একসময় পরিবার পরিকল্পনার পক্ষে কাজ করেছিলেন। কম সন্তান নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রচারও চালিয়েছিলেন। কিন্তু সময় বদলেছে। আর সেই সঙ্গে বদলেছে ভারতের অন্ধ্র প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী সি চন্দ্রবাবু নাইডুর ভাবনাও। এবার তিনি উল্টো মানুষকে বেশি সন্তান নিতে দিচ্ছেন উৎসাহ।
গতকাল শনিবার শ্রীকাকুলাম জেলার নারসান্নাপেটায় এক অনুষ্ঠানে চন্দ্রবাবু নাইডু ঘোষণা দিয়েছেন, কোনো পরিবারে তৃতীয় সন্তান জন্ম নিলে সরকার ৩০ হাজার রুপি দেবে। আর চতুর্থ সন্তান হলে দেওয়া হবে ৪০ হাজার রুপি।
ঘোষণাটি সামনে আসতেই ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে আলোচনা। কেউ এটিকে ভবিষ্যতের জনসংখ্যা সংকট মোকাবিলার উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ বলছেন এর পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক হিসাব।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে নাইডু বলেছিলেন, ‘আমি বিষয়টি নিয়ে অনেক ভেবেছি। অতীতে আমি পরিবার পরিকল্পনার পক্ষে কাজ করেছি। কিন্তু এখন আবার সন্তান আমাদের সম্পদ হয়ে উঠেছে। এমন একটি সময় এসেছে, যখন আমাদের সবারই শিশুদের জন্য কাজ করতে হবে।’
গত কয়েক বছর ধরে জন্মহার কমে যাওয়া নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলে আসছেন নাইডু। তার আশঙ্কা, ভারত যেন দক্ষিণ কোরিয়া বা জাপানের মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি না হয়।
এই দুই দেশেই জন্মহার দীর্ঘদিন ধরে কমতে কমতে এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে। যেখানে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা যাচ্ছে কমে। ফলে অর্থনীতি, শ্রমবাজার এবং সামাজিক কাঠামোর ওপর তৈরি হয়েছে বড় চাপ।
নাইডুর মতে, ভারতের কিছু অংশেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বলেছিলেন, ‘মানুষের আয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক দম্পতি এখন একটি সন্তানেই থাকছেন সীমাবদ্ধ। আবার কেউ কেউ প্রথম সন্তান মেয়ে হলে তবেই দ্বিতীয় সন্তানের পরিকল্পনা করছেন।’
তার মতে, একটি দেশের জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখতে মোট প্রজনন হার বা টোটাল ফার্টিলিটি রেট (টিএফআর) ২ দশমিক ১ থাকা জরুরি। অর্থাৎ প্রতি নারীর গড়ে অন্তত ২ দশমিক ১টি সন্তান থাকা প্রয়োজন। এর কমে নেমে গেলে দীর্ঘমেয়াদে জনসংখ্যা কমতে শুরু করে।
তবে নাইডুর এই ঘোষণাকে ঘিরে সমালোচনাও কম হয়নি।
কংগ্রেসের জাতীয় মুখপাত্র অলোক শর্মা সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন। তার মতে, গত এক দশকের বেশি সময় ধরে ভারতে পরিবার পরিকল্পনা বা জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তেমন কোনো জাতীয় নীতি নেই। অথচ এখন হঠাৎ করে বেশি সন্তান নিতে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। দক্ষিণ ভারতে এমন ধারণা তৈরি হয়েছে যে ভবিষ্যতে জনসংখ্যা কম থাকলে লোকসভায় তাদের আসনও কমে যেতে পারে।
ভারতে লোকসভা আসন পুনর্বিন্যাস নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা চলছে। দক্ষিণ ভারতের অনেক রাজ্য জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে তুলনামূলক সফল। ফলে ভবিষ্যতে জনসংখ্যার ভিত্তিতে আসন পুনর্বিন্যাস হলে তারা রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে—এমন আশঙ্কা রয়েছে।
সমালোচকেরা বলছেন, নাইডুর নতুন ঘোষণার পেছনে সেই রাজনৈতিক বাস্তবতাও কাজ করতে পারে।
এদিকে ওয়াইএসআর কংগ্রেস পার্টির জাতীয় মুখপাত্র কার্তিক ইয়েল্লাপ্রগাদা অভিযোগ করেছেন, এটি মূলত সরকারের ব্যর্থতা আড়াল করার চেষ্টা। তার ভাষ্য, এটি মানুষের দৃষ্টি ঘোরানোর জন্য আরেকটি রাজনৈতিক নাটক ছাড়া কিছু নয়।’
তার দাবি, অন্ধ্রপ্রদেশের মানুষ এখন কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও উন্নয়ন চান। কিন্তু সরকার সেসব সমস্যার সমাধানের বদলে নতুন নতুন ঘোষণায় ব্যস্ত। তবুও নাইডু তার অবস্থানে অনড়।
‘ভবিষ্যতের জন্য এখন থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি। কারণ জনসংখ্যা শুধু সংখ্যা নয়, এটি অর্থনীতি, শ্রমশক্তি এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের সঙ্গেও জড়িত।’—যোগ করেন তিনি।
বিশ্বের অনেক দেশ এখন কম জন্মহারের সমস্যায় ভুগছে। কোথাও সরকার সন্তান জন্মে নগদ প্রণোদনা দিচ্ছে, কোথাও কর ছাড় দেওয়া হচ্ছে, আবার কোথাও দীর্ঘ মাতৃত্বকালীন ছুটির মতো সুবিধা বাড়ানো হচ্ছে।
এবার সেই তালিকায় নতুন করে যুক্ত হলো অন্ধ্র প্রদেশ। তবে এই উদ্যোগ সত্যিই মানুষের সিদ্ধান্ত বদলাবে কি না, সেটি এখনো স্পষ্ট নয়।
কারণ সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত শুধু অর্থনৈতিক নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জীবনযাত্রার খরচ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, চাকরি এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার মতো বহু বিষয়। তবুও নাইডুর এই ঘোষণা ভারতের জনসংখ্যা রাজনীতিতে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
একসময় যেখানে পরিবার পরিকল্পনার স্লোগান ছিল ‘ছোট পরিবার, সুখী পরিবার’, সেখানে এখন প্রশ্ন উঠছে—ভবিষ্যতে কি ভারতকেও বেশি সন্তান নিতে মানুষকে উৎসাহ দিতে হবে?
সূত্র: এনডিটিভি