দেশের অর্থনীতির সামগ্রিক অবকাঠামো বিনিয়োগবান্ধব নয়। একদিকে ঋণের উচ্চ সুদহার, অপরদিকে প্রতিযোগী দেশগুলোর কর অনেক বেশি। এক্ষেত্রে নানা রকম করের জাল বিস্তার করে রাখা হয়েছে। এছাড়াও গ্যাস, বিদ্যুৎসহ তীব্র জ্বালানি সংকট। এরপরও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। ফলে নতুন বিনিয়োগ তো দূরের কথা, ব্যবসায়ীদের টিকে থাকাই দায় হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে আগামী বাজেটে দেশের কর কাঠামোয় আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। ব্যবসায়ীদের সহজ শর্তে পুঁজির ব্যবস্থা করতে হবে।
রোববার রাজধানীর একটি হোটেলে মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) এবং ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) আয়োজিত প্রাক-বাজেট আলোচনায় শীর্ষ ব্যবসায়ীরা এসব কথা বলেন। তারা আরও বলেন, উচ্চ সুদহার, মুদ্রাস্ফীতি ও বৈদেশিক মুদ্রার চাপের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় বেসরকারি খাতকে সচল রাখতে একটি আধুনিক, স্বচ্ছ ও ব্যবসাবান্ধব কর কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।
আলোচনার বিষয় ছিল : ‘জাতীয় বাজেট ২০২৬-২০২৭ : বেসরকারি খাতের অগ্রাধিকার ও দৃষ্টিভঙ্গি।’ অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ, আইনজীবী স্নেহাশীষ বড়ুয়া, এমসিসিআই প্রেসিডেন্ট কামরান টি রহমান, ইআরএফের প্রেসিডেন্ট দৌলত আক্তার মালা ও এপেক্সের চেয়ারম্যান গোলাম মাইনুদ্দীনসহ বিভিন্ন শীর্ষ কোম্পানির প্রতিনিধিরা। এতে মূলপ্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আইসিএবির সাবেক সভাপতি মো. শাহাদাত হোসেন।
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, ব্যবসায়ীরা চায় হয়রানি কমাতে ‘রিস্ক-বেজড অডিট’ (ঝুঁকিভিত্তিক নিরীক্ষা) চালু। এটি চালু হলে ব্যবসায়ীদের ভোগান্তি ও হয়রানি কিছুটা কমবে। এছাড়াও বর্তমানে হাইকোর্টে করসংক্রান্ত মামলায় আগাম ২৫ শতাংশ পরিশোধ করতে হয়। এটি কমিয়ে ১০ শতাংশে আনতে হবে। উৎসে আয়করের হার যৌক্তিকীকরণ করতে হবে। এসব প্রস্তাব বাস্তবায়ন হলে রাজস্ব আহরণ বাড়বে। একই সঙ্গে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি প্রতিযোগিতামূলক ব্যবসায়িক পরিবেশ তৈরি হবে।
মো. শাহাদাত হোসেন বলেন, বর্তমানে দেশের কর-জিডিপি অনুপাত মাত্র সাড়ে ৬ থেকে ৭ দশমিক ৩ শতাংশ। এটি টেকসই উন্নয়নের জন্য পর্যাপ্ত নয়। কর ব্যবস্থায় আস্থা সংকট দূর করতে হবে। এক্ষেত্রে কর প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত হবে না। এজন্য কর ফাইল খোলায় সময়সীমা নির্ধারণ, অনুমাননির্ভর কর নির্ধারণ বন্ধ এবং কর সংক্রান্ত শুনানিতে ডিজিটাল পদ্ধতি চালু করতে হবে। তিনি বলেন, সরকারের আয়ের অন্যতম খাত মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ও কাস্টমস শুল্ক। ব্যবসায়ীদের জন্য এগুলো সহজ করতে হবে। তারমতে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতকে সহায়তা দিতে ভ্যাট সীমা বাড়ানো, কাস্টমস রিফান্ড প্রক্রিয়া অনলাইন ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সহজ করা এবং শিল্পে ব্যবহৃত যন্ত্রাংশে শুল্ক কাঠামোর সামঞ্জস্য আনতে হবে। ঘুস-দুর্নীতি বন্ধে অটোমেশন জরুরি। শাহাদাত হোসেন আরও বলেন, বর্তমানে দেশের মোট রাজস্বের প্রায় ৬৬ শতাংশই আসে পরোক্ষ কর থেকে। এর ফলে নিম্নআয়ের মানুষের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। এই নির্ভরতা কমিয়ে সরাসরি কর বাড়ানোর মাধ্যমে একটি ভারসাম্যপূর্ণ কর কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।
কামরান টি রহমান বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক ও দেশীয় অর্থনৈতিক বাস্তবতায় ব্যবসা পরিচালনা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, বিনিয়োগে স্থবিরতা, উচ্চ সুদহার ও ডলারের চাপ ব্যবসায়ীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এ পরিস্থিতিতে একটি সহায়ক বাজেট সময়ের দাবি। তিনি জানান, দেশে এক কোটির বেশি টিআইএন থাকলেও অর্ধেকের কম করদাতা রিটার্ন জমা দেন। এ অবস্থায় এনআইডি ও টিআইএন ডাটাবেজ একীভূত করতে হবে। পাশাপাশি নতুন করদাতাদের উৎসাহ দিতে প্রতীকী ন্যূনতম কর নির্ধারণ এবং মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে সহজ রিটার্ন দাখিলের ব্যবস্থা করতে হবে।
করপোরেট কর কমানোর সুবিধা অনেক প্রতিষ্ঠান পাচ্ছে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘নগদ লেনদেন’ সংক্রান্ত কঠোর শর্ত বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এই শর্ত বাতিলের পাশাপাশি তালিকাভুক্ত ও অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানির করহার আরও ২.৫ শতাংশ কমানো হলে বিনিয়োগ বাড়বে।
ইআরএফ সভাপতি দৌলত আকতার মালা বলেন, চলতি অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা রাজস্ব ঘাটতির আশঙ্কা রয়েছে। আগামী বাজেটে অতিরিক্ত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলে তা বিদ্যমান করদাতাদের ওপর চাপ বাড়াতে পারে এবং নতুন করদাতাদের নিরুৎসাহিত করতে পারে। তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিন ধরেও ভ্যাট সংগ্রহে ইলেকট্রনিক ফিসক্যাল ডিভাইস ব্যবহারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। ফলে অনানুষ্ঠানিক খাত থেকে সংগৃহীত করের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন রয়ে গেছে।