Image description

চাপের মুখে থাকা বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ের স্টারমার সতর্ক করেছেন। বলেছেন, লেবার পার্টির নেতৃত্ব নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু হলে তা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে। এর মধ্যেই জল্পনা ছড়িয়েছে যে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং খুব শিগগিরই তাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারেন। প্রধানমন্ত্রী তার বিভক্ত এমপি ও মন্ত্রীদের নতুন কিছু আইন প্রণয়নের পক্ষে একত্রিত করার চেষ্টা করেছেন। তার দাবি, এসব আইন কর্মজীবী মানুষের জন্য ব্যর্থ বর্তমান অবস্থার অবসান ঘটাবে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি।

 

মন্ত্রী ও এমপিদের সঙ্গে বৈঠকের আগে পার্লামেন্টে দেয়া বক্তব্যে স্টারমার স্বাস্থ্য, আবাসন ও অভিবাসনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেন। ইংল্যান্ডের স্থানীয় নির্বাচন, স্কটল্যান্ড ও ওয়েলসের নির্বাচনে গত সপ্তাহে লেবার পার্টির বড় পরাজয়ের পর চারজন জুনিয়র মন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন। তারা হলেন মিয়াত্তা ফাহনবুল্লেহ, জেস ফিলিপিস, অ্যালেক্স ডেভিস-জোনস এবং জুবাইর আহমেদ।

এছাড়া দলের কয়েক ডজন এমপি তাকে পদত্যাগের আহ্বান জানিয়েছেন। ফলে নিজের পদ রক্ষার লড়াইয়ে নেমেছেন স্টারমার। স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিংয়ের সমর্থকরা জানিয়েছেন, তারা আশা করছেন বৃহস্পতিবারের মধ্যেই ওয়েস স্ট্রিটিং লেবার পার্টির নেতৃত্বের জন্য স্যার কিয়েরকে চ্যালেঞ্জ জানাবেন। লেবার পার্টির নিয়ম অনুযায়ী নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রতিযোগিতা শুরু করতে স্ট্রিটিংয়ের ৮১ জন এমপির সমর্থন প্রয়োজন হবে।

কয়েকদিনের তীব্র জল্পনার পর বুধবার সকালে স্ট্রিটিং প্রায় ২০ মিনিটের জন্য ১০, ডাউনিং স্ট্রিটের বাসভবনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন। ধারণা করা হচ্ছে, তিনি স্টারমারকে সরিয়ে নেতৃত্বে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রীর এক মুখপাত্র বলেছেন, স্ট্রিটিংয়ের ওপর পূর্ণ আস্থা আছে স্টারমারের। তবে বৈঠকের বিস্তারিত বিষয়ে তিনি মন্তব্য করেননি। বুধবার সন্ধ্যায় স্টারমার পার্লামেন্টে লেবার এমপি ও মন্ত্রীদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করেন। সেখানে তিনি সহকর্মীদের বলেন, আমরা নেতৃত্বের লড়াইকে আমাদের বিশৃঙ্খলার মধ্যে ফেলতে দিতে পারি না- কোনো চ্যালেঞ্জ এলে শতভাগ তাই হবে।

সূত্র জানিয়েছে, দুটি বৈঠক হয়েছে। একটি ছিল প্রতিমন্ত্রীদের সঙ্গে এবং অন্যটি জুনিয়র মন্ত্রীদের সঙ্গে। প্রতিটি বৈঠক প্রায় ১৫ মিনিট স্থায়ী হয়। মন্ত্রীদের পক্ষ থেকে স্টারমারকে বলা হয়, সরকারকে আরও বিদ্রোহীসুলভভাবে কাজ করতে হবে এবং ভিন্নভাবে দেশ পরিচালনা করতে হবে। প্রধানমন্ত্রীও স্বীকার করেন, তাকে পরিবর্তন আনতে হবে। স্টারমারের স্ট্রিটিং ও স্টারমারের বৈঠকের কিছুক্ষণ পরই লেবার সরকার নতুন সংসদীয় অধিবেশনের সূচনা উপলক্ষে ‘কিং’স স্পিচ’-এ তাদের আইন প্রণয়ন কর্মসূচি উপস্থাপন করে। হাউস অব লর্ডসে রাজা তৃতীয় চার্লস ঘোষিত আইন প্রস্তাবগুলোর মধ্যে ছিল এনএইচএস ইংল্যান্ড বিলুপ্ত করা, ডিজিটাল পরিচয়পত্র চালু করা, জুরি বিচারের পরিধি সীমিত করা, ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে লিজহোল্ড ব্যবস্থা বাতিলের পরিকল্পনা।

এছাড়া বৃটিশ স্টিলকে রাষ্ট্রীয় মালিকানায় নেয়া,পরিবেশবান্ধব জ্বালানি অবকাঠামো দ্রুত এগিয়ে নেয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বাণিজ্য সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং উত্তর ইংল্যান্ডের রেলসেবার উন্নয়নে বড় বিনিয়োগের প্রস্তাবও ছিল। হাউস অব কমন্সে বিলগুলো উত্থাপন করতে গিয়ে স্টারমার বলেন, কিং’স স্পিচ আমাদের প্রধান সরকারি সেবাগুলোতে মৌলিক সংস্কারের কর্মসূচি। বলেন, তিনি এমন একটি জরুরি, সক্রিয়, লেবার সরকার পরিচালনা করছেন, যা ক্ষমতাকে আবার শ্রমিক, ভাড়াটিয়া ও সুবিধাবঞ্চিতদের দিকে ফিরিয়ে দেবে, কর্মজীবী শ্রেণিকে কণ্ঠস্বর দেবে এবং যাদের বর্তমান ব্যবস্থা বারবার উপেক্ষা ও অবমূল্যায়ন করেছে, তাদের পাশে দাঁড়াবে।

এই ভাষা অনেকটাই সোমবারের স্টারমারের রিসেট বক্তৃতার প্রতিধ্বনি, যেখানে তিনি বলেন ধীরগতির পরিবর্তন যথেষ্ট নয় এবং দেশের বড় চ্যালেঞ্জগুলোর মুখোমুখি হওয়ার অঙ্গীকার করেন তিনি। তবে লেবার সরকারের কাছ থেকে ভোটাররা যে দৃঢ়তা প্রত্যাশা করেন, তার সঙ্গে স্টারমারের নেতৃত্বের সামঞ্জস্য রয়েছে- এমন বিশ্বাস অনেক এমপির মধ্যে তৈরি করতে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। কমন্সে বক্তব্য রাখতে গিয়ে লেবার এমপি জনাথন ব্র্যাশ বলেন, স্টারমার জনগণ যে আশা মরিয়া হয়ে খুঁজছে, তা দিতে পারছেন না। ব্র্যাশ বলেন, কেউ কেউ বলবেন এটি ব্যক্তিত্বের বিষয়। কিন্তু তা নয়। এটি নীতির প্রশ্ন এবং আমরা সময়ের দাবি অনুযায়ী পরিবর্তনের মাত্রা গ্রহণ করতে প্রস্তুত কি না, সেটিই আসল বিষয়। স্টারমারকে অবিলম্বে পদত্যাগ করতে বা সরে যাওয়ার সময়সূচি ঘোষণা করতে আহ্বান জানানো ৮০ জনের বেশি লেবার এমপির একজন হলেন ব্র্যাশ।

বুধবার কিং’স স্পিচের জবাবে স্টারমার ও তার সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা করেন কনজারভেটিভ নেতা কেমি ব্যাডেনক। তার বক্তব্যে লেবার এমপিরা গম্ভীর মুখে বসে থাকেন। ব্যাডেনক বলেন, স্টারমার পদে আছেন, কিন্তু ক্ষমতায় নেই। এই কিং’স স্পিচে যা সামান্য আছে, তাও তিনি বাস্তবায়ন করতে পারবেন না। সামনের সারিতে অন্য মন্ত্রীদের পাশে বসে থাকা স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিংকে উদ্দেশ করে ব্যাডেনক তার নেতৃত্বের উচ্চাকাক্সক্ষা নিয়ে কটাক্ষ করেন। তিনি বলেন, স্বাস্থ্যমন্ত্রী সম্প্রতি একটু বেশি বিভ্রান্ত। ব্যাডেনক বলেন, আমাকে কড়া চোখে তাকিয়ে লাভ নেই। আমরা সবাই জানি তিনি কী করছেন।

বুধবার সন্ধ্যায় মন্ত্রিসভার সদস্যরা পার্লামেন্টের টিয়ারুমে সহকর্মীদের বোঝানোর চেষ্টা করেন যে নেতৃত্ব নির্বাচন হলে তা মাসের পর মাস সরকারের কাজ করার সক্ষমতাকে পঙ্গু করে দেবে এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে।
স্ট্রিটিংয়ের পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে। তবে লেবার পার্টির আরও কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা আছেন, যারা দলীয় নেতৃত্বের উচ্চাকাক্সক্ষা পোষণ করেন বলে পরিচিত। গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র অ্যান্ডি বার্নহ্যামের প্রতি লেবার এমপিদের উল্লেখযোগ্য সমর্থন রয়েছে। বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, ভোটারদের কাছে তিনি সবচেয়ে জনপ্রিয় লেবার রাজনীতিক। তবে বার্নহ্যাম বর্তমানে এমপি নন। তাই তার জন্য আবার হাউস অব কমন্সে ফেরা সহজ হবে না। এজন্য একটি উপনির্বাচনে জয়ী হতে হবে। চলতি বছরের শুরুতে গর্টন অ্যান্ড ডেন্টন উপনির্বাচনে লেবারের প্রার্থী হতে আবেদন করেছিলেন বার্নহ্যাম। কিন্তু স্টারমারের মিত্ররা দলীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থায় তাকে আটকে দেন। আফজাল খান ও জেফ স্মিথসহ একাধিক এমপি অস্বীকার করেছেন যে তারা বার্নহ্যামকে পার্লামেন্টে ফেরার সুযোগ দিতে পদত্যাগের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। স্টারমারের নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করার সম্ভাবনা নিয়ে জল্পনা বাড়ার মধ্যে বৃহস্পতিবার বিবিসি রেডিও ম্যানচেস্টারের নিয়মিত ফোন-ইন অনুষ্ঠান থেকেও সরে দাঁড়িয়েছেন বার্নহ্যাম।

বার্নহ্যামের এক মুখপাত্র বলেছেন, আপনারা জানেন, অ্যান্ডি ‘হট সিট’ অনুষ্ঠান মিস করতে পছন্দ করেন না। কিন্তু এ সপ্তাহে গ্রেটার ম্যানচেস্টারের জন্য সর্বোত্তম চুক্তি নিশ্চিত করতে তাকে স্থানীয় নির্বাচনের পরবর্তী আলোচনা অগ্রাধিকার দিতে হচ্ছে।