এসএসসিতে প্রত্যাশিত ফল না পাওয়ায় আত্মীয়-প্রতিবেশীদের সমালোচনা শুনতে হয়েছিল রাইসা তাসনিমকে। বাবার অসুস্থতা, প্রতিকূল পরিবেশ এবং নানা পারিবারিক সংকটের কারণে তখন নিজের ওপরও বিশ্বাস হারিয়ে...
এসএসসিতে প্রত্যাশিত ফল না পাওয়ায় আত্মীয়-প্রতিবেশীদের সমালোচনা শুনতে হয়েছিল রাইসা তাসনিমকে। বাবার অসুস্থতা, প্রতিকূল পরিবেশ এবং নানা পারিবারিক সংকটের কারণে তখন নিজের ওপরও বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছিলেন তিনি। তবে মায়ের অবিচল বিশ্বাস ও পরিবারের সমর্থন তাকে ঘুরে দাঁড়ানোর সাহস জোগায়। এরপর কঠোর পরিশ্রম ও ধারাবাহিক প্রস্তুতিতে এইচএসসিতে জিপিএ-৫ অর্জনের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায়ও দেখান চমক।
চারটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচটি ইউনিটে পরীক্ষা দিয়ে একটিতে অপেক্ষমাণ তালিকায় থাকলেও বাকি সবগুলোতেই প্রথম মেধাতালিকায় জায়গা করে নেন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী রাইসা তাসনিম তার এই ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প, ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি ও সাফল্যের অভিজ্ঞতা নিয়ে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের সঙ্গে কথা বলেছেন।
আপনার এডমিশন জার্নির শুরুটা কীভাবে হয়েছিল?
আমার এডমিশন জার্নির গল্প বলতে গেলে শুরু করতে হবে এসএসসি সময় থেকে। আমার স্কুল-কলেজ দুটোই ঢাকার বাইরে একটি ছোট মফস্বলে। এসএসসিতে পারিবারিক ও সামাজিক নানা সমস্যার কারণে আমার ফলাফল আশানুরূপ হয়নি।
এসএসসি পরীক্ষার আগে আমার বাবার হার্টের সমস্যা ধরা পড়ে। তার চিকিৎসার জন্য প্রায় আট মাস আমাদের বাড়ি ছেড়ে ঢাকায় এসে থাকতে হয়েছিল। তখন আমার বোনের বাসায় থাকতাম। সেখানে থাকার সমস্যা ছিল না, কিন্তু পড়াশোনার পরিবেশটা খুব একটা অনুকূল ছিল না। ঢাকার একটি ছোট ফ্ল্যাটে অনেক মানুষের সঙ্গে একজন রোগী থাকায় স্বাভাবিকভাবেই পড়াশোনায় খুব বেশি মনোযোগ দিতে পারিনি। এর প্রভাব আমার এসএসসির ফলাফলেও পড়ে। এরপর আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের কাছ থেকে অনেক কথা শুনতে হয়েছে, অনেক সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়েছে।
ওই সময়টা কীভাবে সামলেছেন?
আমি দেখতাম, সবাই যখন নিজেদের সন্তানদের এ প্লাস বা গোল্ডেন পাওয়ার কথা বলে গর্ব করত, তখন আমার মা কিছুই বলতে পারতেন না। একটা সময় আমিও নিজের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছিলাম। তখন আমার ওপর বিশ্বাস রেখেছিল শুধু একজন মানুষ আমার মা।
আমার মা কখনো আমাকে কারও সঙ্গে তুলনা করেননি। কখনো বলেননি, ‘তুমি কেন পারলে না?’ বরং সবসময় আমাকে উৎসাহ দিয়েছেন। বলতেন, ‘আল্লাহর ওপর ভরসা রাখ, ইনশাআল্লাহ ভালো কিছুই হবে।’ মুখের দিকে তাকিয়েই আসলে আমার কামব্যাকের জার্নি শুরু হয়।
এরপর কীভাবে নিজেকে প্রস্তুত করেছেন?
এসএসসির পর কলেজজীবন থেকেই নিজেকে ভেঙে নতুন করে গড়ে তোলার চেষ্টা শুরু করি। পরিশ্রম করি, নিয়মিত পড়াশোনা করি। এরপর আলহামদুলিল্লাহ এইচএসসিতে জিপিএ-৫ অর্জন করি। এখানে আমার কলেজের শিক্ষকদের অনেক ভূমিকা ছিল। তাঁদের প্রতি আমি বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ। পড়াশোনাসহ যেকোনো সমস্যায় তারা আমাকে অনেক সহযোগিতা করেছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতির সময় কোনো বড় বাধার মুখোমুখি হতে হয়েছিল?
হ্যাঁ। এইচএসসির পর এডমিশনের জন্য ঢাকায় আসি। শুরুতে একটি কোচিংয়ে ভর্তি হয়েছিলাম। কিন্তু এরপর জীবনের সবচেয়ে বড় ধাক্কাগুলোর একটির মুখোমুখি হই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষার ঠিক এক মাস আগে আমাদের কোচিংয়ের তৎকালীন মালিক শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও স্টাফদের টাকা আত্মসাৎ করে পালিয়ে যান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষার এত অল্প সময় আগে এমন ঘটনা সামলানো আমার জন্য খুব কঠিন ছিল। মানসিকভাবে আবারও ভেঙে পড়ি। মনে হয়েছিল, আমার স্বপ্নগুলো কি এখানেই শেষ?
তখন কীভাবে ঘুরে দাঁড়ালেন?
তখন নিজেকে খুব অসহায় লাগছিল। কিন্তু পরিবার সবসময় আমাকে মানসিকভাবে সাপোর্ট করেছে। বিশেষ করে আমার আপু, ভাইয়া ও আম্মু আমাকে অনেক উৎসাহ দিয়েছেন। তারা বারবার বলেছেন, কখনো আত্মবিশ্বাস হারানো যাবে না, চেষ্টা করতে হবে—ইনশাআল্লাহ ভালো কিছু হবে।
এরপর আমি নিজে নিজে পড়াশোনা শুরু করি। কোচিংয়ের দুই শিক্ষক সাদাত ভাইয়া ও সোহাগ ভাইও আমাকে অনেক সহযোগিতা করেছেন। তাদের প্রতি আমি বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ। পরে একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হই। সেখানে নিয়মিত ক্লাস করা শুরু করি। নিজে নোট তৈরি করে পড়তাম এবং অনলাইনে অনেক ক্লাস করেছি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা কেমন হয়েছিল?
পরীক্ষাটা খুব একটা মনের মতো হয়েছিল এমন নয়। মোটামুটি হয়েছিল। তাই সবসময় একটু মন খারাপ থাকত। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষার আট দিন পরই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা ছিল। আমার মনে আছে, ওই সাত দিন আমি এত বেশি পড়েছি যে পুরো স্টুডেন্ট লাইফেও বোধহয় এত সিরিয়াসভাবে পড়াশোনা করিনি।
কোথায় কোথায় সুযোগ পেয়েছেন?
আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ আমার পরিশ্রমের ফল দিয়েছেন। আমি মোট চারটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচটি ইউনিটে পরীক্ষা দিয়েছি। একটি ছাড়া বাকি সবগুলোতেই প্রথম মেরিটে সুযোগ পেয়েছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘বি’ আমার মেরিট ছিল ৪২৫তম। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সি’ ইউনিটে ৩৫তম এবং ‘বি’ ইউনিটে ৩৮৩তম ছিলাম। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার মেরিট ছিল ৫৮২তম।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা যেহেতু সবার শেষে হয়েছিল, তাই সেটার জন্য সেভাবে প্রস্তুতি নেওয়া হয়নি। সেখানে আমার ওয়েটিং এসেছিল। শেষ পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগে পড়াশোনার সুযোগ পাই।
আপনার সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বেশি কার অবদান?
আমার জীবনে দুইজন গুরুত্বপূর্ণ মানুষ হলেন আমার মা ও বড় বোন। তারা আমার জীবনের দুই স্তম্ভ। আমি যতবার কোনো বাধার মুখোমুখি হয়েছি, তারা সবসময় ঢাল হয়ে আমার সামনে দাঁড়িয়েছেন। যতবার পড়ে যেতে লেগেছি, তারা আমাকে টেনে তুলেছেন। আমি তাদের প্রতি বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ। আমি খুবই ভাগ্যবান যে এমন একটি সাপোর্টিভ পরিবার পেয়েছি।
যারা একসময় আপনার সমালোচনা করতেন, আপনার সাফল্যের পর তাদের প্রতিক্রিয়া কেমন?
রেজাল্টের সময় যারা আমাকে নিয়ে সমালোচনা করতেন, এখন দেখি তারাই আমাকে নিয়ে গর্ববোধ করেন। আসলে আমার কাছে এটাই আসল সফলতা। তখন আমি মুখে কোনো উত্তর দিতে পারিনি। কিন্তু করে দেখিয়েছি যে আমি পেরেছি।
এডমিশন পরীক্ষার্থীদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?
এডমিশনে কোনো শর্টকাট নেই। পড়তে হবে এবং প্রচুর পড়তে হবে। তবে অনেককে বলতে শুনি, ১৪-১৬ ঘণ্টা পড়তে হবে। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলব, এত বেশি সময় পড়ার প্রয়োজন নেই। তুমি যদি কনসিস্টেন্সি বজায় রেখে, সঠিক স্ট্র্যাটেজি মেইনটেইন করে প্রতিদিন আট থেকে ১০ ঘণ্টা পড়ো, তাহলে সেটা যথেষ্ট।
আর দুটি বিষয় আমি এডমিশন পরামর্শ হিসেবে নয়, জীবন থেকে পাওয়া শিক্ষা হিসেবে বলতে চাই। প্রথমত, সৃষ্টিকর্তাকে সবসময় স্মরণে রাখবে। তোমরা যে যে ধর্মেরই হও না কেন, সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করবে, যেন তিনি তোমাদের এই জার্নিটা সহজ করে দেন।
দ্বিতীয়ত, মা-বাবা ও শিক্ষকদের সঙ্গে কখনো খারাপ ব্যবহার করবে না। তাদের মনে কষ্ট দেবে না। বিশেষ করে এই সময়টাতে তাদের দোয়া অনেক কাজে দেয়। মা-বাবা হয়ত অনেক বকাঝকা করবেন, বারবার পড়তে বলবেন। অনেক সময় আমাদের রাগ হতে পারে। কিন্তু তাদের সঙ্গে কখনো উচ্চস্বরে কথা বলা যাবে না।
পড়া মনে না থাকার সমস্যা হলে কী করা উচিত?
এই সমস্যার মুখোমুখি আমিও হয়েছি। অনেক পড়ার পরও একই টপিক মনে রাখতে পারতাম না। এ ক্ষেত্রে বেশি বেশি পরীক্ষা দেওয়া যেতে পারে। যেকোনো একটি টপিক শেষ করার পর পরীক্ষা দেবে। পরীক্ষায় যে ভুলগুলো হবে, সেগুলো চিহ্নিত করবে। নিজের ভুলগুলো শনাক্ত করতে পারলে পরবর্তীতে বিষয়গুলো আরও ভালোভাবে মনে থাকবে। আমি মনে করি, এই বিষয়গুলো মেনে চললে এবং ধারাবাহিকভাবে চেষ্টা করলে ইনশাআল্লাহ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সিট তোমারও হতে পারে।