মালির সামরিক জান্তা প্রধান আসিনি গোয়িতা যখন গত গ্রীষ্মে ক্রেমলিনে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠকে বসেছিলেন, তখন সেটি ছিল পশ্চিমা বিশ্বকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মালিতে মস্কোর ক্রমবর্ধমান প্রভাবের প্রতীক।
সেই বৈঠকের সময় মালির মরুভূমিতে জান্তা সরকারকে টিকিয়ে রাখতে কাজ করছিল প্রায় ২ হাজার রুশ সেনা। সাহেল অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব বিস্তারের যে উচ্চাকাঙ্ক্ষা মস্কোর রয়েছে, এটি ছিল তারই অংশ। কিন্তু গত কয়েক দিনে মালিতে সশস্ত্র বিদ্রোহী ও বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অতর্কিত ও সমন্বিত হামলা পশ্চিম আফ্রিকার এ দেশটিতে মস্কোর সামরিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা প্রকট করে তুলেছে।
গত সপ্তাহান্তে রুশ সমর্থিত জান্তা সরকারের ওপর সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় হামলা চালায় বিদ্রোহীরা। সোমবার পর্যন্ত চলা এ লড়াইয়ে বিদ্রোহীদের বড় বিজয়ের খবর পাওয়া গেছে। ভাগনার গ্রুপের উত্তরসূরি হিসেবে পরিচিত রাশিয়ার ‘আফ্রিকা কোর’ সোমবার স্বীকার করেছে যে, তারা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ উত্তরের শহর কিদাল থেকে পিছু হটেছে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইব্রাহিম ইয়াহিয়া ইব্রাহিম বলেন, ‘এই সংকট এ অঞ্চলে রাশিয়ার সামরিক হস্তক্ষেপের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলছে’।
মালির প্রতিবেশী দেশ বুর্কিনা ফাসো ও নাইজার যথাক্রমে ২০২২ ও ২০২৩ সালে সেনা অভ্যুত্থানের পর ফরাসি ও মার্কিন বাহিনীকে দেশ থেকে বহিষ্কার করে মস্কোর দিকে হাত বাড়িয়েছিল। কিন্তু মালিতেই রাশিয়ার উপস্থিতি সবচেয়ে গভীর। এখন প্রশ্ন উঠেছে, বিদ্রোহী দমনে আফ্রিকান দেশগুলো যে ধরনের সমাধান খুঁজছে, রাশিয়া তা দিতে পারবে কিনা।
লড়াইয়ে নিজেদের ক্ষয়ক্ষতির কথা স্বীকার করেছে আফ্রিকা কোর। তারা জানিয়েছে, আহত সেনা ও ভারী সরঞ্জাম সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ঘনিষ্ঠ ব্লগাররা জানিয়েছেন, গাও শহরের কাছে একটি রুশ হেলিকপ্টার ভূপাতিত করা হয়েছে, যাতে আরোহী সবাই নিহত হয়েছেন।
ক্ষয়ক্ষতির আঁচ পৌঁছেছে মালির সরকারের উচ্চপর্যায়েও। জান্তা সরকার নিশ্চিত করেছে যে, রাশিয়ার সঙ্গে অংশীদারত্বের মূল কারিগর ও মালির প্রতিরক্ষা মন্ত্রী সাদিও কামারা তার বাসভবনে এক আত্মঘাতী হামলায় আহত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন।
২০২১ সালে মালি সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখলের পর কামারাই ছিলেন রাশিয়ার সঙ্গে মিত্রতা গড়ার প্রধান রূপকার। ফরাসি বাহিনীকে বহিষ্কার করে তিনি রাশিয়াকে মালির প্রধান রাজনৈতিক ও সামরিক সহযোগী হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। প্রাথমিকভাবে জান্তা সরকার রাশিয়ার ভাড়াটে সেনা দল ‘ভাগনার গ্রুপ’-এর সহায়তা নেয়। কিন্তু ভাগনার প্রধান ইয়েভজেনি প্রিগোজিনের মৃত্যুর পর এ বাহিনীকে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সরাসরি অধীনে ‘আফ্রিকা কোর’ হিসেবে পুনর্গঠিত করা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, আফ্রিকা কোর ভাগনারের মতো কার্যকর প্রমাণিত হচ্ছে না। এর বড় কারণ, দক্ষ সেনাদের একটি বড় অংশ হয় ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যস্ত, নয়তো সেখানে নিহত হয়েছে। কিদাল শহরের নিয়ন্ত্রণ হারানো রাশিয়ার জন্য বড় এক প্রতীকী পরাজয়। তবে ইব্রাহিম ইয়াহিয়ার মতে, রাশিয়ার সমর্থন না থাকলে জান্তা সরকারের পতন হয়তো আরও আগেই হয়ে যেত।