Image description

বৈশাখের তীব্র গরমে তেলের জন্য রাস্তায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা গতকালও ছিল আগের মতোই। দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর যারা তেলের নাগাল পেয়েছেন তাদের বাড়তি দামেই তা কিনতে হয়েছে। তবে দুর্ভোগ লাঘবে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) আজ থেকে সারা দেশে পাম্পে তেলের সরবরাহ বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিদ্যামন জ্বালানি সরবরাহের চেয়ে বাড়তি ২০ শতাংশ অকটেন এবং ১০ শতাংশ পেট্রোল ও ডিজেল সরবরাহের সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এতে করে তেলের সংকট অনেকটা কমে আসবে। মেঘনা পেট্রোলিয়াম কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহীরুল হাসান এ ব্যাপারে যুগান্তরকে বলেছেন, সরকারের নতুন নির্দেশনা এসেছে। সোমবার থেকে সব পেট্রোলপাম্প এবং সব ধরনের ডিলারকে আগের চেয়ে বাড়তি তেল দেওয়া হবে। বর্তমানে পদ্মা, মেঘনা এবং যমুনা অয়েল কোম্পানি প্রতিদিন গড়ে ডিজেল বিক্রি করে ১২ হাজার ৭৭৭ টন, পেট্রোল ১ হাজার ৪৯৬ টন, অকটেন ১ হাজার ১৯৩ টন এবং জেট ফুয়েল ১ হাজার ৫৪৭ টন।

রাজধানীর বিশ্বরোড এলাকার পেট্রোলপাম্প পিনাকল এনার্জির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুশ শাকুর গতকাল যুগান্তরকে বলেছেন, চাহিদা অনুযায়ী তেল দিচ্ছে না বিতরণ কোম্পানিগুলো। দুই ভাউচার তেলের টাকা দিয়েও রোববার পাওয়া গেছে এক ভাউচার অকটেন। যা রাত ৮টার মধ্যে শেষ হয়ে যাবে। তিনি বলেন, সরকার ৩-৪ দিন চাহিদামতো তেল দিলে সংকট অনেকটা কেটে যেত। মেঘনা পেট্রোলিয়ামের এমডি শাহীরুল হাসান বলেছেন, ২০ ভাগ অকটেন এবং পেট্রোল ও ডিজেল ১০ ভাগ বেশি সরবরাহ করা হলে সংকট কেটে যাবে।

এদিকে, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তেলের দাম বৃদ্ধি নিয়ে সমালোচনা করছে। তবে বিপিসির হিসাব অনুযায়ী রোববার থেকে তেলের দাম বাড়ানোর ফলে সরকারের বাড়তি আয় হবে মাসে ৭৭৩ কোটি টাকা। এরপরও বিপিসির লোকসানের বোঝা হালকা হবে না। কারণ বাড়তি দামের পরও মাসে বিপিসিকে লোকসান দিতে হবে ১ হাজার ৮৯১ কোটি টাকা। শনিবার রাতে সরকার ডিজেল প্রতি লিটার ১০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১১২ টাকা থেকে ১৩০ টাকা, অকটেন ১২০ টাকা থেকে ১৪০ টাকা এবং পেট্রোল ১১৬ টাকা থেকে ১৩৫ টাকা নির্ধারণ করে। বিপিসি সরকারকে জানিয়েছে, ডিজেল বিপিসিকে কিনতে হয়েছে প্রতি লিটার ১৫৫ দশমিক ৪৬ টাকা, অকটেন ১৪৮ দশমিক ৯৩ টাকা এবং পেট্রোল ১৪৪ দশমিক ৯৩ টাকা। এপ্রিলে এই দাম আরও বেশি। শীর্ষ পর্যায়ের সূত্র থেকে জানা গেছে, ৮ এপ্রিল অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ, জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য রহমান অমিত, জ্বালানি সচিব সাইফুল ইসলামসহ শীর্ষ কর্মকর্তাদের এক বৈঠক হয়। সেখানে সিদ্ধান্ত হয়েছিল যথা শিগগির সম্ভব তেলের দাম বৃদ্ধি করা হবে। সেই সিদ্ধান্ত নানা দিক বিবেচনা করে কার্যকর করা হয়েছে ১৯ এপ্রিল থেকে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিপিসি গত অর্থবছরে ৪ হাজার ২০০ কোটি টাকা লাভ করেছে। আগের বছরে লাভ করেছে ৪ হাজার কোটি টাকা। আর তেল বিক্রি করে তিন বিতরণ কোম্পানি পদ্মা, মেঘনা এবং যমুনা প্রতিবছর লাভ করে দেড় হাজার কোটি টাকার মতো (তিন কোম্পানি মিলে)। শুধু তাই নয়, ওই তিন কোম্পানির স্টাফরা প্রতিবছর লভ্যাংশের বোনাস নেন ৬ লাখ টাকা থেকে ১৬ লাখ টাকা পর্যন্ত। এরপরও তেলের দাম কেন বাড়ানো হলো তা নিয়ে অনেকে প্রশ্ন করেছেন।

বিশেষ করে হঠাৎ করে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ায় তেলের আমদানি নিয়ে আবারও চিন্তিত বিপিসি। এই প্রেক্ষাপটে পাম্প এবং ডিলারদের চাহিদামতো তেল সরবরাহ করতে পারছে না সরকারি এ প্রতিষ্ঠান। শনিবার থেকে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। চলতি সপ্তাহে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় দফা সমাঝোতা বৈঠক হতে পারে ইসলামাবাদে। যদিও এ ব্যাপারে চূড়ান্ত কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি। জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সমাঝোতা হয়ে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বন্ধ না হলে সমূহ বিপদ বাংলাদেশের জন্য। তখন বিশ্ববাজার থেকে তেল পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়বে। তবে সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে কোনো ভাবে হলেও তেলের মজুত ৯০ দিন পর্যন্ত করা হবে। এজন্য বিআরটিসি, চট্টগ্রাম বন্দর, বিদ্যুৎ বিভাগসহ বিভিন্ন বিভাগের ট্যাংক খালি করা হচ্ছে। সেখানে জ্বালানি তেল রাখার জন্য ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বিপিসিকে। সরকারি কর্মকর্তারা জানান, বিভিন্ন উৎস থেকে তেল সংগ্রহের চেষ্টা হচ্ছে। এজন্য বিপিসির তেলের আমদানিতে কিছুটা পরিবর্তন আনা হয়েছে। একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, বিপিসির তেল আমদানিতে স্বচ্ছতা আনতে এলএনজি ক্রয়ের মতো চাহিদামতো দরপত্র করা হবে। যাতে করে তেলের দাম প্রতিযোগিতামূলক দামে পাওয়া যায়।