুষ মুসলিম এবং তাদের বিপুল অংশ অনুসরণ করে শিয়া মাজহাব। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ইসলামী সংস্কৃতি, আশুরার শোকানুষ্ঠান, মাহে রমজানের আধ্যাত্মিকতা কিংবা ঈদুল আজহার কোরবানির চেতনা ইরানের সামাজিক জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। কিন্তু ২০২৬ সালের ঈদুল আজহা ইরানিদের জন্য শুধুই ধর্মীয় উৎসব ছিল না; এটি ছিল যুদ্ধের আশঙ্কা, নিরাপত্তাহীনতা এবং অনিশ্চয়তার মাঝেও ঈমান, ধৈর্য ও সামাজিক সংহতির এক প্রতীকী প্রকাশ।
এ বছর আজ ২৭ মে, ১৪৪৭ হিজরির ১০ জিলহজ ইরানে পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপিত হয়। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে উত্তেজনা, আঞ্চলিক সংঘাত, নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং অর্থনৈতিক চাপ দেশটির মানুষের জীবনে গভীর ছাপ ফেলেছে। তবু ঈদের সকালে তেহরান, মাশহাদ, কুম, তাবরিজ, ইসফাহানসহ বিভিন্ন শহরের মসজিদ ও খোলা ময়দানে মানুষের উপস্থিতি প্রমাণ করেছে, সংকট যত গভীরই হোক, ধর্মীয় চেতনা এখনো ইরানি সমাজকে ঐক্যবদ্ধ রাখে।
রাজধানী তেহরানে প্রধান ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হয় তেহরান বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে। সেখানে বিপুল সংখ্যক মুসল্লি সমবেত হন। ইমামতি করেন আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আহমাদ খাতামি। জামাতে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতা, সামরিক কর্মকর্তা এবং রাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরাও অংশ নেন। নামাজ শেষে মুসলিম বিশ্বের শান্তি, ফিলিস্তিনের মুক্তি, যুদ্ধ-সংঘাতের অবসান এবং ইরানের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য বিশেষ মোনাজাত করা হয়।
এ সময় ইরানীরা মুসলিমদের ঈদের জামাতের পর সম্মিলিতভাবে দাড়িয়ে মোনাজাত করতে দেখা যায়।
ইরানে ঈদের জামাতের একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য রয়েছে। শিয়া ফিকহ অনুযায়ী ঈদের নামাজে অতিরিক্ত তাকবির ও বিশেষ কুনুত পাঠের প্রচলন আছে। সাধারণত দুই রাকাত ঈদের নামাজে একাধিক কুনুত দোয়া পড়া হয়, যা সুন্নি মুসলমানদের নামাজ পদ্ধতি থেকে কিছুটা ভিন্ন। আধুনিক ইরানে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ঈদের বড় জামাতগুলো ব্যাপকভাবে অনুষ্ঠিত হয়।
ঈদের দিন ইরানে ধর্মীয় আবহের সঙ্গে সামাজিক সংস্কৃতিরও মেলবন্ধন দেখা যায়। পরিবারগুলো নতুন পোশাক পরে, আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে যায়, কবর জিয়ারত করে এবং একে অপরের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে। প্রবীণদের সালাম করা, শিশুদের উপহার দেওয়া এবং পরিবারের সবাইকে নিয়ে একত্রে খাবার খাওয়া ইরানি ঈদ সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশেষ করে কুম ও মাশহাদের মতো ধর্মীয় শহরগুলোতে ঈদের দিন মাজারকেন্দ্রিক ভিড়ও লক্ষ্য করা যায়।
ঈদুল আজহার মূল প্রতীক কোরবানি। তবে ইরানে কোরবানি পালনের ক্ষেত্রেও কিছু ভিন্নধর্মী নিয়ম ও প্রশাসনিক কাঠামো রয়েছে। দেশটিতে সাধারণত বাড়িতে পশু জবাই নিরুৎসাহিত এবং অনেক ক্ষেত্রে বেআইনি। স্বাস্থ্যবিধি, পরিবেশ ও নগর ব্যবস্থাপনার কারণে সরকার নির্ধারিত কসাইখানায় কোরবানি করতে উৎসাহ দেয়। তাই ঈদের ভোরে নির্দিষ্ট জবাইকেন্দ্রগুলোতে দীর্ঘ সারি দেখা যায়। অনেকেই আগে থেকেই অনলাইনে বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কোরবানির নিবন্ধন সম্পন্ন করেন।
শিয়া সমাজে কোরবানির সময় দোয়া, নিয়ত ও আহলে বাইতের প্রতি দরুদ পাঠের বিশেষ গুরুত্ব দেখা যায়। তবে ইসলামের মৌলিক বিধানের দিক থেকে কোরবানির উদ্দেশ্য ও প্রক্রিয়া সুন্নি মুসলমানদের মতোই। অর্থাত তারাও তাকওয়া, আত্মত্যাগ ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্যই কোরাবনি করে থাকেন। কোরবানির গোশত দরিদ্রদের মধ্যে বণ্টনের ব্যাপারেও ইরানে ব্যাপক সামাজিক উদ্যোগ দেখা যায়। বিভিন্ন মসজিদ, দাতব্য সংস্থা ও ওয়াকফ প্রতিষ্ঠান গরিব পরিবারের জন্য মাংস বিতরণ করে থাকে।
ইরানের ঈদ সংস্কৃতিতে খাবারেরও বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। কাবাব, খোরেশ, জাফরানি ভাত এবং বিভিন্ন মাংসজাত খাবার ঈদের টেবিলে স্থান পায়। তবে চলমান অর্থনৈতিক সংকটের কারণে এ বছর অনেক পরিবার আগের মতো ব্যয়বহুল আয়োজন করতে পারেনি। তবু সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও মানুষ আত্মীয়তা ও সামাজিক বন্ধন অটুট রাখার চেষ্টা করেছে।
যুদ্ধ আতঙ্ক এবারের ঈদে দৃশ্যমান প্রভাব ফেলেছে। অনেক এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর আশপাশে অতিরিক্ত নিরাপত্তা মোতায়েন করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক ইরানি নাগরিক যুদ্ধের আশঙ্কা, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও একই সঙ্গে তারা আল্লাহর প্রতি ভরসা ও জাতীয় ঐক্যের কথাও তুলে ধরেছেন।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, ইরানে ধর্মীয় উৎসবগুলো কেবল আচারিক অনুষ্ঠান নয়; বরং জাতীয় মনোবল ও সামাজিক সংহতি পুনর্গঠনেরও একটি মাধ্যম। বিশেষ করে রাজনৈতিক চাপ ও যুদ্ধঝুঁকির সময় ধর্মীয় সমাবেশগুলো মানুষের মানসিক স্থিতি ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ঈদুল আজহার মূল শিক্ষা হলো ত্যাগ, ধৈর্য ও আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণ। যুদ্ধের অনিশ্চয়তা, অর্থনৈতিক সংকট ও বৈশ্বিক উত্তেজনার মধ্যেও ইরানিদের এবারের ঈদ উদযাপন যেন সেই শিক্ষারই বাস্তব প্রতিচ্ছবি। কোরবানির রক্তের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে মানুষের ধৈর্য, সামাজিক সংহতি এবং সংকটের মধ্যেও বেঁচে থাকার প্রত্যয়।