বিয়ে ইসলামের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সুন্নত এবং পারিবারিক জীবনের ভিত্তি। তবে আমাদের সমাজে একটি প্রশ্ন প্রায়ই শোনা যায়- বিয়ে না করলে কি জান্নাত পাওয়া যাবে না? বা কেউ আজীবন অবিবাহিত থাকলে কি জান্নাত তার জন্য হারাম হয়ে যাবে? কোরআন, সুন্নাহ ও ইসলামের ইতিহাসের আলোকে এর নিখুঁত ব্যাখ্যা জানা প্রত্যেক মুমিনের জন্য জরুরি।
জান্নাত লাভের মূল শর্ত কী?
প্রথমেই জেনে রাখা ভালো, জান্নাত লাভের মূল ভিত্তি হলো- বিশুদ্ধ ঈমান, আল্লাহভীতি (তাকওয়া) এবং নেক আমল। বিয়ে জান্নাতে যাওয়ার অন্যতম একটি সহায়ক আমল হলেও এটি জান্নাত লাভের একক বা অনিবার্য শর্ত নয়। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করেছেন- ‘আর যে ব্যক্তি মুমিন অবস্থায় সৎকর্ম করবে, সে পুরুষ হোক বা নারী, তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তাদের প্রতি বিন্দুমাত্র জুলুম করা হবে না।’ (সুরা নিসা: ১২৪) এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা জান্নাত লাভের চাবিকাঠি হিসেবে ‘ঈমান’ ও ‘সৎকর্ম’কে উল্লেখ করেছেন। এখানে বিবাহিত বা অবিবাহিত হওয়ার ওপর জান্নাত প্রাপ্তিকে শর্তযুক্ত করা হয়নি।
বিয়ে কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বিয়ে একটি মহৎ ইবাদত। রাসুলুল্লাহ (স.) বিয়ে করতে উৎসাহিত করেছেন এবং একে চরিত্র রক্ষার শক্তিশালী ঢাল হিসেবে বর্ণনা করেছেন। নবীজি (স.) বলেছেন- ‘বান্দা যখন বিয়ে করে, তখন সে তার দ্বীনের অর্ধেক পূর্ণ করে। অতএব বাকি অর্ধেকের ব্যাপারে সে যেন আল্লাহকে ভয় করে।’ (সহিহ ইবনে হিব্বান: ৪০৩৫; বায়হাকি) এই হাদিসের মর্মার্থ হলো, বিয়ের মাধ্যমে মানুষ অসংখ্য পাপাচার (যেমন নজর বা লজ্জাস্থানের খেয়ানত) থেকে বেঁচে থাকে, যা তাকে ইসলামের অর্ধেক সুরক্ষা দেয়। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, কেউ অবিবাহিত থাকলে বাকি অর্ধেক দ্বীন পূর্ণ করতে সক্ষম হবে না।
বিয়ে একটি মহৎ ইবাদত। রাসুলুল্লাহ (স.) বিয়ে করতে উৎসাহিত করেছেন এবং একে চরিত্র রক্ষার শক্তিশালী ঢাল হিসেবে বর্ণনা করেছেন। নবীজি (স.) বলেছেন- ‘বান্দা যখন বিয়ে করে, তখন সে তার দ্বীনের অর্ধেক পূর্ণ করে। অতএব বাকি অর্ধেকের ব্যাপারে সে যেন আল্লাহকে ভয় করে।’ (সহিহ ইবনে হিব্বান: ৪০৩৫; বায়হাকি) এই হাদিসের মর্মার্থ হলো, বিয়ের মাধ্যমে মানুষ অসংখ্য পাপাচার (যেমন নজর বা লজ্জাস্থানের খেয়ানত) থেকে বেঁচে থাকে, যা তাকে ইসলামের অর্ধেক সুরক্ষা দেয়। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, কেউ অবিবাহিত থাকলে বাকি অর্ধেক দ্বীন পূর্ণ করতে সক্ষম হবে না।
বিয়ের বিধান সবার জন্য এক নয়
ইসলামি ফিকহ অনুযায়ী, বিয়ের হুকুম ব্যক্তির শারীরিক, আর্থিক ও পারিপার্শ্বিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে-
১. ফরজ: যদি কারও সামর্থ্য থাকে এবং বিয়ে না করলে পাপে (জিনা-ব্যভিচার) লিপ্ত হওয়ার নিশ্চিত আশঙ্কা থাকে, তবে তার জন্য বিয়ে করা ফরজ।
২. সুন্নতে মুয়াক্কাদা: স্বাভাবিক অবস্থায় সামর্থ্যবান ব্যক্তির জন্য বিয়ে করা সুন্নতে মুয়াক্কাদা।
৩. মাকরুহ বা হারাম: যদি কারও আশঙ্কা থাকে যে, সে স্ত্রীর অধিকার আদায় করতে পারবে না বা তার ওপর জুলুম করবে, তবে তার জন্য বিয়ে করা মাকরুহ বা ক্ষেত্রবিশেষে হারাম।
‘উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়’ হাদিসের সঠিক ব্যাখ্যা
অনেকে একটি হাদিস দিয়ে ভয় দেখান যেখানে রাসুল (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমার সুন্নত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়।’ (বুখারি) মুহাদ্দিসিনদের মতে, এখানে ‘সুন্নত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া’ বলতে সুন্নতের প্রতি অবজ্ঞা, ঘৃণা বা বিয়েকে দ্বীনের অংশ মনে না করাকে বোঝানো হয়েছে। কেউ যদি বৈধ ওজর, শারীরিক অক্ষমতা বা দ্বীনি খেদমতে নিজেকে উৎসর্গ করার কারণে বিয়ে করতে না পারেন, তবে তিনি এই সতর্কবার্তার অন্তর্ভুক্ত হবেন না।
অবিবাহিত নেককারদের ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত
ইসলামের ইতিহাসে এমন অনেক ব্যক্তিত্ব রয়েছেন যারা আজীবন অবিবাহিত ছিলেন, কিন্তু তারা ছিলেন যুগের শ্রেষ্ঠ নেককার। পবিত্র কোরআনে হজরত ইয়াহইয়া (আ.) সম্পর্কে ‘হাসুর’ (নারীবিমুখ/সংযমী) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, যা তাঁর উচ্চ মর্যাদাকেই প্রকাশ করে।
বিখ্যাত হাদিস বিশারদ ইমাম নববি (রহ.), প্রখ্যাত ফকিহ ইবনে তাইমিয়া (রহ.) এবং ইমাম তাবারি (রহ.)-এর মতো মহান ব্যক্তিরা দ্বীনি ইলমের খেদমতে মগ্ন থাকার কারণে বিয়ে করার সুযোগ পাননি। প্রখ্যাত আলেম শায়খ আব্দুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ (রহ.) এই বিষয়ে ‘আল-উলামাউল উজ্জাব’ (অবিবাহিত আলেমগণ) নামে একটি বিখ্যাত বই লিখেছেন।
সুতরাং বিয়ে না করলেই জান্নাত হাতছাড়া হয়ে যাবে— এমন সামাজিক বিশ্বাসটি একটি ভুল ধারণা। তবে সামর্থ্য থাকলে এবং পাপ থেকে বাঁচতে বিয়ের কোনো বিকল্প নেই। আর যারা উপযুক্ত কারণ বা পরিস্থিতির শিকার হয়ে বিয়ে করতে পারেননি, তারা যদি ঈমান ও আমল ঠিক রাখেন, তবে আল্লাহর রহমতে অবশ্যই জান্নাত লাভ করবেন।