Image description

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) কবি জসীমউদ্দীন হল মাঠে বড়পর্দায় ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবল প্রদর্শনীকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও হল সংসদের শিবির নেতাদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ সামনে এসেছে। বিশ্বকাপের খেলা দেখানো বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ তুলেছে ছাত্রদল হল সংসদের নেতাদের বিরুদ্ধে। অন্যদিকে হল সংসদের শিবির নেতাদের দাবি, খেলা প্রদর্শনের নামে মাঠে দোকান বসিয়ে চাঁদাবাজি চলছে। এ ঘটনায় উভয় পক্ষের পাল্টাপাল্টি অভিযোগের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের কাছে লিখিত অভিযোগও দিয়েছে ছাত্রদল।

গত বুধবার রাতে এক সংবাদ সম্মেলনে কবি জসীম উদ্দীন হল সংসদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ তোলে ছাত্রদল। অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ফেসবুক গ্রুপে ছাত্রদলের বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযোগ তোলে হল সংসদ।

এ বিষয়ে হল সংসদের ভিপি ওসমান গনি ছাত্রদলের অভিযোগকে ভিত্তিহীন ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেন। তিনি দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘একবার ১২ লাখ টাকা, আবার অন্য একটি ভিডিওতে ৫০ হাজার টাকা চাঁদা দাবির কথা বলা হচ্ছে। একই ঘটনায় ভিন্ন ভিন্ন অঙ্কের অভিযোগই প্রমাণ করে এগুলো মিথ্যা। যদি আমরা চাঁদা দাবি করে থাকি, তাহলে রেকর্ড, স্ক্রিনশট বা লিখিত কোনো প্রমাণ দেখাতে হবে। এখন পর্যন্ত তারা একটি প্রমাণও জনসমক্ষে উপস্থাপন করতে পারেনি।’

তিনি আরও বলেন, সংশ্লিষ্ট ভেন্ডরদের সঙ্গে কথা বললেই প্রকৃত ঘটনা জানা যাবে। তার দাবি, ভেন্ডররা ইতোমধ্যে জানিয়েছেন, হল সংসদের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের চাঁদা দাবি করা হয়নি।

বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার অভিযোগও অস্বীকার করে ওসমান গনি বলেন, ‘আমি হলের একজন নির্বাচিত প্রতিনিধি। বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার কোনো ক্ষমতা আমার নেই। কবে, কখন এবং কীভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করা হয়েছে—এর কোনো নির্দিষ্ট তথ্য বা প্রমাণও অভিযোগকারীরা দেখাতে পারেনি।’

বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার প্রায় এক মাস আগে আমার হলসহ মোট পাঁচটি হলের ছাত্রদল নেতারা বড় পর্দায় খেলা দেখানোর জন্য একটি আবেদন করেছিল। সেই আবেদনটি প্রক্টরের কাছে গেলে তিনি সংশ্লিষ্ট হলগুলোকে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য মার্ক করে দেন এবং আমরা সেটি রিসিভ করি। তবে পরবর্তীতে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় থেকে কেন্দ্রীয়ভাবে খেলা দেখানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়।—অধ্যাপক ড. এস এম আরিফ মাহমুদ, প্রাধ্যক্ষ, জসিম উদ্দিন হল, ঢাবি

তিনি জানান, দোকান বরাদ্দ ও ভাড়া সংক্রান্ত বিষয়ে হল প্রশাসনের নির্দেশনা অনুযায়ী একজন শিক্ষকের উপস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট দোকানদারদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। সেখানে কোনো ধরনের চাঁদা দাবি, ভয়ভীতি প্রদর্শন বা জোরপূর্বক কিছু করা হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি।

ওসমান গনি আরও বলেন, বিষয়টি তদন্তের জন্য তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের কাছে আবেদন করেছেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে ডাকসুর কেন্দ্রীয় সংসদের ক্রীড়া সম্পাদক আরমান হোসেন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশ্বকাপ ফুটবল প্রদর্শনীকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন কোম্পানি স্পন্সর হতে আগ্রহ দেখিয়েছিল। অতীতে ছাত্রলীগ বিভিন্ন কোম্পানিকে নিয়ে এ ধরনের আয়োজন করলেও সেটি নানা ধরনের সমঝোতার মাধ্যমে হতো বলে তিনি দাবি করেন।

তিনি বলেন, ‘আমি ক্রীড়া সম্পাদক হিসেবে চেয়েছিলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্থানে সমন্বিতভাবে বিশ্বকাপ প্রদর্শনীর আয়োজন করতে। প্রথমে টিএসসি, বিসি চত্বর, শহীদুল্লাহ হলের মাঠসহ কয়েকটি ভেন্যুর পরিকল্পনা করা হয়েছিল। তবে জসীমউদ্দীন হলের মাঠ বাদ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলাম, কারণ হল এলাকার ভেতরে উচ্চ শব্দে শিক্ষার্থীদের অসুবিধা হতে পারে। এ বিষয়ে হল প্রাধ্যক্ষের সঙ্গেও কথা হয়েছিল।’

আরমান হোসেন জানান, প্রক্টর কার্যালয় থেকে তাকে ভেন্যুগুলোর বিষয়ে হল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করতে বলা হয়েছিল। এর মধ্যেই মহসীন হল সংসদের পক্ষ থেকে তাদের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় খেলা দেখানোর আগ্রহের কথা জানানো হয়।

তিনি বলেন, ‘পরে শুনলাম ছাত্রদলকে মন্ত্রণালয় থেকে অনুমতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ক্রীড়া সম্পাদক হিসেবে আমার সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ করা হয়নি। আমি পাঁচটি ছাত্র সংসদের ক্রীড়া সম্পাদকদের প্রস্তাবও প্রস্তুত করে রেখেছিলাম, যাতে সমন্বিতভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্থানে আয়োজন করা যায়।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমার পরিকল্পনা ছিল কোনো একটি কোম্পানিকে স্পন্সরশিপের সুযোগ দিয়ে তার বিনিময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেদের জিমনেশিয়াম সংস্কারের মতো একটি স্থায়ী উন্নয়নমূলক কাজ করা। কিন্তু শেষ মুহূর্তে প্রক্টর অফিস থেকে জানানো হয়, আগের অনুমতি বহাল থাকছে না। কারণ হল সংসদ ইতোমধ্যে ছাত্রদলকে আয়োজনের অনুমতি দিয়ে দিয়েছে।’

পাল্টা জবাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের দপ্তর সম্পাদক মল্লিক ওয়াসী উদ্দীন তামী দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘শিবির হল প্রশাসনকে বারবার বিভ্রান্ত করে চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে বক্তব্য আদায় করে নেওয়া হচ্ছে।’

এদিকে বুধবার দিবাগত রাতে কবি জসীমউদ্দীন হলের খেলার মাঠে সংবাদ সম্মেলন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল। এতে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের দপ্তর সম্পাদক মল্লিক ওয়াসী উদ্দীন তামী, ক্রীড়া সম্পাদক সাইফুল্লাহ সাইফ, যোগাযোগ সম্পাদক জোবায়ের আলী, সহ-সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন, জগন্নাথ হলের ভিপি পল্লব বর্মণ, জসীমউদ্দীন হল ছাত্রদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আব্দুল ওহেদ, যুগ্ম আহ্বায়ক মোনতাসিম বিল্লাহ হিমেল। 

এছাড়াও জিয়াউর রহমান হল ছাত্রদলের আহ্বায়ক জাহিদুল ইসলাম, সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক রিজভী আলম, একাত্তর হল ছাত্রদলের সদস্য সচিব সাকিব বিশ্বাস, মুজিবুর রহমান হল ছাত্রদলের আহ্বায়ক সাইফ আল ইসলাম দীপ, সূর্যসেন হল ছাত্রদলের আহ্বায়ক মনোয়ার হোসেন প্রান্ত এবং হাজী মুহাম্মদ মুহসীন হল ছাত্রদলের আহ্বায়ক মনসুর আহমেদ রাফিসহ বিভিন্ন হল ছাত্রদলের নেতারা।

সংবাদ সম্মেলনে মল্লিক ওয়াসী উদ্দীন তামী অভিযোগ করেন, সব ধরনের প্রশাসনিক অনুমতি নিয়ে বিশ্বকাপ ফুটবল প্রদর্শনের আয়োজন করা হলেও গত ১৬ জুন থেকে কবি জসীমউদ্দীন হল সংসদের ভিপি মুহাম্মদ ওসমান গনি, জিএস মাসুম বিল্লাহ, এজিএস হিজবুল্লাহ আল হিজুল এবং সমাজসেবা সম্পাদক মারুফ স্ক্রিন অপারেটর ও ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের কাছে বারবার অর্থ দাবি করেন। দাবি না মানলে খেলা বন্ধ করে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, ২২ জুন রাতে ইভেন্ট-সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মীকে বেআইনিভাবে তুলে নিয়ে আটকে রাখার মতো ঘটনা ঘটে। এর পরিপ্রেক্ষিতে স্পন্সর প্রতিষ্ঠানের স্টল সরিয়ে নেওয়া হয়। এছাড়া ওই রাতের ঘটনায় উপস্থিত ছাত্রদলের নেতাদের জড়িয়ে ১ জুলাই বিভিন্ন ফেসবুক গ্রুপে চাঁদাবাজির অভিযোগ তুলে মিথ্যা প্রচারণা চালানো হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

তিনি জানান, এসব অভিযোগের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর বরাবর লিখিত অভিযোগ জমা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন তারা।

এ বিষয়ে জসিম উদ্দিন হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. এস এম আরিফ মাহমুদ বলেন, বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার প্রায় এক মাস আগে আমার হলসহ মোট পাঁচটি হলের ছাত্রদল নেতারা বড় পর্দায় খেলা দেখানোর জন্য একটি আবেদন করেছিল। সেই আবেদনটি প্রক্টরের কাছে গেলে তিনি সংশ্লিষ্ট হলগুলোকে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য মার্ক করে দেন এবং আমরা সেটি রিসিভ করি। তবে পরবর্তীতে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় থেকে কেন্দ্রীয়ভাবে খেলা দেখানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়।

তিনি বলেন, মন্ত্রণালয় থেকে যখন এই উদ্যোগ নেওয়া হয়, তখন আগের সেই চিঠির গুরুত্ব আর থাকে না এবং সেটি ইনভ্যালিড হয়ে যায়। কিছু সমস্যার কারণে এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে তারা নিজেরাও আর এই আয়োজনে সাড়া দেয়নি। গত ২৮ জুন মন্ত্রণালয় চিঠিতে আয়োজকদের সার্বিক সহযোগিতা করার কথা বলা হলেও এটি স্পষ্ট উল্লেখ ছিল পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে হবে হল প্রশাসনের অনুমতি সাপেক্ষে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় হলো, যারা বর্তমানে খেলা দেখাচ্ছে তারা হল প্রশাসনের সাথে কোনো প্রকার যোগাযোগ করেনি এবং কোনো আনুষ্ঠানিক অনুমতিও নেয়নি।

মাঠের ভাড়ার বিষয়ে তিনি উল্লেখ করেন, হলের নিজস্ব নীতিমালা অনুযায়ী সারাদিনের জন্য মাঠ ভাড়া ১০০০ টাকা এবং অর্ধেক বেলার জন্য ৫০০ টাকা নির্ধারিত আছে। বর্তমান আয়োজকরা এই নিয়ম অনুসরণ করছে না এবং এ বিষয়ে প্রশাসনের কাছে কোনো নথিপত্র বা ডকুমেন্ট নেই ।

তিনি বলেন, যদি শুরু থেকেই প্রশাসনিক নিয়ম ও শৃঙ্খলা অনুসরণ করা হতো, তবে আজকে পরিস্থিতি এতদূর গড়াতো না। হলের স্বার্থে ও শৃঙ্খলার স্বার্থে দ্রুত এই পুরো বিষয়টিকে একটি নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্যে আনা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন