আমদানিনির্ভর ফলের সরবরাহ বাড়িয়ে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষে আমদানিকারকদের দ্রুত ঋণপত্র (এলসি) খুলে আমদানি বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। একই সঙ্গে খেজুর আমদানির শুল্ক-কর নিয়ে চলতি সপ্তাহেই সরকারের সিদ্ধান্ত জানানো হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
শনিবার সচিবালয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে বাজারে মাল্টা, খেজুরসহ ফলের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত ও বাজারমূল্য স্থিতিশীল রাখতে ব্যবসায়ী এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় এসব কথা বলেন বাণিজ্যমন্ত্রী।
সভায় বাজারে মাল্টার বর্তমান দাম নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি। আমদানি মূল্য, শুল্ক-কর এবং অন্যান্য ব্যয় বিবেচনায় নেওয়ার পরও খুচরা বাজারে প্রতিকেজি মাল্টার দাম কীভাবে ৫২০ টাকায় পৌঁছেছে, তা ব্যবসায়ীদের কাছে জানতে চান মন্ত্রী।
অস্বাভাবিক দামে মাল্টা বিক্রির প্রমাণ পাওয়া গেলে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেন, বাজারে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধির সুযোগ দেওয়া হবে না।
সভায় ব্যবসায়ীরা জানান, সরবরাহ ঘাটতির কারণে মাল্টার দাম বেড়েছে। তাদের হিসাবে, কোনো কোনো সপ্তাহে দেশে মাত্র ১২ থেকে ২৯ কনটেইনার মাল্টা এসেছে। অথচ দেশের স্বাভাবিক চাহিদা পূরণে প্রতিদিন প্রায় ১৫ কনটেইনার মাল্টা প্রয়োজন।
আমদানিকারকেরা জানান, উচ্চ শুল্ক, পরিবহন ব্যয়, জাহাজ ও বন্দরের নানা জটিলতা এবং আগের চালানে লোকসানের কারণে অনেক ব্যবসায়ী মাল্টা আমদানি কমিয়ে দিয়েছেন। এর সঙ্গে পচনশীল পণ্য হওয়ায় পরিবহন ও সংরক্ষণের সময়ও ব্যবসায়ীদের বড় ধরনের আর্থিক ঝুঁকি নিতে হচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের বক্তব্য শোনার পর মাল্টার শুল্কসংক্রান্ত বিষয় পর্যালোচনার আশ্বাস দেন বাণিজ্যমন্ত্রী। পাশাপাশি বিকল্প উৎস থেকে আমদানি বাড়ানোর পাশাপাশি দ্রুত এলসি খুলে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বাজারে মাল্টার সরবরাহ বাড়ানোর তাগিদ দেন তিনি।
খেজুর আমদানির প্রস্তুতির আহ্বান
আসন্ন চাহিদা বিবেচনায় ব্যবসায়ীদের এখন থেকেই খেজুর আমদানির প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, খেজুরের শুল্ক নিয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত চলতি সপ্তাহেই জানানো হবে।
খেজুরের অ্যাসেসমেন্ট ভ্যালু বা শুল্কায়ন মূল্য নির্ধারণের দীর্ঘদিনের জটিলতা নিরসনেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন আগামী কয়েক দিনের মধ্যে খেজুর আমদানিকারকদের সঙ্গে বৈঠক করবে।
বৈঠকে বাংলাদেশে আমদানি হওয়া বিভিন্ন মান ও গ্রেডের খেজুরের আন্তর্জাতিক উৎসমূল্য যাচাই করে একটি যৌক্তিক নির্দেশক মূল্য নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। পরে এ বিষয়ে একটি প্রস্তাব জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাছে পাঠানো হবে।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, শুল্কায়ন ব্যবস্থা এমন হতে হবে, যাতে ব্যবসায়ীরা অযৌক্তিক অ্যাসেসমেন্টের শিকার না হন। একই সঙ্গে পণ্যের মূল্য কম দেখিয়ে সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার সুযোগও রাখা যাবে না।
সরকার ও ব্যবসায়ী—উভয় পক্ষকে স্বচ্ছতা ও সততার সঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, কোনো পক্ষ কারসাজির চেষ্টা করলে পুরো ব্যবস্থার ওপরই আস্থার সংকট তৈরি হয়।
সভায় এনবিআরের প্রতিনিধি জানান, বিভিন্ন মান ও গ্রেডের খেজুরের প্রকৃত ক্রয়মূল্য আলাদা হলেও শুল্কায়নের ক্ষেত্রে সব সময় সেই পার্থক্য যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয় না। এ কারণে বাস্তবসম্মত মূল্য নির্ধারণে আন্তর্জাতিক বাজারদর ও উৎসমূল্য বিবেচনায় নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়।
খেজুর আমদানিকারকেরা জানান, আন্তর্জাতিক পরিবহন ও বন্দরের জটিলতার কারণে খেজুর বাংলাদেশে পৌঁছাতে আগের তুলনায় বেশি সময় লাগছে। তাই সময়মতো পর্যাপ্ত খেজুর আমদানি নিশ্চিত করতে শুল্কসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত দ্রুত প্রয়োজন।
সভায় ব্যবসায়ীরা বিকল্প উৎস থেকে মাল্টাসহ বিভিন্ন বিদেশি ফলের আমদানি বাড়ানোর আশ্বাস দেন। অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে শুল্ক-কর, শুল্কায়ন ও আমদানিপ্রক্রিয়ার যৌক্তিক সমস্যাগুলো পর্যালোচনার কথা জানানো হয়।
মতবিনিময় সভায় বাণিজ্য সচিব মো. আতাউর রহমান খান, বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের চেয়ারম্যান নাসির উদ দৌলা, জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. জহিরুল ইসলাম, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রতিনিধি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।