স্মার্টফোন আর ইন্টারনেটের সহজলভ্যতায় প্রযুক্তি এখন মানুষের হাতের মুঠোয়। তথ্য, শিক্ষা ও যোগাযোগের অসংখ্য সুবিধা এনে দিলেও এর অপব্যবহার নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ। বিশেষ করে অশালীন ও অনুপযুক্ত কনটেন্টের বিস্তার শহর পেরিয়ে এখন পৌঁছে গেছে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলেও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে এসব কনটেন্ট তরুণ প্রজন্মের মানসিক ও নৈতিক বিকাশ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে।
নেত্রকোণার দক্ষিণ বিশিউড়া ইউনিয়ন। জেলা সদরের এই ছোট্ট জনপদ আজ এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। যেখানে রয়েছে ‘রিপন ভিডিও’র মতো কনটেন্ট ক্রিয়েটর। সেখানে অল্প বয়সেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয় হওয়ার প্রতিযোগিতায় ঝুঁকছে অনেক তরুণ-তরুণী। শুধু এই ইউনিয়নেই ছোট-বড় মিলিয়ে অন্তত ২০ জন কনটেন্ট ক্রিয়েটরের সন্ধান পাওয়া গেছে। মানসম্মত ও সৃজনশীল কনটেন্টের বদলে অশালীন ও দায়িত্বহীন ভিডিও তৈরির প্রবণতা যেমন বাড়ছে, তেমনি স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের একাংশ পড়াশোনা থেকে সরে গিয়ে ভার্চুয়াল পরিচিতির মোহে সময় নষ্ট করছে।
বেশ কিছুদিন আগেও সোশ্যাল মিডিয়াতে নেত্রকোণার একটি ভিডিও ভাইরাল হয়। যেখানে দেখা যায়, একটি ছেলে ভ্যান গাড়ির পেছনে স্কেটিং করতে করতে যাচ্ছে এবং ভ্যানের পেছনে বসে থাকা একটি মেয়েকে উত্ত্যক্ত করছে। একপর্যায়ে ছেলেটি মেয়েটির পায়জামা টেনে ধরে।
স্কেটিং করা ছেলেটির নাম রাকিব হাসান (২০)। ভ্যান গাড়িতে থাকা মেয়েটি মূলত ছেলে ছিল, তার নাম হানিফ (২০)। ভিডিও ধারণ করেন রোমান মিয়া। হানিফ ও রোমান সম্পর্কে আপন দুই ভাই। তারা দুজন পূর্বধলা উপজেলার নারায়ণডহর গ্রামের ওয়াসিম মিয়ার ছেলে বলে জানা গেছে। তারা দুই ভাই দীর্ঘদিন ধরেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ ধরনের ‘ফানি ভিডিও’ তৈরি করে আসছেন। যা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে একটি ভিডিওতে নিজের ভুল তুলে ধরে ক্ষমা প্রর্থনা করে কনটেন্ট ক্রিয়েটর রাকিব।
শুধু রাকিব নয়, ডিজিটাল যুগে স্মার্টফোন আর ইন্টারনেটের সহজলভ্যতায় রাতারাতি বদলে গেছে তরুণ প্রজন্মের স্বপ্নের মানচিত্র। এখন অনেকের লক্ষ্য একটাই, ভাইরাল হওয়া। লাইক, ভিউ আর ফলোয়ারের ঝলমলে দুনিয়ার আড়ালে কতটা চাপ, মানসিক অস্থিরতা আর নৈতিক অবক্ষয় জমছে, সেই প্রশ্ন আজ সামনে দাঁড়িয়েছে।
ক্লাস ফাইভে পড়াশোনা করে মো. তনয়। তার একটি ফেসবুক পেজ রয়েছে। যেখানে সে বিভিন্ন ধরনের ফানি ভিডিও তৈরি করে আপলোড করে। তার দাবি এ ধরনের ফানি ভিডিও বানাতে তার ভালো লাগে। এজন্য এ ধরনের ভিডিও তৈরি করে। তনয় বলছিল, কয়েক মাস আগে থেকে আমি ভিডিও তৈরির কাজ শুরু করেছি। কী বানাচ্ছি বুঝতে না পারলেও, মন চায় এজন্য ভিডিও আপলোড করেছি। কিন্তু মানুষ খুব একটা দেখে না।

তনয়ের বাবা মো. রফিক মিয়া বলেন, ছেলে পড়াশোনার পাশাপাশি ভিডিও বানায় এটা শুনেছি। ভিডিও বানিয়ে নাকি ফেসবুকে আপলোড করে। আমি সারাদিন কাজের কারণে বাইরে থাকি, খোঁজখবর খুব একটা রাখতে পারি না। আমরা এতকিছু বুঝি না। তবে ভিডিও বানিয়ে যদি তার পড়াশোনার ক্ষতি হয় তাহলে তো এটা ভালো কাজ হলো না।
এমন আরেকজন কনটেন্ট ক্রিয়েটর রাকিবুল ইসলাম, পেশায় তিনি একজন ইলেকট্রিশিয়ান। কিন্তু হঠাৎ কনটেন্ট বানানোর মোহে পড়ে কাজ ছেড়ে লেগে পড়েন ভিডিও বানাতে। কিন্তু দিনশেষে সময় নষ্ট হওয়া ছাড়া কিছু হয়নি তার। তিনি ইউটিউব এবং ফেসবুকে উঠতি বয়সীদের জন্য যৌন উস্কানিমূলক কনটেন্ট তৈরি করেন। যার কারণে সমাজের কাছে অপমানিতও হয়েছেন।
রাকিবুল বলেন, প্রথমে সবার দেখাদেখি না বুঝেই আমিও যুক্ত হই এই কাজে। মনে করেছিলাম শুধু টাকা আর টাকা।শুনেছিলাম মনিটাইজেশন আসলে টাকা আসবে। কিন্তু এখন দেখছি সব ধোঁয়াশা। তারপরও সব কিছুর মোকাবিলা করে কাজ করছিলাম। যেহেতু মেয়ে-ছেলে নিয়ে আমার কনটেন্ট তৈরি করতে হয়। শুটিংয়ের কাজ করার সময় সেখানে গিয়ে এলাকার ছেলেরা ঝামেলা করে কাজ করতে দেয় না।
ফানি ভিডিও তৈরি করেন ‘ঢাকনা সুন্দরী’ নামের ফেসবুক পেজের স্বত্বাধিকারী মো. রোমান। এক সময় তৃতীয় লিঙ্গের বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে রাস্তায় চাঁদা উঠিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। ফেসবুকে হঠাৎস তার ঢাকনা সুন্দরী নামে একটি ভিডিও ভাইরাল হলে, তিনি কনটেন্ট ক্রিয়েটর হওয়ার নেশায় পড়ে যান। তৃতীয় লিঙ্গের সঙ্গ ত্যাগ করে শুরু করেন কনটেন্ট বানানো।
রোমান বলছিলেন, আগে বিভিন্ন ধরনের ভিডিও তৈরি করলেও ভিউ হতো না। একদিন পাতিলের ঢাকনা গলায় ঝুলিয়ে একটি কনটেন্ট তৈরি করে আপলোড করার পরে হঠাৎ ভাইরাল হয়ে যায়। রাতের মধ্যেই ওয়ান মিলিয়ন ভিউ হয়। সেখান থেকে আমার ঢাকনা সুন্দরীর নামটি চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে। আমার এলাকা ব্যতীত অন্য কোথাও গেলে সবাই আমাকে ঢাকনা সুন্দরী নামে ডাকেন।
তবে ভাইরাল সেই অবস্থা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি, আস্তে আস্তে ভিউ কমতে থাকে। এখন ভিউ নেই বললেই চলে। আমিও নিজেকে এখান থেকে সরিয়ে নিয়েছি। আমি এখন একটি দোকান পরিচালনা করি এটি দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করি। কনটেন্ট বানিয়ে সফল না হলেও নিজেকে তৃতীয় লিঙ্গের লোকজনদের কাছ থেকে সরিয়ে স্বনির্ভর হতে পেরেছি এটি সবচেয়ে বড় বিষয়।

আরেক কনটেন্ট ক্রিয়েটর মো. জামরুল ইসলাম। পেশায় তিনি একজন সাইকেল মেকানিক। দক্ষিণ বিশিউড়া বাজারে সাইকেল-রিকশা মেরামত করে জীবিকা নির্বাহ করেন তিনি। কিন্তু হঠাৎ কি কারণে তার মনে হল কনটেন্ট ক্রিয়েটর হতে হবে। শুরু করেন সাইকেলের একটি চাকা নিয়ে বিভিন্ন ধরনের অ্যাক্টিভিটিস প্রদর্শন। কখনো মাথায় সাইকেলের চাকা ঘুরাতে ঘুরাতে চলে যাচ্ছেন গোসল করতে আবার কখনো সাইকেলের চাকা মাথায় ঘোরাতে চলে যাচ্ছেন চায়ের দোকানে।
জামরুল ইসলাম বলেন, আমি মানুষের কথা শুনে হঠাৎ করে ভিডিও বানানো শুরু করে দেই। বছর দেড়েক দিন-রাত পরিশ্রম করলাম, কোনো প্রতিদান পেলাম না। কিছুদিন আগে মনিটাইজেশন পেয়েছিলাম, কিন্তু টাকা পয়সা পাইনি। এখন হঠাৎ করে আমার পেজ বন্ধ করে দিয়েছে। এর কোনো কারণ আমি খুঁজে পাই না। আর কনটেন্ট তৈরি করতে মন চায় না। এখন আবার কাজে ফিরে এসেছি।
অভিভাবক, শিক্ষক ও সচেতন মহল বলছেন, এখনই সময় সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়ার। প্রযুক্তি যেন হয় জ্ঞান ও ইতিবাচক সৃজনশীলতার মাধ্যম, অবক্ষয়ের কারণ নয়।
নেত্রকোণা সদরের নূরপুর শ্রীধরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জাহিদুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে উঠতি বয়সী বাচ্চারা মোবাইল দিয়ে ভিডিও করে বিভিন্ন ধরনের অসামাজিক কনটেন্ট তৈরি করছে। যা তাদের পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটানোর পাশাপাশি সামাজিক অবক্ষয় করছে। এ ধরনের অনিয়ন্ত্রিত কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ করা খুব জরুরি হয়ে পড়েছে। এটা এখনই নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমরা ভালো কিছু প্রত্যাশা করতে পারি না।
নেত্রকোণা জেলা সদর হাসপাতালের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. সজীব আবেদীন ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমরা যে বিষয়টি এখন দেখছি অত্যন্ত ছোট ছোট বাচ্চা, যাদের স্কুলে যাওয়ার বয়স। এই সময় তারা একটি মোবাইল নিয়ে, ক্যামেরা নিয়ে হাটে, মাঠে, ঘাটে ভিডিও করে বেড়াচ্ছে। অনেক সময় দেখা যাচ্ছে শ্লীল-অশ্লীল কোনো লেভেল নেই এরকম ভিডিও বানিয়ে বেড়াচ্ছে তারা। কিছু কিছু ভিডিও আছে যেগুলোকে বলে ‘অপোজিশনাল ডিফিয়েন্ট ডিসঅর্ডার’। যেখানে গুরুজনের কথা শোনে না। কিছু কিছু আছে কন্টাক্ট ডিজঅর্ডারের বাচ্চা, তারা সামাজিক বিশৃঙ্খলা তৈরি করে এরকম ভিডিও তৈরি করতে পারে। সে ক্ষেত্রে তারা ধর্মীয় বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে পারে, সামাজিক অবক্ষয় ও বিশৃঙ্খলা তো হয়ই।
তিনি আরও বলেন, যে একটা অস্থির সমাজ ব্যবস্থা তৈরি হচ্ছে, আলফা জেনারেশন আমরা যেটাকে বলছি। এই জেনারেশনের ভবিষ্যতে আমরা খুব ভালো একটা কিছু দেখছি না। খুব খারাপ দিকেই যাচ্ছে বলে মনে করছি। এভাবে যদি চলতে থাকে এবং চলতে দেওয়া হয় তাহলে সমাজে বিভিন্ন দিক থেকে সমস্যা আরও বাড়বে।