Image description

‘যদি আমরা মেরিন এবং ৮২তম এয়ারবর্ন নিয়ে একটি প্রচলিত স্থল অভিযান চালাই, তাহলে এটি একটি স্থলযুদ্ধ। এ ক্ষেত্রে আমি মনে করি, কংগ্রেসের অনুমোদন থাকা উচিত এবং আমাদের আরও বিস্তারিত জানানো উচিত’— ইরানে স্থল অভিযান চালাতে পেন্টাগনের প্রস্তুতির প্রতিক্রিয়ায় এ কথা বলেছেন মার্কিন আইনপ্রণেতা এবং রিপাবলিকান নেতা ন্যান্সি মেস।

ন্যান্সি মেসের এই অবস্থান ইরান যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টির ভেতর বিভাজনের চিত্র ফুটে উঠেছে। ইরানের বিরুদ্ধে এক মাস আকাশযুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পর ট্রাম্প এখন স্থল অভিযানের কথা ভাবছেন বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে।

গত রোববার সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ন্যান্সি মেস বলেন, ‘আমরা যুদ্ধের ময়দানে সেনা মোতায়েন দেখতে চাই না। আমার মনে হয়, বহু মানুষ এটাই চান। যদি আমরা এটাই করতে চলেছি, তবে কংগ্রেসে আসুন এবং সেটা করার জন্য যথাযথ অনুমোদন নিন।’

ইরানে স্থল অভিযান চালানোর প্রস্তুতিতে এরই মধ্যে কয়েক হাজার মার্কিন সেনা মধ্যপ্রাচ্যে সমবেত হয়েছে, যা এই সংঘাতের নতুন এবং আরও বিপজ্জনক ধাপে প্রবেশের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

পেন্টাগনের স্থল অভিযান চালানোর প্রস্তুতির খবর প্রকাশের পর যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকজন আইনপ্রণেতা প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন।

ট্রাম্পের নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির সিনেটর জেমস ল্যাঙ্কফোর্ড এনবিসি চ্যানেলের ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে ইরানে সম্ভাব্য স্থল অভিযানে সমর্থন দেওয়ার বিষয়টি সরাসরি নাকচ করেননি।

ল্যাঙ্কফোর্ড সিনেটের গোয়েন্দা কমিটির সদস্য। তিনি মনে করেন, কাজ শুরু করার পর তা শেষ করাও গুরুত্বপূর্ণ। এ–ও জানা দরকার যে মাঠে ঠিক কাদের পাঠানো হচ্ছে।

ল্যাঙ্কফোর্ড বলেন, ‘যদি এটি বিশেষ বাহিনী হয়, যাদের কোনো নির্দিষ্ট অভিযান সম্পন্ন করতে পাঠানো হচ্ছে, যারা ঢুকবে, কাজ শেষ করবে এবং বেরিয়ে আসবে—তাহলে এটি দীর্ঘমেয়াদি দখলের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। সবচেয়ে খারাপ বিষয় হতে পারে, এ ধরনের সংঘাত শুরু করা এবং পরে তা শেষ করতে না পারা—অসম্পূর্ণ অবস্থায় রেখে দেওয়া।’

‘আমাদের এটা শেষ করার সক্ষমতা থাকতে হবে,’ যোগ করেন ল্যাঙ্কফোর্ড।

ওয়াশিংটন পোস্টের খবর অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনী এবং পদাতিক সৈন্যরা ইরানে সীমিত আকারে স্থল অভিযান চালাবে। ডোনাল্ড ট্রাম্প পেন্টাগনের এ ধরনের পরিকল্পনায় অনুমোদন দেবেন কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

তবে ইউএসএস ট্রিপোলি যুদ্ধজাহাজের নেতৃত্বে একটি ইউনিটের অংশ হিসেবে গতকাল রোববার আরও ৩ হাজার ৫০০ মার্কিন সেনা ও মেরিন মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছেছে। এই সামরিক মোতায়েনের মধ্যে আক্রমণ ও পরিবহন সক্ষমতাও অন্তর্ভুক্ত।

মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিতে সাধারণত ৫০ হাজারের মতো মার্কিন সেনা অবস্থান করে।

রোববারের অনুষ্ঠানে ল্যাঙ্কফোর্ডকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, ইরানে মার্কিন সেনা মোতায়েন করতে প্রেসিডেন্টের কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন কি না। ল্যাঙ্কফোর্ড সরাসরি উত্তর দেওয়া এড়িয়ে গিয়ে বলেন, কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটি তার ওপর নির্ভর করে।

ল্যাঙ্কফোর্ড আরও বলেন, ‘যদি আমরা দীর্ঘমেয়াদি কোনো যুদ্ধের দিকে ফিরে তাকাই, যেমনটা ইরাক বা আফগানিস্তানে ঘটেছিল, তবে এর উত্তর—হ্যাঁ। আর যদি তা মার্কিনদের রক্ষা করার জন্য এবং এটা নিশ্চিত হওয়া যায় যে আমরা একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সেখানে থাকব, আমাদের কাজ শেষ করব এবং বের হয়ে আসব, তাহলে এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। তাই আবারও বলছি, এটি সম্পূর্ণরূপে পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল।’

ওয়াশিংটন পোস্টের ওই খবর প্রকাশের পর এর জবাবে হোয়াইট হাউসের প্রেস সচিব ক্যারোলিন লেভিট বলেন, ‘সেনাপ্রধানের সামনে সর্বোচ্চ বিকল্প রাখতে প্রস্তুতি নেওয়াই পেন্টাগনের কাজ। এর অর্থ এই নয় যে প্রেসিডেন্ট কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন।’

ট্রাম্প এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে ইরানে মার্কিন সেনা মোতায়েনে অনুমোদন বা সমর্থন দেননি। তবে তিনি বারবার বলেছেন, তিনি সব ধরনের বিকল্প খোলা রেখেছেন।

জানা গেছে, পেন্টাগন তাদের এক লাখ কোটি বার্ষিক যুদ্ধ ব্যয়ের ওপর আরও ২০ হাজার কোটি ডলার বাড়তি তহবিল বরাদ্দ চেয়েছে। ট্রাম্প বলেছেন, অনেক কারণে অতিরিক্ত তহবিলের অনুরোধ করা হচ্ছে। ‘এমনকি আমরা ইরান নিয়ে যা আলোচনা করছি, তার চেয়ে বেশি কারণ আছে,’ বলেছেন তিনি।

ইরান যুদ্ধ নিয়ে রোববার মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা স্টিভ স্ক্যালিস বলেন, ট্রাম্প প্রশাসন এ যুদ্ধে তাদের লক্ষ্যগুলো অর্জন করছে।

এবিসি নিউজকে স্টিভ স্ক্যালিস বলেন, ‘পুরো বিশ্বের জানা আছে, ইরান যদি পারমাণবিক অস্ত্র হাতে পায়, পুরো বিশ্বের জন্য তারা কতটা বিপজ্জনক হয়ে উঠবে।’

স্টিভ স্ক্যালিস বলেন, ‘এখনই ইরান যা করছে, শুধু সেটা দেখুন। শুধু ইসরায়েল নয়, বরং তাদের আশপাশে থাকা অন্যান্য আরব দেশ ইরানের বিরুদ্ধে। ইরান যে বিপদ তৈরি করছে, তা বিবেচনা করে তারা আসলে এক জোট হয়েছে।’

ইরান যুদ্ধ আরও বিপজ্জনক পর্যায়ে প্রবেশের ইঙ্গিত পাওয়ার পর ডেমোক্র্যাটরাও প্রতিক্রিয়া দেখাতে শুরু করেছেন।

রোববার ডেমোক্রেটিক সিনেটর কোরি বুকার বলেন, ‘ট্রাম্প প্রশাসন আমাদের এমন এক পরিস্থিতির মধ্যে ফেলে দিয়েছে, যেটি ভবিষ্যতে আমাদের সময়ে করা সবচেয়ে বড় ভুল, প্রেসিডেন্টের সবচেয়ে বড় ভুল সিদ্ধান্তগুলোর একটি বলে বিবেচিত হবে।’

নিউ জার্সির এই সিনেটর আরও বলেন, ‘কংগ্রেসের অনুমোদন না নিয়ে ট্রাম্প আমাদের এমন একটি সংঘাতের গভীর থেকে আরও গভীরে ঠেলে দিচ্ছেন, যার কোনো সম্ভাব্য সমাধান দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না এবং হাজার হাজার অতিরিক্ত সৈন্য ওই অঞ্চলে পাঠানো হচ্ছে।’

কোরি বুকার মনে করেন, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের এ সামরিক সংযোগ ‘স্পষ্টতই শুধু যুদ্ধ নয়, বরং এটি আফগানিস্তানের যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক সংঘাত’। তিনি এ যুদ্ধের পরিকল্পনা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।

বুকার বলেন, ‘এই সমস্যা শুরু থেকেই। ট্রাম্প আমাদের কাছে, মার্কিন জনগণের কাছে বা ওই অঞ্চলের কৌশলগত মিত্রদের কাছে এ সংঘাত নিয়ে তাঁর যুক্তি তুলে ধরেননি।’

মেরিল্যান্ডের সিনেটর ক্রিস ভ্যান হোলেন এ সপ্তাহে এবিসিকে বলেন, তিনি আশা করছেন, পেন্টাগনের অতিরিক্ত বাজেট অনুরোধ কংগ্রেসে পাস হবে না।

ভ্যান হোলেন বলেন, ‘আমার মনে হয় না, আমাদের এমন একটি অবৈধ, ইচ্ছাকৃত যুদ্ধে আরও অর্থ প্রদান করা উচিত হবে। এমন একজন প্রেসিডেন্ট এ যুদ্ধ বেছে নিয়েছেন, যিনি নির্বাচনের সময় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন করে যুদ্ধে জড়াবেন না—বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে। এই যুদ্ধ এখন আমাদের আরও নিরাপদ না করে বরং আরও অনিরাপদ করে তুলেছে, এরই মধ্যে কয়েকজন মার্কিন প্রাণ হারিয়েছেন, প্রতিদিন এ জন্য বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ হচ্ছে এবং তেল ও গ্যাসের দাম বাড়ছে।’

ভ্যান হোলেন আরও বলেন, ‘একজন প্রেসিডেন্ট, যিনি নির্বাচনে দাম কমানো এবং বিদেশি যুদ্ধ শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, এখন প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সঙ্গে মিলে বিদেশি যুদ্ধ শুরু করেছেন এবং দৈনন্দিন জিনিসের দাম আকাশছোঁয়া হয়ে যাচ্ছে। তাই আমাদের এমন একটি অবৈধ, ইচ্ছাকৃত যুদ্ধে অর্থায়ন চালিয়ে যাওয়া উচিত নয়, যা আমাদের নিরাপত্তাকে আরও দুর্বল করছে।’