Image description

চাঁপাইনবাবগঞ্জের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর বহু শিক্ষার্থী এখনও সাবলীলভাবে বাংলা পড়ার সমস্যা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। জেলার তৃতীয় শ্রেণির প্রায় ৩৩ শতাংশ শিশু এখনও সাবলীলভাবে বাংলা রিডিং পড়তে পারে না। এ ছাড়া মোট ৭০৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে মাত্র ১৩টি স্কুলের ৯০ শতাংশ শিক্ষার্থী বাংলা রিডিং ঠিকমতো পড়তে পারে।

 

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিশুদের বাংলা, ইংরেজি ও গণিতের দক্ষতা নিয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

 

প্রতিবেদন অনুযায়ী, তৃতীয় শ্রেণির বাংলা রিডিংয়ে ৯০ শতাংশ সাফল্য পাওয়া ১৩টি স্কুলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সাতটি রয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলায়। এছাড়া নাচোল, ভোলাহাট ও শিবগঞ্জে ২টি করে স্কুল এই তালিকায় রয়েছে। তবে গোমস্তাপুর উপজেলার ১১৯টি স্কুলের একটিতেও এমন সাফল্য মেলেনি।

 

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের ‘ভাষা ও গাণিতিক দক্ষতা যাচাই প্রতিবেদন’ থেকে জানা যায়, উপজেলাগুলোর মধ্যে বাংলা পড়ার দক্ষতায় সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে নাচোল। সেখানে ৭২ শতাংশ শিক্ষার্থী সাবলীলভাবে বাংলা পড়তে পারে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলায় এ হার ৬৭ শতাংশ, ভোলাহাটে ৬৫ শতাংশ এবং শিবগঞ্জে ৬৪ শতাংশ। অন্যদিকে সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে গোমস্তাপুর উপজেলা; সেখানে মাত্র ৬৩ শতাংশ শিশু বাংলা পড়তে সক্ষম, অর্থাৎ বাকি ৩৭ শতাংশ শিশুই ঠিকমতো রিডিং পড়তে পারে না।

 

পুরো জেলার সামগ্রিক হিসাব অনুযায়ী, তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মধ্যে গড়ে ৬৭ শতাংশ শিশু বাংলা রিডিং পড়তে সক্ষম, আর ৩৩ শতাংশ শিশু এখনও পড়তে গিয়ে আটকে যায়। জেলার মোট ৭০৭টি স্কুলের মধ্যে ৮০ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী রিডিং পড়তে পারে—এমন স্কুলের সংখ্যা ৯০টি; ৭০ শতাংশের বেশি সফল স্কুল ১৯৬টি এবং ৫০ শতাংশের নিচে (চরম ঝুঁকিতে থাকা) স্কুলের সংখ্যা ১০৫টি।

 

এখনও কাটেনি ইংরেজিভীতি

 

মাধ্যমিক শিক্ষায় পদার্পণের দোড়গোড়ায় থাকা ৫ম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মধ্যে ইংরেজিভীতি পরিলক্ষিত হয়েছে। এফএলএন (মৌলিক ভাষা ও সংখ্যাজ্ঞান দক্ষতা) জরিপের ফলাফল অনুযায়ী, ৫ম শ্রেণির প্রায় ৪৩ শতাংশ শিক্ষার্থীই ইংরেজি বইয়ের সাধারণ বাক্য সাবলীলভাবে পড়তে পারে না। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের কার্যালয় থেকে প্রকাশিত ‘বিদ্যালয়ভিত্তিক ভাষা ও গাণিতিক দক্ষতা যাচাই প্রতিবেদন’ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, জেলায় ইংরেজি রিডিং পড়ার হার সব সূচকের মধ্যে সবচেয়ে কম—মাত্র ৫৭.১৮ শতাংশ।

 

উপজেলাভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ইংরেজি পঠনদক্ষতায় জেলায় সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে নাচোল উপজেলা। এখানকার ৫ম শ্রেণির ৭৫ শতাংশ শিক্ষার্থী সাবলীলভাবে ইংরেজি রিডিং পড়তে পারে। তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ভোলাহাট উপজেলা, যেখানে সফলতার হার ৬৯ শতাংশ। এরপর চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলায় ৬৩ শতাংশ এবং শিবগঞ্জ উপজেলায় ৫৬ শতাংশ শিক্ষার্থী ইংরেজি রিডিংয়ে সক্ষমতা অর্জন করেছে। তবে গোমস্তাপুরে ৫ম শ্রেণির সফলতার হার মাত্র ৫১ শতাংশ; অর্থাৎ এখানকার অর্ধেকের কাছাকাছি (৪৯ শতাংশ) শিক্ষার্থী ৫ম শ্রেণিতে উঠেও সাবলীলভাবে ইংরেজি রিডিং পড়তে পারে না।

 

গণিতেও বড় শিখন ঘাটতি

 

বাংলা ও ইংরেজির মতো গণিতের চার মৌলিক প্রক্রিয়া—যোগ, বিয়োগ, গুণ ও ভাগে বড় ধরনের দুর্বলতা রয়ে গেছে জেলার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের। ৪র্থ শ্রেণির গণিত মূল্যায়নে জেলাজুড়ে প্রাথমিকে শিক্ষার্থীরা মৌলিক হিসাব-নিকাশে হোঁচট খাচ্ছে। উপজেলাভিত্তিক তথ্যে দেখা যায়, গণিতের মৌলিক দক্ষতায় নাচোল উপজেলার ৭২ শতাংশ শিক্ষার্থী চার প্রক্রিয়া সঠিকভাবে সমাধান করতে পেরেছে। ভোলাহাট উপজেলার সফলতার হার ৬৭ শতাংশ, গোমস্তাপুর উপজেলায় ৬৪ শতাংশ এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলায় ৬১ শতাংশ শিক্ষার্থী গণিতে কাঙ্ক্ষিত দক্ষতা অর্জন করেছে।

 

অন্যদিকে, গণিতে সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে শিবগঞ্জ উপজেলা। এ উপজেলায় ৪র্থ শ্রেণির সফলতার হার ৬০.৪৬ শতাংশ; অর্থাৎ প্রায় ৪০ শতাংশ শিক্ষার্থীই যোগ, বিয়োগ, গুণ ও ভাগের মতো সহজ গাণিতিক প্রক্রিয়া সমাধান করতে পারছে না। শিবগঞ্জের মোট ১৫১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৫২টি স্কুলেই ৫০ শতাংশের নিচে সাফল্য এসেছে। জেলাজুড়ে গণিতের অর্জনের ওপর ভিত্তি করে দেখা যায়, জেলার ৭০৭টি সরকারি প্রাথমিকে ৫০ শতাংশের নিচে সাফল্য পাওয়া বিদ্যালয়ের সংখ্যা অনেক।

 

সবচেয়ে পিছিয়ে গোমস্তাপুর

 

শিক্ষার ভিত্তির দিক থেকে পুরো চাঁপাইনবাবগঞ্জের মধ্যে সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে গোমস্তাপুর উপজেলা। বাংলা, ইংরেজি কিংবা গণিত—সব বিষয়েই এ উপজেলার প্রাথমিকে শিক্ষার্থীরা অন্যান্য উপজেলার চেয়ে পিছিয়ে। প্রতিবেদনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গোমস্তাপুরে ৫ম শ্রেণির প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থীই (৪৯ শতাংশ) ইংরেজি রিডিং পড়তে পারে না। ৩য় শ্রেণির বাংলা পড়ার ক্ষেত্রেও উপজেলার ৩৭ শতাংশ শিশুর দুর্বলতা রয়েছে। এছাড়া ৪র্থ শ্রেণির গণিতে যোগ, বিয়োগ, গুণ ও ভাগের মতো চার প্রক্রিয়ার কাজগুলোতে আটকে যাচ্ছে ৩৬ শতাংশ শিশু।

 

শিক্ষার এই চিত্র নিয়ে স্থানীয় শিক্ষাবিদদের মতে, প্রাথমিক স্কুলেই বাংলা ও গণিতের ভিত দুর্বল থেকে গেলে মাধ্যমিক স্তরে গিয়ে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনায় আর তাল মেলাতে পারে না। শ্রেণিকক্ষে বিষয়ভিত্তিক দক্ষ শিক্ষকের অভাব, নিয়মিত অনুশীলনের ঘাটতি এবং তদারকির অভাবই এ সমস্যার মূল কারণ।

 

তবে এ বিষয়ে গোমস্তাপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. ইসহাক আলী জানান, শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার মান যাচাইয়ে নিয়মিত এই সমীক্ষা ও মূল্যায়ন চালানো হচ্ছে। তিনি দাবি করেন, আগের চেয়ে বর্তমানে এলাকার শিক্ষার মান বেড়েছে। শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতি দূর করতে শিক্ষক ও অভিভাবক—উভয়ের সমন্বিত প্রচেষ্টার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে এবং সচেতনতামূলক আলোচনা অব্যাহত রাখা হয়েছে।

 

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম জানান, এফএলএন মূল্যায়নের মূল উদ্দেশ্যই ছিল পিছিয়ে থাকা বিদ্যালয় ও শিক্ষার্থীদের দুর্বলতাগুলো সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা। যেসব বিদ্যালয়ে বাংলা, ইংরেজি ও গণিতে সফলতার হার কম এবং রিডিং পড়ার ঘাটতি বেশি, ইতোমধ্যে সেসব বিদ্যালয় চিহ্নিত করা হয়েছে।

 

তিনি বলেন, আমাদের জেলায় প্রাথমিক শিক্ষাখাতে ব্যাপক জনবলসংকট রয়েছে। ২৬ জন সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার পদে আছেন মাত্র ১২ জন। এছাড়া পাঁচ শতাধিক বিদ্যালয়ে প্রধান ও সহকারী শিক্ষকের পদ ফাঁকা রয়েছে। এরপরেও আমরা প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি এবং গতবারের তুলনায় এবার কিছুটা সফলতা এসেছে।

 

তিনি আরও জানান, শিক্ষার্থীদের সাবলীলভাবে রিডিং পড়া শেখাতে ‘রিডিং ক্লাব’ চালু করা হয়েছে। এর পাশাপাশি তদারকি বাড়াতে বিশেষ প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।