Image description

আসিম মুনিরই বিশ্বের প্রথম বিদেশি সেনাপ্রধান, যার সঙ্গে খোদ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের ‘অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ’ সম্পর্ক রয়েছে। পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের সংঘাতের পর এই সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছে। আর তার প্রভাব দেখা গেছে, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ নিরসনের মধ্যস্থতায়। অবাক করার বিষয়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের সামরিক নেতৃত্ব; উভয়ের সঙ্গে তার উন্নত সম্পর্ক রয়েছে। এই দক্ষতা তাকে বেশ সুনাম এনে দিলেও তার সঙ্গে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠতাকে ‘বিপজ্জনক’ হিসেবে সতর্ক করছেন বিশ্লেষকরা।

 

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ৪১ দিনের যুদ্ধের পর ইরানে যুদ্ধবিরতি দেয় যুক্তরাষ্ট্র। আর এ জন্য মধ্যস্থতা করেছে পাকিস্তান। এতে নেতৃত্ব দিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ ও সেনাপ্রধান আসিম মুনির। গত ১১ এপ্রিল রাজধানী ইসলামাবাদে শান্তি আলোচনা হলেও শেষ পর্যন্ত সংলাপ ভেস্তে যায়। কিন্ত পাকিস্তান জানায়, এই উদ্যোগে তারা হার মানবে না। অর্থাৎ সংঘাত নিরসনে কূটনৈতিক চ্যানেলে আলোচনার প্রক্রিয়ায় সক্রিয় ভূমিকা রাখবে।

 

এর আগে ২০২৫ সালে ভারতের সঙ্গে ১২ দিনের সংঘাতে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। ভারতের যুদ্ধবিমান ভূপাতিতের খবরে পাকিস্তানকে জোরালোভাবে ‘শক্তিশালী’ প্রমাণ করেন তিনি। এর পর দেশটির সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করেছেন। এর মধ্যে রুদ্ধদ্বার বৈঠকও ছিল, যা নিয়ে সে সময় শত্রুরাষ্ট্র ভারতে ব্যাপক আলোচনা হয়। কারণ ট্রাম্প ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে নিজের ‘ভালো বন্ধু’ হিসেবে দাবি করেন। ট্রাম্পকেও একই সম্বোধন করেন মোদি।

 

অন্যদিকে বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীনের সঙ্গে গত বছরেই বাণিজ্য যুদ্ধে জড়িয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। বেইজিংয়ের সঙ্গে ওয়াশিংটনের বৈরিতা দীর্ঘদিনের। অথচ প্রতিবেশী চীনের সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক রয়েছে পাকিস্তানের। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে রয়েছে কূটনৈতিক সম্পর্ক। ভূ-রাজনীতিতে ভারসাম্য বজায় রাখায় পাকিস্তান এখন উদাহরণ। যদিও শোচনীয় অবস্থায় রয়েছে দেশটির অর্থনীতি। এ ছাড়াও অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর উৎপাতও নানা সময় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে শিরোনাম হয়।

 

 

এসবের পেছনে আসিম মুনিরের ভূমিকা রয়েছে বলে বিভিন্ন মহলের দাবি। এমনকি দেশটির নেতৃত্বেও তার ‘ছায়া’ রয়েছে বলে মনে করেন অনেকেই। পাকিস্তানের বিশ্লেষক রাজা রুমি মতে, মুনিরের মতো ব্যক্তিদের উত্থান এটাই প্রমাণ করে যে, পাকিস্তানে সামরিক বাহিনী কীভাবে বেসামরিক নেতৃত্বকে ‘ক্রমশই ম্লান করে দিচ্ছে’। তবে এতসব ছাপিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পাকিস্তান এখন ইরান-যুক্তরাষ্ট্র শান্তি আলোচনার আয়োজক হিসেবেই পরিচিত।

 

সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজের মতে, ইরানের সঙ্গে আসিম মুনিরের সম্পর্কের উন্নতি হয় ২০১৬ ও ২০১৭ সালের দিকে। সে সময় তিনি পাকিস্তানের সামরিক গোয়েন্দা বিভাগের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দায়িত্বরত অবস্থায় দেশটির সঙ্গে তলে তলে সম্পর্ক গড়ে তোলেন ফিল্ড মার্শাল মুনির।

 

তিনি ইরানের সামরিক শক্তির মূল হাতিয়ার খ্যাত আইআরজিসি (ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর) ও তাদের গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করেন। ২০২০ সালে আইআরজিসির কুদস ফোর্সের সাবেক কমান্ডার কাসেম সোলাইমানি ও ২০২৫ সালে ইসরায়েলি হামলায় নিহত কমান্ডার হোসেইন সালামির সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব ছিল। এমনটাই জানিয়েছেন পাকিস্তানের সাবেক জেনারেল আহমেদ সাঈদ।

 

তার মতে, মুনির ইরানের নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। এ ছাড়া গোয়েন্দা সম্প্রদায় ও আইআরজিসি সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছেন। আন্তর্জাতিকভাবে তিনি এমন একজন ব্যক্তিত্ব, যার ইরানের গোয়েন্দা মহলে, সামরিক নেতৃত্বের মধ্যে, কূটনৈতিক মহলে এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গেও ব্যক্তিগত যোগাযোগ ও সম্পর্ক রয়েছে।

 

ওয়াশিংটনভিত্তিক থিঙ্কট্যাঙ্ক ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিসের সিনিয়র ফেলো বিল রোগিও বলেছেন, ট্রাম্পের পাকিস্তানিদের বিশ্বাস করা উচিত নয়। আফগানিস্তানে পাকিস্তান ছিল বড় বাটপার ‘মিত্র’, যারা আমাদের বন্ধু সাজার ভান করে তালেবানদের সমর্থন জুগিয়েছে। আইআরজিসির সঙ্গে মুনিরের সম্পর্ক ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় সতর্কসংকেত হওয়া উচিত। এটা বিপজ্জনক।

 

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শান্তি চুক্তি নিশ্চিত করার জন্য শনিবার (১৮ এপ্রিল) তিন দিনের তেহরান সফর শেষ করেছেন মুনির। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, তেহরানে তিন দিনের সফরে তিনি ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব ও শান্তি আলোচকদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। তিনি দেশটির প্রেসিডেন্ট, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, সংসদ স্পিকার ও ইরানের সামরিক কেন্দ্রীয় কমান্ড কেন্দ্রের প্রধানের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। আগামী সপ্তাহে ইসলামাবাদে দুই দেশের মধ্যে দ্বিতীয় দফা আলোচনা অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।