দীর্ঘ ১২ ঘণ্টার উত্তপ্ত বিতর্কের পর ইসরায়েলি পার্লামেন্ট ‘নেসেট’-এ একটি অত্যন্ত বিতর্কিত আইন পাস হয়েছে। নতুন এই আইনে সামরিক আদালতে ‘প্রাণঘাতী সন্ত্রাসী হামলা’র দায়ে দোষী সাব্যস্ত পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিদের জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
নেসেটে ৬২-৪৭ ভোটে পাস হওয়া এই আইন অনুযায়ী, দোষী সাব্যস্ত ফিলিস্তিনিদের জন্য ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড হবে একমাত্র শাস্তি। যদিও বিশেষ পরিস্থিতিতে বিচারকরা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সুযোগ পাবেন। তবে সাধারণত ফাঁসির দণ্ড বাধ্যতামূলক থাকবে এবং রায় ঘোষণার ৯০ দিনের মধ্যে সেটা কার্যকর করতে হবে।
এই আইনে আপিলের কোনো সুযোগ রাখা হয়নি এবং বিচারকদের প্যানেলে সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের পরিবর্তে কেবল সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেই এই দণ্ড দেওয়া যাবে।
এই ভোটকে ডানপন্থি জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতমার বেন গেভিরের বড় রাজনৈতিক জয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। তার দল এই আইন দীর্ঘদিন ধরে সমর্থন করে আসছিল। আইন পাসের পর প্রায় ১২ ঘণ্টার বিতর্ক শেষে তিনি উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। আইনটি পাস হওয়ার পর সংসদ কক্ষে শ্যাম্পেন নিয়ে উদযাপন করতে দেখা যায়।
বেন-গেভির বলেন, এটি ভুক্তভোগীদের জন্য ন্যায়বিচারের দিন ও শত্রুদের জন্য সতর্কবার্তার দিন। সন্ত্রাসীদের জন্য আর কোনো সুযোগ থাকবে না। যে সন্ত্রাস বেছে নেবে, সে মৃত্যুকেই বেছে নেবে।
আইনটি অতীতের ঘটনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। এই আইন শুধুমাত্র ফিলিস্তিনিদের ওপর প্রযোজ্য হবে। কারণ, তারা সামরিক আদালতে বিচারাধীন হন। ইসরায়েলি নাগরিকদের বিচার বেসামরিক আদালতে হয়।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আগে কিছু আপত্তি জানিয়েছিলেন, শেষ পর্যন্ত এই আইনের পক্ষে ভোট দেন। এই আইন প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা এমপি লিমোর সন হার-মেলেখ বলেন, এটি সত্যিকারের ইহুদি নৈতিকতার প্রতিফলন। তার স্বামী ২০০৩ সালের এক হামলায় নিহত হয়েছিলেন।
আইনটি পাস হওয়ার পর বিরোধী দলসহ মানবাধিকার সংগঠনগুলো তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। বিরোধী নেতা ইয়ার লাপিদের দলসহ কয়েকটি দল এটিকে ‘অনৈতিক আইন’ বলে আখ্যা দিয়েছে।
সমালোচকদের মতে, এটি আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থি, ইসরায়েলের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং এই আইনের ফলে সহিংসতা কমানোর বদলে বাড়াতে পারে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, এই আইন ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক এবং এটি প্রাতিষ্ঠানিক বর্ণবাদের ইঙ্গিত বহন করে।
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ এই আইনকে বিপজ্জনক বলে আখ্যা দিয়েছে। এদিকে জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি ও যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা ভোটের আগে ইসরায়েলকে এই আইন পাস না করার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
তবে যুক্তরাষ্ট্র এ বিষয়ে সরাসরি নিন্দা জানায়নি। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, নিজস্ব আইন প্রণয়নের অধিকার ইসরায়েলের রয়েছে, তবে তা ন্যায়বিচার প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বাস্তবায়ন করা উচিত।
ইসরায়েলের ইতিহাসে ১৯৬২ সালে নাৎসি যুদ্ধাপরাধী অ্যাডলফ আইখম্যানের পর আর কারো মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়নি। নতুন এই আইনের ফলে কয়েক দশক পর ইসরায়েলে আবারও মৃত্যুদণ্ড প্রথা ফিরে আসতে যাচ্ছে।
মানবাধিকার সংস্থা অ্যামেনিস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বে ৫৪টি দেশে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর রয়েছে, তবে ১১৩টি দেশ সব ধরনের অপরাধের জন্য এটি বাতিল করেছে।
সূত্র: আল-জাজিরা