ভারতীয় চলচ্চিত্রে এমন কিছু অভিনেতা থাকেন, যাদের পরিচয় শুধু তারকা দিয়ে শেষ করা যায় না। অভিনয়ের গভীরতা, সংলাপ বলার নিজস্ব ভঙ্গি আর চরিত্রের ভেতরে ঢুকে যাওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা দিয়ে তারা হয়ে ওঠেন সিনেমারই এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। নানা পাটেকর ছিলেন তেমনই একজন। প্রায় পাঁচ দশকের অভিনয়জীবনে নায়ক, খলনায়ক, পুলিশ কর্মকর্তা, গ্যাংস্টার থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের চরিত্রেও নিজের স্বাতন্ত্র্যের ছাপ রেখেছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) ৭৫ বছর বয়সে হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা গেছেন এই বর্ষীয়ান অভিনেতা। গোয়ার ডোনা পাওলার বাড়িতে অচেতন অবস্থায় তাকে পাওয়া যায়। পরে মণিপাল হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা প্রায় ৪৫ মিনিট তাকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
বিশ্বনাথ পাটেকর নাম নিয়ে জন্ম নেওয়া নানা পাটেকরের অভিনয়জীবনের শুরু মারাঠি থিয়েটারে। পরে চলচ্চিত্রে এসে ধীরে ধীরে নিজের জায়গা তৈরি করেন তিনি। ১৯৭০-এর দশকের শেষ দিকে সিনেমায় অভিষেকের পর আশির দশকে তার অভিনয় দর্শক ও সমালোচকদের নজর কাড়ে।
‘পারিন্দা’, ‘প্রহার’, ‘ক্রান্তিবীর’, ‘খামোশি: দ্য মিউজিক্যাল’, ‘অব তক ছাপ্পান’, ‘অপহরণ’সহ একাধিক সিনেমায় নানা পাটেকরের অভিনয় তাকে আলাদা উচ্চতায় নিয়ে যায়। একই সঙ্গে ‘ওয়েলকাম’-এর উদয় শেঠি চরিত্রে তার হাস্যরসাত্মক অভিনয় প্রমাণ করে, গুরুগম্ভীর চরিত্রের বাইরেও তিনি সমান দক্ষ।
তবে নানা পাটেকরের বিশেষত্ব শুধু অভিনয়ে সীমাবদ্ধ ছিল না। পর্দার বাইরে সাধারণ মানুষের সঙ্গে তার সম্পর্ক, সরল জীবনযাপন এবং সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রবণতাও তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। খরা ও কৃষকদের সংকটের সময় মহারাষ্ট্রের গ্রামীণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্যও তিনি পরিচিত ছিলেন।
তার জীবনযাপন নিয়েও বরাবরই ছিল সরলতার ছাপ। এক পুরোনো কথোপকথনে নানা পাটেকর জানিয়েছিলেন, তিনি নিজেকে কখনো চলচ্চিত্রশিল্পের প্রচলিত জীবনযাত্রার অংশ মনে করেননি। শুটিং শেষ করে নিজের সাধারণ জীবনে ফিরে যেতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন তিনি। গ্রাম, প্রকৃতি ও সীমিত চাহিদার জীবন তার কাছে ছিল অনেক বেশি স্বস্তির।
অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গে এক পুরোনো অনুষ্ঠানের কথোপকথনেও নানা পাটেকর বলেছিলেন, তিনি নিজেকে মূলত একজন গ্রামের মানুষ হিসেবেই ভাবেন। চলচ্চিত্রে কাজ করলেও সেই পরিচয় থেকে কখনো নিজেকে আলাদা করেননি।
অভিনয়ের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ একাধিক সম্মাননা পেয়েছেন নানা পাটেকর। ২০১৩ সালে ভারত সরকার তাকে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করে। অভিনয়ের পাশাপাশি চলচ্চিত্র নির্মাণেও কাজ করেছেন তিনি।
নানা পাটেকরের অভিনয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তার স্বাভাবিকতা। পর্দায় তিনি কখনো শুধু সংলাপ বলতেন না, বরং চরিত্রের আবেগকে নিজের মধ্যে ধারণ করতেন। তার কণ্ঠ, চোখের অভিব্যক্তি ও সংলাপ পরিবেশনের তীব্রতা তাকে সমসাময়িক অনেক অভিনেতার চেয়ে আলাদা পরিচয় এনে দিয়েছিল। সহশিল্পী অক্ষয় কুমারও তার অভিনয়ের স্বাতন্ত্র্য ও সত্যনিষ্ঠার প্রশংসা করেছেন।
৭৫ বছরের জীবনে নানা পাটেকর তাই শুধু অসংখ্য স্মরণীয় চরিত্র রেখে যাননি, রেখে গেছেন একজন শিল্পীর নিজস্ব জীবনদর্শনেরও উদাহরণ। পর্দায় তিনি ছিলেন তীব্র, শক্তিশালী ও বহুমাত্রিক। আর পর্দার বাইরে থেকেছেন অনেকটাই সাধারণ, মাটির কাছাকাছি একজন মানুষ। তার প্রয়াণে ভারতীয় চলচ্চিত্র হারাল এমন একজন অভিনেতাকে, যার অভিনয় যেমন মনে থাকবে, তেমনি মনে থাকবে মানুষের জন্য কাজ করার সেই আলাদা পরিচয়ও।
সূত্র-ইটিভি ভারত