Image description

রাজধানীর স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাজেদা বেগমের বিরুদ্ধ প্রশাসনিক অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিয়োগ বাণিজ্যসহ কোটি টাকার তছরুপের অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া অভিযোগ অনুযায়ী, জন্মতারিখ জালিয়াতি করে মাত্র ১৩ বছর ৮ মাস বয়সে এসএসসি পাস করেছেন মাজেদা বেগম। শুধু তাই নয়, বিধি লঙ্ঘন করে শিক্ষক নিয়োগ এবং ক্যান্টিন ইজারার মাধ্যমে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগ খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।

গত বছরের ২৭ নভেম্বর শিক্ষা উপদেষ্টা বরাবর ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাজেদা বেগমের নানা অনিয়মের প্রতিকার চেয়ে অভিযোগ জমা দেন আবুল হাসনাত কবীর নামে এক ব্যক্তি। তিনি ‘ম্যাথ ইজ গেম’ নামক শিক্ষাবিষয়ক অনলাইন প্ল্যাটফর্মের প্রতিষ্ঠাতা এবং সিইও। এছাড়া ‘ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ অল ব্রাঞ্চেস’ নামক ফেসবুক গ্রুপের এডমিনও তিনি।

যদিও আবুল হাসনাত কবীরের দাখিলকৃত সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাজেদা বেগম। দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে তিনি বলেন, ‘জন্মতারিখ জালিয়াতির কোনো ঘটনা ঘটেনি। সবগুলো কাগজপত্র ঠিক আছে। এছাড়া আর্থিক কেলেঙ্কারি ও শিক্ষক নিয়োগের যে অভিযোগ করা হয়েছে সেটিও ভিত্তিহীন। বিষয়গুলো নিয়ে তদন্ত চলছে। তদন্তাধীন কোনো বিষয়ে আমি আর মন্তব্য করতে পারব না।’

মাজেদা বেগমের সনদপত্র, এমপিও শিট এবং জাতীয় পরিচয়পত্রে জন্মতারিখে অসামঞ্জস্যতা রয়েছে। সর্বশেষ ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে জাতীয় পরিচয়পত্রে তিনি জন্মতারিখ সংশোধন করেছেন। যা সরকারি প্রজ্ঞাপন (১৫ মে ২০২৪) অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা হওয়া অভিযোগ অনুযায়ী, কোনো প্রতিষ্ঠানে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নিয়োগের এখতিয়ার গভর্নিং বডির হলেও মাজেদা বেগমকে শিক্ষা বোর্ড থেকে বিধিবহির্ভূতভাবে সরাসরি এ পদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এই নিয়োগ সংক্রান্ত সভাটি জরুরি সভা হিসেবে দেখানো হলেও সেখানে গভর্নিং বডির সব সদস্য উপস্থিত ছিলেন না। সভায় দুইজন সদস্য এবং তিনজিন ‘অবৈধ সদস্য’ উপস্থিত ছিলেন। শুধু এখানেই শেষ নয়, নিজের নিয়োগের অনুমোদনের চিঠিতে সভাপতির স্বাক্ষরের জায়গায় নিজেই স্বাক্ষর করেছেন তিনি।

অভিযোগে বলা হয়েছে, ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ পদ বাগিয়ে নিতে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়েছেন তিনি। এছাড়া বিপুল অঙ্কের আর্থিক লেনদের মাধ্যমে এ পদটিতে আসীন হয়েছেন মাজেদা বেগম। তবে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হওয়ার আগে ভিকারুননিসায় খণ্ডকালীন ডেমোনস্ট্রেটর হিসেবে যোগদান করেছিলেন। পরবর্তীতে কোনো বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই পূর্ণকালীন, প্রভাষক পদে পদোন্নতি পান। এমনকি তার বিষয়ে একজন এমপিওভুক্ত শিক্ষক থাকা সত্ত্বেও তিনি এমপিওভুক্ত হয়; যা নিয়োগবিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। 

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাজেদা বেগম তার জন্মতারিখ জালিয়াতি করেছেন তিনি। নথিপত্র অনুযায়ী মাজেদা বেগম মাত্র ১৩ বছর ৮ মাস বয়সে এসএসসি পাস করেছেন। তবে বর্তমান নীতিমালা অনুযায়ী ১৬ বছরের নিচে এসএসসি পরীক্ষা দেওয়া যায় না। পূর্বে যা ১৪ বছর ছিল। জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে তিনি এ কাজ করেছেন বলে অভিযোগ। চাকরির মেয়াদ দীর্ঘায়িত করতেই এমন অভিনব প্রতারণা করেছেন মাজেদা বেগম বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো।

মাজেদা বেগমের সনদপত্র, এমপিও শিট এবং জাতীয় পরিচয়পত্রে জন্মতারিখে অসামঞ্জস্যতা রয়েছে। সর্বশেষ ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে জাতীয় পরিচয়পত্রে তিনি জন্মতারিখ সংশোধন করেছেন। যা সরকারি প্রজ্ঞাপন (১৫ মে ২০২৪) অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে।

‘স্কুলে পরিচ্ছন্ন বাথরুম, বিশুদ্ধ পানি ও পর্যাপ্ত ফ্যানের ব্যবস্থা নেই। অথচ অন্যান্য খাতে বিপুল অর্থ ব্যয় করছেন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাজেদা বেগম। বছরের মাঝামাঝি সময়ে সিলেবাস, ক্যালেন্ডার, ডায়েরি ও আইডি কার্ড বিতরণ এবং আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে বার্ষিক ক্রীড়া পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান করা হয়েছে। এসব ঘটনা ভিকারুননিসার ইতিহাসে বিরল—নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে নবম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী

অনুসন্ধানের তথ্য বলছে, এডহক কমিটির শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা না থাকা সত্ত্বেও ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে ১১ জন শিক্ষককে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে কলেজ শাখায় চারজন এবং স্কুল শাখা সাতজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এসব নিয়োগে বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেন হয়েছে। এসব নিয়োগ বিধি সম্মত না হলেও পরবর্তীতে টাকার মাধ্যমে তাদের নিয়োগ স্থায়ী করা হয়েছে। বিপরীতে, আর্থিক সুবিধা দিতে অস্বীকৃতি জানানো দুইজন শিক্ষককে স্থায়ীকরণ থেকে বঞ্চিত করা হয়। এছাড়া আইটি সেকশনের তিনজন কর্মচারীকেও স্থায়ীকরণের চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা হওয়া অভিযোগ অনুযায়ী, অভ্যন্তরীণ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ১১ জন শাখা প্রধান নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে দুটি পদ এমপিওভুক্ত সহকারী প্রধান শিক্ষকের। এ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে জাতীয় পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেওয়া এবং মাউশির প্রতিনিধি উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও তা মানা হয়নি।

প্রতিষ্ঠানটির ক্যান্টিন বরাদ্দ নিয়েও গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাজেদা বেগমের বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী ক্যান্টিন বরাদ্দে সর্বোচ্চ দরদাতাকে বাদ দিয়ে চতুর্থ দরদাতাকে কাজ দেওয়া হয়েছে। যার পেছনে ২০ লাখ টাকার আর্থিক লেনদেন হয়েছে।

এছাড়া স্কুল ফান্ড থেকে ১৯৯৯ সালে ভিকারুননিসা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে জমা রাখা প্রায় ৬ কোটি টাকা বর্তমানে সুদসহ প্রায় ১০ কোটিতে পৌঁছালেও তা উদ্ধারে কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেননি মাজেদা বেগম। আদালতের রায় স্কুলের পক্ষে থাকলেও বর্তমান প্রশাসন এ বিষয়ে নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

‘অভিযোগের বিষয়ে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে আমরা বিভিন্ন নথিপত্র সংগ্রহ করেছি। এসব নথিপত্র যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। আগামীকাল রবিবার (১০ জানুয়ারি) বিষয়গুলো নিয়ে তদন্ত কমিটি আলোচনায় বসবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে মাজেদা বেগমের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ করা হবে’— প্রফেসর কাজী মো. আবু কাইয়ুম শিশির, পরিচালক ও তদন্ত কমিটির প্রধান

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ভিকারুননিসার নবম শ্রেণির এক ছাত্রী বলেন, ‘স্কুলে পরিচ্ছন্ন বাথরুম, বিশুদ্ধ পানি ও পর্যাপ্ত ফ্যানের ব্যবস্থা নেই। অথচ অন্যান্য খাতে বিপুল অর্থ ব্যয় করছেন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাজেদা বেগম। বছরের মাঝামাঝি সময়ে সিলেবাস, ক্যালেন্ডার, ডায়েরি ও আইডি কার্ড বিতরণ এবং আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে বার্ষিক ক্রীড়া পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান করা হয়েছে। এসব ঘটনা ভিকারুননিসার ইতিহাসে বিরল।

একাদশ শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক বলেন, ‘দেশের অন্যতম বৃহৎ নারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ ধরনের অভিযোগ শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতারই নয়, বরং পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ওপর গুরুতর প্রশ্ন তুলছে। দ্রুত তদন্ত ও কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে এর নেতিবাচক প্রভাব শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের ওপর পড়তে পারে।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) প্রফেসর বি. এম. আব্দুল হান্নান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘ভিকারুননিসার অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ জমা হয়েছিল। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। কমিটি বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করছে।’

জানতে চাইলে মাউশি গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান সংস্থাটির মনিটরিং অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশন উইংয়ের পরিচালক প্রফেসর কাজী মো. আবু কাইয়ুম শিশির দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘অভিযোগের বিষয়ে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে আমরা বিভিন্ন নথিপত্র সংগ্রহ করেছি। এসব নথিপত্র যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। আগামীকাল রবিবার (১০ জানুয়ারি) বিষয়গুলো নিয়ে তদন্ত কমিটি আলোচনায় বসবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে মাজেদা বেগমের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ করা হবে।’