কৌশলগত হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে যাওয়া সমুদ্র তলদেশের সাবমেরিন ক্যাবল থেকে রাজস্ব আয়ের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করছে ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড (আইআরজিসি)। এই জলপথটি শুধু জ্বালানি ও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের প্রতিবন্ধকতা হিসেবেই নয়, বরং একটি ডিজিটাল চাপ প্রয়োগের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে তুলে ধরেছে আইআরজিসি-সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যম।
বার্তা সংস্থা তাসনিম ‘হরমুজ প্রণালির ইন্টারনেট ক্যাবল থেকে রাজস্ব আয়ের তিনটি বাস্তব পদক্ষেপ’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধে প্রকাশ করেছে। যেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রণালিটির মধ্য দিয়ে যাওয়া ডুবো ফাইবার-অপটিক ক্যাবলগুলোর মাধ্যমে প্রতিদিন ১০ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি আর্থিক লেনদেন হয়।
কিন্তু সংস্থাটি বলেছে, প্রণালিটি সম্পর্কে তাদের তথাকথিত গতানুগতিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে ইরান এই গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ পরিকাঠামোর অর্থনৈতিক ও সার্বভৌম সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
ইরানি সংবাদমাধ্যমটি বলছে, ইসলামী প্রজাতন্ত্রের তিনটি পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। এর মধ্যে একটি হলো বিদেশি কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে প্রাথমিক লাইসেন্সিং ও বার্ষিক নবায়ন ফি আদায় করা; দ্বিতীয়টি টেক জায়ান্ট মেটা, অ্যামাজন ও মাইক্রোসফটের মতো প্রধান প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে ইরানি আইনের অধীনে কাজ করতে বাধ্য করা; এবং সর্বশেষ পদক্ষেপটি হলো সাবমেরিন ক্যাবলগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের ওপর ইরানি কোম্পানিগুলোকে একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ দেওয়া।
এই পদক্ষেপগুলো হরমুজ প্রণালিকে ‘বৈধ সম্পদ সৃষ্টির একটি কৌশলগত কেন্দ্রে’ পরিণত করবে বলে তাসনিমের নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে।
আইআরজিসি-সংশ্লিষ্ট আরেকটি সংবাদমাধ্যম ফার্স সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে একই ধরনের হুমকি দিয়ে ইরানকে হরমুজের একটি ‘লুকানো মহাসড়কের’ শাসক হিসেবে বর্ণনা করেছে। পোস্টে বলা হয়, ৯৯ শতাংশেরও বেশি আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট যোগাযোগ সমুদ্রের তলদেশের ক্যাবলের মাধ্যমে পরিচালিত হয় এবং এগুলোকে গুগল, মেটা ও মাইক্রোসফটের মতো বৈশ্বিক প্রযুক্তি জায়ান্টদের মেরুদণ্ড হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
ফার্স আরও বলেছে, মাত্র কয়েক দিনের জন্য ক্যাবলগুলোতে বিঘ্ন ঘটলে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে কয়েক কোটি থেকে কয়েক শত কোটি ডলারের ক্ষতি হতে পারে। এই যোগাযোগ পথের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে গেছে। এ ছাড়াও দাবি করা হয়েছে, ক্যাবলগুলো আইনত এমন একটি এলাকার মধ্যে রয়েছে যেখানে ইরান সার্বভৌমত্ব প্রয়োগ করতে পারে এবং ট্রানজিট যাতায়াতের অধিকার সেই কর্তৃত্বকে খর্ব করে না।
প্রণালিটি পরিচালনার জন্য প্রস্তাবিত মডেলে ‘সমুদ্রের তলদেশের ক্যাবলের মাধ্যমে তথ্য আদান-প্রদানের জন্য অনুমতিপত্র ও টোল দেওয়া বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত’ বলে বার্তা সংস্থাটি দাবি জানায়। বিদেশি কোম্পানিগুলোকে ইরানের এই নিয়মকানুন মেনেই কাজ করতে হবে।
এ ছাড়াও ক্যাবলগুলোর ব্যবস্থাপনা, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব একচেটিয়াভাবে ইরানি কোম্পানিগুলোকে দেওয়া যেতে পারে, যা হরমুজকে ইরানের অন্যতম ‘ডিজিটাল ক্ষমতার’ চালিকাশক্তিতে পরিণত করবে।
এই মন্তব্যগুলো এসেছে গত এপ্রিলে তাসনিমে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনের পর। সেই প্রতিবেদনে পারস্য উপসাগর অঞ্চলের সমুদ্রের নিচের ইন্টারনেট ক্যাবল ও ক্লাউড অবকাঠামোর মানচিত্র দেখানো হয়েছিল, যেখানে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইন, কুয়েত ও সৌদি আরবের ইন্টারনেট সংযোগ রুটও ছিল।
ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, পারস্য উপসাগরের দক্ষিণের দেশগুলো ইরানের তুলনায় সমুদ্রের নিচের ইন্টারনেট ক্যাবলের ওপর বেশি নির্ভরশীল। তাই অবতরণ কেন্দ্র, ডেটা হাব ও ক্লাউড অবকাঠামো এই সংঘাতের গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠতে পারে।