Image description

চিবিয়ে ফেলে দেওয়া চুইংগামই শেষ পর্যন্ত ৪১ বছর পুরোনো হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচন করেছে। চুইংগাম থেকে পাওয়া ডিএনএ-এর মাধ্যমে ধরা পড়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের দুই নারী হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত মিচেল গ্যাফ। এই ঘটনায় নিহতদের পরিবার বহু বছরের অনিশ্চয়তা থেকে কিছুটা স্বস্তি পেয়েছে।

তদন্তকারীদের মতে, আধুনিক বিজ্ঞানই শেষ পর্যন্ত এই পুরোনো হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে।

 

আদালতের নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে তিনজন ছদ্মবেশী গোয়েন্দা একটি চুইংগাম কম্পানির কর্মী সেজে গ্যাফের বাড়িতে যান। তারা তাকে বিভিন্ন ধরনের চুইংগাম চেখে দেখতে বলেন। গ্যাফও আগ্রহ নিয়ে চুইংগাম খেতে থাকেন। পরে গোয়েন্দারা তাকে একটি ছোট বাটিতে চিবানো চুইংগাম ফেলতে বলেন।

গ্যাফ বুঝতেই পারেননি, ওই চুইংগাম থেকেই তদন্তকারীরা তার ডিএনএ সংগ্রহ করছেন। 

 

পরে সেই ডিএনএ ১৯৮৪ সালের ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনাস্থলে পাওয়া প্রমাণের সঙ্গে মিলে যায়। তদন্তকারী সুসান লোগোথেটি বলেন, গ্যাফ যখন চুইংগামটি বাটিতে ফেলেছিলেন, তখন তারা বুঝতে পেরেছিলেন বহু বছরের পুরোনো মামলার সমাধান হতে যাচ্ছে।

আদালতের নথি অনুযায়ী, ৬৮ বছর বয়সী গ্যাফ ১৯৮০ সালে জুডি উইভার এবং ১৯৮৪ সালে সুসান ভেসিকে হত্যার কথা স্বীকার করেছেন।

তার বিরুদ্ধে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে। দুই হত্যাকাণ্ডের তদন্তে আগে সন্দেহভাজনদের চিহ্নিত করা হলেও প্রমাণের অভাবে বিচার করা যায়নি। তবে আধুনিক ডিএনএ প্রযুক্তির কারণে শেষ পর্যন্ত দুই মামলার মধ্যে সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যায় এবং রহস্যের সমাধান হয়।

 

১৯৮০ সালের জুলাইয়ে সুসান ভেসিকে হত্যা করা হয়। তখন তার বয়স ছিল মাত্র ২১ বছর।

তিনি বিবাহিত ছিলেন এবং দুই ছোট সন্তানের মা ছিলেন। তার দুই সন্তানেরই বয়স তখন দুই বছরের কম ছিল।

 

আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিতে মিচেল গ্যাফ জানান, তিনি সেদিন এলোমেলোভাবে বিভিন্ন বাড়ির দরজা পরীক্ষা করছিলেন। এক পর্যায়ে ভেসির বাড়ির দরজা খোলা পেয়ে তিনি ভেতরে ঢুকে পড়েন। এরপর তিনি ভেসিকে বেঁধে মারধর করেন, ধর্ষণ করেন এবং পরে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন।

আদালতে দেওয়া বিবৃতি অনুযায়ী, প্রথম হত্যাকাণ্ডের চার বছর পর মিচেল গ্যাফ ৪২ বছর বয়সী জুডি উইভারের ওপর তার শোবার ঘরে হামলা চালান। তদন্তকারীদের মতে, নিজের অপরাধের প্রমাণ মুছে ফেলতে তিনি ঘরে আগুনও লাগিয়ে দেন।

গ্যাফ স্বীকার করেন, ‘বের হওয়ার আগে আমি তার গলায় দড়ি পেঁচিয়ে দিই। এরপর আমার অপরাধ লুকাতে এবং তাকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে বিছানার চাদরের কোণায় আগুন ধরিয়ে দিই। আমার কাজের কারণেই মিসেস উইভারের মৃত্যু হয়েছে।’

গ্যাফ তার বিবৃতিতে বলেছেন, প্রতিটি আক্রমণের কোনো নারীকে চিনে আক্রমণ করেননি। গ্যাফের আইনজীবী হিদার উলফেনবার্গার এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।

এই হত্যাকাণ্ডের সময় ডিএনএ পরীক্ষা এখনকার মতো পরিচিত বা কার্যকর ফরেনসিক পদ্ধতি ছিল না। তবুও আদালতের নথি অনুযায়ী, জুডি উইভারের মামলায় তদন্তকারীরা গুরুত্বপূর্ণ দূরদর্শিতা দেখিয়েছিলেন। তারা দ্রুত ল্যাবের সঙ্গে যোগাযোগ করে তার শরীর থেকে নমুনা সংগ্রহ করেন এবং মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেই প্রমাণ সংরক্ষণ করেন।

এভারেট পুলিশ বিভাগের তদন্তকারী সুসান লোগোথেত্তি বলেন, তিনি যখন পুরোনো কেস ফাইলটি হাতে পান, তখন সেখানে অর্থ পাচার ও কোকেন চক্র নিয়ে নানা অদ্ভুত তত্ত্ব ছিল। তিনি জানান, হত্যাকাণ্ডের সময় উইভারের প্রেমিককে দীর্ঘদিন এই মামলার প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে দেখা হয়েছিল। তবে ওই ব্যক্তি ১৯৯৪ সালে মারা যান।

তদন্তকারী কলিন্স জানান, ২০২৩ সালের নভেম্বরে কর্মকর্তা নোলটন ওই ডিএনএ প্রোফাইলটি যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ডিএনএ ডেটাবেস ‘কম্বাইন্ড ডিএনএ ইনডেক্স সিস্টেমে’ (কোডিস) যুক্ত করেন। এই ডেটাবেসে সারা দেশের সাজাপ্রাপ্ত অপরাধীদের ডিএনএ তথ্য সংরক্ষিত থাকে। সেখানে অনুসন্ধান চালিয়ে তারা দেখতে পান, ডিএনএটি মিচেল গ্যাফের সঙ্গে মিলে গেছে।

আদালতের নথি অনুযায়ী, জুডি উইভারের হত্যার তিন মাসেরও কম সময় পরে ওয়াশিংটনের এভারেটে দুই কিশোরী বোনকে ধর্ষণের অভিযোগে গ্যাফের নাম ওই ডেটাবেসে যুক্ত হয়েছিল।

ম্যাচ পাওয়ার পর তদন্তকারীরা আরো একটি ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করতে চেয়েছিলেন। সাধারণত তারা সন্দেহভাজনদের নজরদারি করে ফেলে দেওয়া জিনিস (যেমন সিগারেটের টুকরো বা পানীয়) থেকে ডিএনএ সংগ্রহ করে। তবে গ্যাফ খুব কমই বাইরে বের হতেন। তখন পুলিশ চুইংগাম দেওয়ার কৌশল ব্যবহার করে।

লোগোথেটি ও ম্যাথেসন জানান, ১৯৭৯ সালের নভেম্বরে মিচেল গ্যাফ ২৯ বছর বয়সী জ্যাকালিন ও’ব্রায়েনকে তার গ্যারেজে আক্রমণ করে ধর্ষণের চেষ্টা করেন। এই ঘটনার জন্য তাকে পাঁচ বছরের ও এক বছরের শ্রমমূলক সাজা দেওয়া হয়েছিল। 

কয়েক মাসের মধ্যেই তিনি সুসান ভেসিকে হত্যা করেন এবং ১৯৮৪ সালের আগস্টে প্রবেশনের সময় দুই কিশোরী বোনের ওপরও হামলার অভিযোগ ওঠে।

পরবর্তীতে ১৯৮৫ সালে তিনি ওই আক্রমণগুলোর জন্য দোষী সাব্যস্ত হয়ে ১১ বছরের বেশি কারাদণ্ড পান এবং ১৯৯৪ সালে মুক্তি পান। ৭৬ বছর বয়সী ও’ব্রায়েন বলেন, এসব ঘটনার পর গ্যাফ দীর্ঘদিন ধরে মানসিকভাবে কষ্টে আছেন এবং এখনো সেই ঘটনার ভয় তাকে তাড়া করে। সম্প্রতি আদালতে গ্যাফের স্বীকারোক্তি শুনতে তিনি উপস্থিত ছিলেন।