Image description

টানা বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর ইরানে এবার স্থল অভিযানের ছক কষছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল। তবে স্থল অভিযানের ধরনটি হতে পারে সীমিত এবং নির্দিষ্ট স্থানকেন্দ্রিক। হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিতে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খার্গ দ্বীপ দখলের পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে ইসরায়েলও ইরানের বিশেষ কিছু এলাকায় সেনা পাঠানোর চিন্তা করছে।

এ ধরনের ঘটনা দেখা যেতে পারে আগামী মাস, অর্থাৎ এপ্রিলের শেষ ভাগে।   

 

অ্যাক্সিওসের এক প্রতিবেদনে শুক্রবার (২০ মার্চ) দাবি করা হয়, ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের খার্গ দ্বীপ দখল বা অবরোধ করার জন্য আমেরিকান সেনাদের নির্দেশ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছেন। অন্যদিকে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও স্থলবাহিনী নামানোর ইঙ্গিত দিয়ে বলেছেন, ইরানি শাসনব্যবস্থা ভেঙে দিতে একটি ‘স্থল উপাদান’ থাকা প্রয়োজন।

ট্রাম্পের মনোভাব সম্পর্কে অবগত চারটি সূত্র অ্যাক্সিওসকে জানায়, খার্গ দ্বীপ দখল বা অবরোধ করার পরিকল্পনা নিয়ে হোয়াইট হাউসে বেশ কয়েক দফা আলোচনা হয়েছে।

ইরান উপকূল থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে উত্তর পারস্য উপসাগরের ছোট এই প্রবাল দ্বীপ দেশটির তেল শিল্পের মূল ভিত্তি। ইরানের অপরিশোধিত তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশ এই দ্বীপের মাধ্যমে হয়ে থাকে। সেখান থেকে তেলের ট্যাংকারের বেশিরভাগ হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করে বিশ্বের বিভিন্ন গন্তব্যে যাত্রা করে। 

 

ইরান সম্প্রতি হরমুজ প্রণালি দিয়ে নৌযান চলাচল নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি দুই ডজনের বেশি তেলের ট্যাংকারে হামলা চালায়।

এর জেরে প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে, যার প্রভাবে বিশ্ববাজারে লাফিয়ে বাড়ছে তেলের দাম। 

 

অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্প প্রশাসন হরমুজ প্রণালি খুলতে ইরানকে চাপ দেওয়ার জন্য খার্গ দ্বীপ দখল বা অবরোধের পরিকল্পনা করছে। কারণ এই প্রণালিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ ভাঙতে না পারলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজস্ব শর্ত অনুযায়ী যুদ্ধ শেষ করতে পারবেন না। 

তবে নানা ঝুঁকি বিবেচনায় এখনই স্থল অভিযান শুরুর পক্ষে নয় ওয়াশিংটন। সূত্র বলছে, সামনের কিছু দিন বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে হরমুজ প্রণালির আশপাশে ইরানের সামরিক সক্ষমতা আরো দুর্বল করা হবে।

এরপর খার্গ দখলের জন্য সরাসরি সেনা অভিযান চালানো হতে পারে।
 
হোয়াইট হাউস সম্পর্কিত এক কর্মকর্তা অ্যাক্সিওসকে বলেন, ‘ইরানিদের আরো দুর্বল করতে আমাদের প্রায় এক মাস হামলা চালাতে হবে, তারপর দ্বীপটি দখলের মাধ্যমে তাদের পুরোপুরি চাপে ফেলে সমঝোতায় আসতে বাধ্য করা হবে।’

 

আমেরিকা গত সপ্তাহের শেষে মধ্যপ্রাচ্যে পাঁচ হাজার মেরিন ও নৌসেনা মোতায়েনের ঘোষণা দেয়। পাশাপাশি উভচর যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস ট্রিপোলিকে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হয়েছে। এসব পদক্ষেপকে স্থল অভিযানের প্রস্তুতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। 

আমেরিকান এক কর্মকর্তা জানান, খার্গ দ্বীপে স্থল অভিযান অনুমোদন পেলে আরো বেশি সেনার প্রয়োজন হবে। তিনটি মেরিন ইউনিট ইতিমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের পথে আছে। হোয়াইট হাউস ও পেন্টাগন শিগগির আরো সেনা পাঠানোর কথা বিবেচনা করছে। 

হোয়াইট হাউসের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা অ্যাক্সিওসকে বলেন, ‘তিনি (ট্রাম্প) হরমুজ প্রণালি খুলতে চান। এটা করতে যদি খার্গ দ্বীপ দখল করতে হয়, তাহলে তা-ই করা হবে। এমনকি উপকূলে আক্রমণের সিদ্ধান্ত নিলে সেটাও করা হবে। তবে এখনো সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয়নি।’

সম্ভাব্য স্থল অভিযানের ইঙ্গিত দিয়ে আরেক কর্মকর্তা বলেন, ‘আমাদের প্রত্যেক প্রেসিডেন্টের আমলে বৈশ্বিক সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের স্থলসেনা ছিল, ট্রাম্পের আমলেও আছে। এখন প্রেসিডেন্ট যা সঠিক মনে করবেন সেটাই করবেন।’

অন্যদিকে সেনেট ইন্টেলিজেন্স কমিটির চেয়ারম্যান সেনেটর টম কটন বলেন, ‘স্থল অভিযানের সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ না করে ট্রাম্প বিবেচনাপ্রসূত কাজ করেছেন। হরমুজ প্রণালি বন্ধ করা ইরানের মরিয়া পদক্ষেপ, তবে এমন পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য ট্রাম্পের কাছে অসংখ্য পরিকল্পনা রয়েছে।’

অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ট্রাম্প মূলত মার্চের শেষ দিকে চীন সফরের আগেই যুদ্ধ শেষ করতে চেয়েছিলেন। তবে হরমুজ প্রণালি সংকট তাকে বেইজিং সফর স্থগিত করতে বাধ্য করেছে। পাশাপাশি পরিকল্পনার চেয়ে বেশি সময় ধরে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হচ্ছে। 

আমেরিকান বাহিনী গত ১৩ মার্চ খার্গ দ্বীপের ডজনখানেক সামরিক লক্ষ্যে ব্যাপক বিমান হামলা চালায়। দেশটির কর্মকর্তারা জানান, ওই হামলা ছিল ইরানকে প্রণালি খুলে দিতে রাজি করানোর জন্য একটি ‘সতর্ক সংকেত’। তবে একইসঙ্গে দ্বীপটিতে ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করা এবং সম্ভাব্য স্থল অভিযানের ভিত্তি তৈরির প্রস্তুতির অংশও ছিল ওই বিমান হামলা। 

বিষয়টি নিয়ে গত বৃহস্পতিবার ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা যখনই চাই দ্বীপটি ধ্বংস করে দিতে পারি। আমি এটিকে বলি ছোট্ট একটি দ্বীপ, যা পুরোপুরি অরক্ষিত পড়ে আছে। আমরা পাইপলাইন ছাড়া সবকিছু ধ্বংস করেছি। পাইপগুলো রেখে দিয়েছি, কারণ সেগুলো পুনঃস্থাপন করতে তাদের (ইরান) বছরের পর বছর লেগে যাবে।’ 

যুক্তরাষ্ট্র কোথাও সেনা পাঠাচ্ছে না বলে সাংবাদিকদের সামনে দাবি করেন ট্রাম্প। তবে একইসঙ্গে বলেন, ‘যদি পাঠাতাম, তাহলে অবশ্যই আপনাদের বলতাম না।’

একটি সূত্র জানায়, সম্ভাব্য স্থল অভিযানের বৈধতা নিয়ে মতামত দিতে পেন্টাগনের আইনজীবীদের সঙ্গেও পরামর্শ করেছে হোয়াইট হাউস। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র খার্গ দ্বীপ দখল করলেই তেহরান ট্রাম্পের শর্ত মেনে সমঝোতার টেবিলে বসে পড়বে- এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। দ্বীপটি ইরানের তেল শিল্পের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও তেহরান অন্য কৌশল নিতে পারে। 

অবসরপ্রাপ্ত রিয়ার অ্যাডমিরাল মার্ক মন্টগোমারি অ্যাক্সিওসকে জানান, সম্ভাব্য লাভের বিষয়টি অনিশ্চিত হওয়ায় এ ধরনের মিশন আমেরিকান সেনাদের অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।

তিনি বলেন, ‘আমরা খার্গ দ্বীপ দখল করলে ইরান অন্য কোনো প্রান্ত থেকে তেলের প্রবাহ বন্ধ করে দেবে। কারণ তাদের তেলের উৎপাদন আমরা নিয়ন্ত্রণ করি না।’

মন্টগোমারি মনে করেন, ইরানের সামরিক সক্ষমতা আরো দুর্বল করতে যুক্তরাষ্ট্র আরো প্রায় দুই সপ্তাহ বিমান হামলা চালাতে পারে। এরপর সম্ভবত হরমুজ প্রণালিতে ট্যাঙ্কারের নিরাপত্তা দিতে ডেস্ট্রয়ার ও যুদ্ধবিমান পাঠাবে। তেমন কিছু হলে স্থল অভিযানের প্রয়োজন নাও হতে পারে।

এদিকে, দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, ইরানের নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলে ইসরায়েলও স্থল অভিযানের পরিকল্পনা করছে। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে সেনা অভিযানের সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেন। তিনি দাবি করেন, ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী এমন পরিস্থিতি তৈরির জন্য কাজ করছে, যাতে ইরানিরা সহজে তাদের শাসকগোষ্ঠীকে উৎখাত করতে পারে।

এ প্রশ্নের জবাবে নেতানিয়াহু বলেন,  ‘আকাশ থেকে অনেক কিছু করা যায় এবং আমরা তা করছি। তবে এ ধরনের অভিযানে একটি স্থল উপাদানও থাকতে হবে। এই স্থল উপাদানের অনেক সম্ভাবনা রয়েছে। আমি সেসব সম্ভাবনা আপনাদের কাছে প্রকাশ করতে চাই না।’

ইরানের বর্তমান শাসকগোষ্ঠীকে শেষ পর্যন্ত উৎখাত করা যাবে কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে নেতানিয়াহু সরাসরি কোনো জবাব দেননি। তিনি বলেন, “হ্যাঁ, শাসনব্যবস্থা পরিবর্তিত হতে পারে। তবে এটি কি নিশ্চিত? আমার উত্তর হলো- ‘না’। এখন পর্যন্ত, আমরা যে পরিস্থিতি তৈরি করছি- তা হলো শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করছি। এই পরিস্থিতিকে চূড়ান্তভাবে কাজে লাগানোর বিষয়টি ইরানি জনগণের ওপর নির্ভর করছে।” 

ইরানে স্থল অভিযান শুরু হলে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির আরো অবনতির আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে খার্গ দ্বীপ দখল করার প্রভাব হতে পারে ভয়াবহ।

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সাবেক কমান্ডার জেনারেল ফ্রাঙ্ক ম্যাকেঞ্জি ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে বলেন, খার্গ দ্বীপের তেল অবকাঠামো ধ্বংস করা হলে ‘ইরানের অর্থনীতি এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির অপূরণীয় ক্ষতি হবে।’

ম্যাকেঞ্জি বলেন, তেল অবকাঠামো ধ্বংস করার পরিবর্তে দ্বীপটিকে দখলের পর ইরানের সঙ্গে দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। সেটি করলে ট্রাম্প ‘বিশ্ব অর্থনীতির স্থায়ী ক্ষতি’র পথ এড়াতে পারবেন। সেক্ষেত্রে সামরিক অভিযানটি সমুদ্রপথে পরিচালিত হতে পারে। ইউএসএস ট্রিপোলি থেকে তীরে মেরিন ও যুদ্ধসরঞ্জাম পৌঁছানো যেতে পারে। অথবা এফ-৩৫বি বিমান ও হেলিকপ্টারের মাধ্যমে দ্বীপে অবতরণ করতে পারে মেরিন সেনারা।