ওয়াশিংটনে স্থানীয় সময় মঙ্গলবার দিনটি শুরু হয়েছিল তীব্র কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্য দিয়ে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পরবর্তী দফার শান্তি আলোচনার প্রস্তুতি হিসেবে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের ইসলামাবাদে যাওয়ার কথা ছিল। এ উদ্দেশ্যে প্রস্তুত রাখা হয়েছিল ‘এয়ার ফোর্স–টু’।
তবে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। বিমানটি আর উড্ডয়ন করেনি এবং আলোচনাও স্থগিত করা হয়। পরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন, ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ তিনি অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়াচ্ছেন। তাঁর ভাষ্য, তেহরানকে একটি ‘ঐক্যবদ্ধ প্রস্তাব’ তৈরির সুযোগ দিতেই এই সিদ্ধান্ত।
বিশ্ব যখন সম্ভাব্য শান্তির বার্তার অপেক্ষায়, তখন ট্রাম্প নিজেই কৌশলগতভাবে সময় নিচ্ছেন বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। প্রায় দুই মাস ধরে চলা এই সংঘাত থামাতে তিনি গত দুই সপ্তাহে দ্বিতীয়বারের মতো সামরিক হুমকি থেকে সরে এসে কূটনৈতিক পথের দিকে ঝুঁকলেন।
উল্লেখযোগ্যভাবে, ভ্যান্সের ইসলামাবাদ সফর কখনও আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি। এতে করে হোয়াইট হাউস এক ধরনের ধোঁয়াশা বজায় রেখেছিল। অন্যদিকে, ইরানও আলোচনায় অংশ নেওয়ার বিষয়ে কোনো স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দেয়নি। ফলে নিশ্চিত না হয়েই মার্কিন প্রতিনিধি দল পাঠানো হবে কি না—এই প্রশ্নে প্রশাসন দ্বিধায় পড়ে।
দিনের শেষে স্থগিত হওয়ার বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়, যখন মার্কিন প্রতিনিধি দলের দুই জ্যেষ্ঠ সদস্য—স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার—ইসলামাবাদ না গিয়ে ওয়াশিংটনে ফিরে আসেন। পরে ভ্যান্স হোয়াইট হাউসে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে অংশ নেন, যেখানে পরবর্তী কৌশল নির্ধারণ করা হয়।
পরবর্তীতে ট্রাম্প তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর ঘোষণা দেন। ফেব্রুয়ারি থেকে চলা সংঘাত নিয়ে তিনি নিয়মিত সেখানেই আপডেট দিয়ে আসছেন। তিনি জানান, পাকিস্তানের অনুরোধে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যাতে ইরান আলোচনার জন্য প্রস্তুতি নিতে পারে।
তবে এবার যুদ্ধবিরতির কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা উল্লেখ করা হয়নি। এর আগে চলতি মাসের শুরুতে তিনি দুই সপ্তাহের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিলেন। অতীতে ট্রাম্প একদিকে আলোচনার অগ্রগতির কথা বললেও অন্যদিকে সামরিক পদক্ষেপের হুমকিও দিয়েছেন—যা তাঁর অবস্থানকে অনেক সময় পরস্পরবিরোধী করে তুলেছে।
ইরাক ও তুরস্কে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত জেমস জেফ্রি বলেন, যুদ্ধ শেষ করার কোনো নির্দিষ্ট ফর্মুলা নেই। তাঁর মতে, আলোচনার প্রস্তাব ও সামরিক চাপ—এই দ্বিমুখী কৌশল নতুন কিছু নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের সাম্প্রতিক ভাষা আগের তুলনায় অনেক সংযত, যা হয়তো যুদ্ধ বন্ধের ইচ্ছারই প্রতিফলন। কারণ, এই সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে এবং তাঁর রাজনৈতিক সমর্থকদের একটি অংশের মধ্যেও বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে।
মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক ব্রায়ান কাটুলিস মনে করেন, এটি একটি বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ হলেও এতে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে। তাঁর ভাষায়, অর্থনৈতিক চাপ ও রাজনৈতিক বাস্তবতা—দুটিই এখন ট্রাম্পের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ায় আলোচনার জন্য সময় মিললেও মূল দ্বন্দ্বগুলো এখনো রয়ে গেছে। ইরান হরমুজ প্রণালীতে মার্কিন নৌ অবরোধকে ‘যুদ্ধাপরাধ’ বলছে, আর যুক্তরাষ্ট্র এখনো তা প্রত্যাহারের কোনো ইঙ্গিত দেয়নি।
অন্যদিকে, ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ বা মধ্যপ্রাচ্যে মিত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন কমানোর কোনো লক্ষণ দেখাচ্ছে না—যা ট্রাম্প প্রশাসনের নির্ধারিত প্রধান শর্তগুলোর মধ্যে অন্যতম।
সব মিলিয়ে, যুদ্ধবিরতি বাড়ানো হলেও দ্রুত সমাধানের সম্ভাবনা এখনো অনিশ্চিত রয়ে গেছে।
সূত্র: বিবিসি/এপি নিউজ